কারও হাতে বাদ্যযন্ত্র, কারও গলায় ফুলের মালা, আবার কারও মুখে আনন্দের হাসি। কিশোর থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে যেন পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেওলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রামবাসীর।
নিজেদের চাঁদার টাকায় স্থায়ী খেলার মাঠের জন্য ৬০ শতাংশ জমি কিনেছেন তাঁরা। জমি বুঝে পাওয়ার আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখতে গ্রামজুড়ে আয়োজন করা হয় উৎসবের। বৃহস্পতিবার (তারিখ) জমি বুঝে নেওয়ার আয়োজনে উদ্যোক্তাদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন গ্রামবাসী। বাদ্যযন্ত্রের তালে নানা সাজে সজ্জিত হয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন কিশোর, যুবক ও বয়োবৃদ্ধরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে ব্যতিক্রমী এই আয়োজনের ছবি ও ভিডিও। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাবুপুর গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে কিশোর-তরুণদের খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাঠ ছিল না। ফলে কৃষিজমির ফসল কাটার পর খালি পড়ে থাকা জমিতে কিংবা অন্য গ্রামে গিয়ে খেলতে হতো তাদের। বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে এলাকার কয়েকজন সমাজহিতৈষী মানুষকে। তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং খেলাধুলার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে তাঁরা স্থায়ী খেলার মাঠ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক দফা আলোচনার পর গ্রামবাসীর কাছ থেকে স্বেচ্ছায় চাঁদা সংগ্রহ করে জমি কেনার সিদ্ধান্ত হয়। উপযুক্ত জমি নির্বাচন করে মালিকের সঙ্গে আলোচনা করলে তিনিও তা বিক্রিতে সম্মত হন। পরে গ্রামবাসীর সম্মিলিত অর্থায়নে প্রতি শতাংশ ৫২ হাজার টাকা দরে মোট ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়। জমি কেনার অন্যতম উদ্যোক্তা বাবুপুর গ্রামের সন্তান এস এম ইকবাল মাহমুদ জানান, কয়েক মাস আগে গ্রামের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলমের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
গ্রামবাসীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে খেলার মাঠের জমি কেনার প্রস্তাবে খোরশেদ আলম সম্মতি জানান। পরে এলাকার কয়েকজন বিত্তশালী ব্যক্তির সঙ্গেও আলোচনা করা হয়। তাঁরাও উদ্যোগটিকে স্বাগত জানান। গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জমি কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। ইকবাল মাহমুদ বলেন, গ্রামের বিত্তশালী ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
কেউ ২০০, কেউ ৫০০, আবার কেউ এক হাজার, দুই হাজার, পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এভাবেই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাস্তবায়িত হয়েছে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। উদ্যোক্তাদের মধ্যে খোরশেদ আলম ও ইকবাল মাহমুদ ছাড়াও আজাহার সিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু সিকদার, শফিকুল ইসলাম ও শুভ প্রামাণিক উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ অনুদান দিয়েছেন।
আরেক উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম বলেন, আপাতত ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। ভবিষ্যতে পাশের আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। মোট ১২০ শতাংশ জমি হলে সেখানে একটি মানসম্মত খেলার মাঠ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে এলাকার কিশোর ও তরুণেরা স্বাচ্ছন্দ্যে খেলাধুলা ও ক্রীড়াচর্চার সুযোগ পাবে। মাঠ পেয়ে উচ্ছ্বসিত স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও। বাবুপুর গ্রামের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম জানায়, আগে তাদের গ্রামে কোনো খেলার মাঠ ছিল না।
পরিত্যক্ত ফসলি জমিতে খেলতে হতো, কখনো যেতে হতো অন্য গ্রামে। নিজেদের গ্রামে মাঠ হওয়ায় এখন থেকে বন্ধুরা সবাই মিলে নিয়মিত খেলাধুলা করতে পারবে। গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বেপারী বলেন, “গ্রামে একটি খেলার মাঠের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেছি। আজ আমাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
” দেওলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম জানান, তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তাদের খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত রেখে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতেই স্থায়ী খেলার মাঠের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামের প্রায় ৭০০ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রবাসীরাও এ উদ্যোগে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করেছেন।
এ বিষয়ে দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যোহরা সুলতানা যূথী বলেন, গ্রামবাসীর নিজস্ব উদ্যোগে চাঁদা তুলে খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি তাদের মাদকসহ বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। একটি মাঠ কেনা মানে শুধু জমি কেনা নয়; বরং একটি গ্রামের আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থ বিনোদন, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ তৈরি করা।
বাবুপুরের মানুষের এই সম্মিলিত উদ্যোগ দেখিয়েছে, সদিচ্ছা ও ঐক্য থাকলে একটি গ্রামের মানুষ নিজেরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারেন।





















