আজ শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
১৫ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৮৭%

যমুনার তীরে ঐতিহাসিক তেওতা জমিদার বাড়ির অনন্য গৌরব

  • MIT ERP
  • Update Time : 06:39:34 am, Saturday, 31 October 2026
  • 14

যমুনার তীরে ঐতিহাসিক তেওতা জমিদার বাড়ির অনন্য গৌরব

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

সেন-পাল রাজাদের আমল থেকে সারা বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য জমিদার বাড়ি, সেই সময়ের জমিদাররা থাকার জন্য আর শাসন করার জন্য এসব জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। টিকে থাকা জমিদার বাড়ির মধ্যে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ির মাহাত্ম্য একটু আলাদা।

এটি শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের দুই অমর চরিত্র কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রমীলা দেবীর প্রেমের এক জীবন্ত ক্যানভাস এই জমিদার বাড়ি। যমুনা নদীর ¯িœগ্ধ হাওয়া আর প্রাচীন স্থাপত্যের ঘ্রাণ নিতে ঘুরে আসতে পারেন ৩০০ বছরের পুরোনো এই জমিদার বাড়ি। সঙ্গে পাবেন নজরুলের প্রেমের আখ্যান। ইতিহাসবিদদের মতে, সতেরশ’ শতকে এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

এটি নির্মাণ করেছিলেন পঞ্চানন সেন নামক একজন জমিদার। জনশ্রুতি অনুসারে, পঞ্চানন সেন এক সময় খুবই দরিদ্র ছিলেন ও দিনাজপুর অঞ্চলে তিনি তামাক উৎপাদন করে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হওয়ার পর এ প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠিত করে জয়শংকর ও হেমশংকর নামে দুজন ব্যক্তি। ভারত বিভক্তির পর তারা দুজনেই ভারত চলে গেলে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

এই বাড়িতে ঘুরে বেড়ালে অনেকটা হ্যালোসিনেশন কাজ করবে নিজেকে আবিষ্কার করবেন সেই জমিদার আমলের রাজা-প্রজা হিসেবে। নজরুল-প্রমীলার অমলিন স্মৃতি এই প্রাসাদের পাশেই ছিল প্রমীলা দেবীর বাবা বসন্ত সেনের বাড়ি। কবির বন্ধু বীরেন সেনের মাধ্যমেই এখানে যাতায়াত শুরু নজরুলের। কিংবদন্তি আছে, এই জমিদার বাড়ির পুকুরঘাট বা বাগানে বসেই কবি প্রমীলার প্রেমে পড়েছিলেন।

প্রমীলার প্রতি মুগ্ধতা থেকেই তিনি লিখেছিলেন ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সেকি মোর অপরাধ’ আজও সাহিত্যপ্রেমীরা এখানে এসে খুঁজে বেড়ান সেই বিরহী কবির পদচিহ্ন। চোখের শান্তি জমিদার বাড়ি প্রায় সাড়ে সাত একর জায়গার ওপর ১৭০০ শতকে নির্মিত ৫৫ কক্ষের প্রাসাদের বিশালতা আপনাকে মুগ্ধ করবে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ৭৫ ফুট উচ্চতার চারতলা মন্দিরটি এ এলাকার প্রধান ল্যান্ডমার্ক।

এর কারুকাজ এখনো বিস্ময় জাগায়। বাড়ির পূর্বদিকে রয়েছে একটি দিঘি, যার নাম লালদিঘি। এখানকার শান বাঁধানো ঘাট জমিদার গিন্নিদের আভিজাত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। দিঘির দক্ষিণ পাশে একটি রহস্যময় অন্ধকার কক্ষ রয়েছে, যা এককালে কয়েদখানা বা গুপ্ত কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। জমিদার বাড়ির একেবারেই কাছে যমুনা নদী। বিকেলে নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখা আপনার ভ্রমণের ক্লান্তিকে এক নিমেষে দূর করে দেবে সঙ্গে দেবে চোখের শান্তি; মনে হবে যেন আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত।

এই বাড়িতে ঘুরলে আপনি ছবি বা সিনেমায় দেখা রাজা জমিদারদের অবস্থা চরিত্র কাজ করবে আপনার মাথার ভেতরে। যেভাবে যাবেন ঢাকা থেকে তেওতা জমিদার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। বাসে করে গেলে ঢাকার গাবতলী থেকে ‘পদ্মা লাইন’, ‘যাত্রীসেবা’ বা ‘বিআরটিসি’ বাসে করে সরাসরি আরিচা ঘাট চলে যান। ভাড়া পড়বে ১৫০-১৮০ টাকার মধ্যে।

সময় লাগবে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। এরপর আরিচা ঘাট থেকে রিকশা বা ইজি-বাইকে করে মাত্র ২০-৩০ মিনিটে পৌঁছে যাবেন তেওতা জমিদার বাড়িতে। ভাড়া ২০-৪০ টাকা। আর যদি নিজস্ব গাড়ি বা বাইক নিয়ে গেলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে সোজা শিবালয় চলে আসতে পারেন। খাওয়া-দাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা যে কেউ চাইলে এখানে খেতে পারেন আরিচা ঘাটে প্রচুর দেশি হোটেল আছে।

যমুনার টাটকা ইলিশ, আইড় বা বোয়াল মাছের তরকারি দিয়ে দুপুরের খাবারটা দারুণ জমবে। তেওতা বা আরিচায় থাকার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। তবে দিনের আলো থাকতেই ঘুরে দেখা শেষ করে সন্ধ্যায় ঢাকার পথে রওনা দেওয়া সম্ভব। থাকতে চাইলে মানিকগঞ্জ জেলা সদরের ডাকবাংলো বা সাধারণ মানের আবাসিক হোটেলে উঠতে পারেন। জেনে রাখা ভালো বর্ষার শেষে বা শরতের বিকেলে গেলে যমুনা নদী ও জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়।

বাড়ির কিছু অংশ জরাজীর্ণ, তাই ছবি তোলার সময় বা ভেতরে প্রবেশের সময় সাবধানে চলাফেরা করবেন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

যমুনার তীরে ঐতিহাসিক তেওতা জমিদার বাড়ির অনন্য গৌরব

Update Time : 06:39:34 am, Saturday, 31 October 2026

সেন-পাল রাজাদের আমল থেকে সারা বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য জমিদার বাড়ি, সেই সময়ের জমিদাররা থাকার জন্য আর শাসন করার জন্য এসব জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। টিকে থাকা জমিদার বাড়ির মধ্যে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ির মাহাত্ম্য একটু আলাদা।

এটি শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের দুই অমর চরিত্র কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রমীলা দেবীর প্রেমের এক জীবন্ত ক্যানভাস এই জমিদার বাড়ি। যমুনা নদীর ¯িœগ্ধ হাওয়া আর প্রাচীন স্থাপত্যের ঘ্রাণ নিতে ঘুরে আসতে পারেন ৩০০ বছরের পুরোনো এই জমিদার বাড়ি। সঙ্গে পাবেন নজরুলের প্রেমের আখ্যান। ইতিহাসবিদদের মতে, সতেরশ’ শতকে এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

এটি নির্মাণ করেছিলেন পঞ্চানন সেন নামক একজন জমিদার। জনশ্রুতি অনুসারে, পঞ্চানন সেন এক সময় খুবই দরিদ্র ছিলেন ও দিনাজপুর অঞ্চলে তিনি তামাক উৎপাদন করে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হওয়ার পর এ প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠিত করে জয়শংকর ও হেমশংকর নামে দুজন ব্যক্তি। ভারত বিভক্তির পর তারা দুজনেই ভারত চলে গেলে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

এই বাড়িতে ঘুরে বেড়ালে অনেকটা হ্যালোসিনেশন কাজ করবে নিজেকে আবিষ্কার করবেন সেই জমিদার আমলের রাজা-প্রজা হিসেবে। নজরুল-প্রমীলার অমলিন স্মৃতি এই প্রাসাদের পাশেই ছিল প্রমীলা দেবীর বাবা বসন্ত সেনের বাড়ি। কবির বন্ধু বীরেন সেনের মাধ্যমেই এখানে যাতায়াত শুরু নজরুলের। কিংবদন্তি আছে, এই জমিদার বাড়ির পুকুরঘাট বা বাগানে বসেই কবি প্রমীলার প্রেমে পড়েছিলেন।

প্রমীলার প্রতি মুগ্ধতা থেকেই তিনি লিখেছিলেন ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সেকি মোর অপরাধ’ আজও সাহিত্যপ্রেমীরা এখানে এসে খুঁজে বেড়ান সেই বিরহী কবির পদচিহ্ন। চোখের শান্তি জমিদার বাড়ি প্রায় সাড়ে সাত একর জায়গার ওপর ১৭০০ শতকে নির্মিত ৫৫ কক্ষের প্রাসাদের বিশালতা আপনাকে মুগ্ধ করবে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ৭৫ ফুট উচ্চতার চারতলা মন্দিরটি এ এলাকার প্রধান ল্যান্ডমার্ক।

এর কারুকাজ এখনো বিস্ময় জাগায়। বাড়ির পূর্বদিকে রয়েছে একটি দিঘি, যার নাম লালদিঘি। এখানকার শান বাঁধানো ঘাট জমিদার গিন্নিদের আভিজাত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। দিঘির দক্ষিণ পাশে একটি রহস্যময় অন্ধকার কক্ষ রয়েছে, যা এককালে কয়েদখানা বা গুপ্ত কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। জমিদার বাড়ির একেবারেই কাছে যমুনা নদী। বিকেলে নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখা আপনার ভ্রমণের ক্লান্তিকে এক নিমেষে দূর করে দেবে সঙ্গে দেবে চোখের শান্তি; মনে হবে যেন আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত।

এই বাড়িতে ঘুরলে আপনি ছবি বা সিনেমায় দেখা রাজা জমিদারদের অবস্থা চরিত্র কাজ করবে আপনার মাথার ভেতরে। যেভাবে যাবেন ঢাকা থেকে তেওতা জমিদার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। বাসে করে গেলে ঢাকার গাবতলী থেকে ‘পদ্মা লাইন’, ‘যাত্রীসেবা’ বা ‘বিআরটিসি’ বাসে করে সরাসরি আরিচা ঘাট চলে যান। ভাড়া পড়বে ১৫০-১৮০ টাকার মধ্যে।

সময় লাগবে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। এরপর আরিচা ঘাট থেকে রিকশা বা ইজি-বাইকে করে মাত্র ২০-৩০ মিনিটে পৌঁছে যাবেন তেওতা জমিদার বাড়িতে। ভাড়া ২০-৪০ টাকা। আর যদি নিজস্ব গাড়ি বা বাইক নিয়ে গেলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে সোজা শিবালয় চলে আসতে পারেন। খাওয়া-দাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা যে কেউ চাইলে এখানে খেতে পারেন আরিচা ঘাটে প্রচুর দেশি হোটেল আছে।

যমুনার টাটকা ইলিশ, আইড় বা বোয়াল মাছের তরকারি দিয়ে দুপুরের খাবারটা দারুণ জমবে। তেওতা বা আরিচায় থাকার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। তবে দিনের আলো থাকতেই ঘুরে দেখা শেষ করে সন্ধ্যায় ঢাকার পথে রওনা দেওয়া সম্ভব। থাকতে চাইলে মানিকগঞ্জ জেলা সদরের ডাকবাংলো বা সাধারণ মানের আবাসিক হোটেলে উঠতে পারেন। জেনে রাখা ভালো বর্ষার শেষে বা শরতের বিকেলে গেলে যমুনা নদী ও জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়।

বাড়ির কিছু অংশ জরাজীর্ণ, তাই ছবি তোলার সময় বা ভেতরে প্রবেশের সময় সাবধানে চলাফেরা করবেন।