খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর বুকে নির্মাণ করা হবে দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল-স্টেড সেতু। উঁচু পাইলন থেকে টানা ইস্পাতের তারের সাহায্যে সেতুর মূল কাঠামো ধরে রাখার এ আধুনিক সেতু নির্মাণ করা হবে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার সংযোগস্থলে চন্দ্রঘোনা-রাইখালী ফেরিঘাট এলাকায়।
প্রায় এক হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩২ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মিত হলে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের ফেরি-ভোগান্তি কমবে। খুলবে যোগাযোগ, পর্যটন ও বাণিজ্যের নতুন দুয়ার। সওজ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে রাঙামাটির সঙ্গে রাজস্থলী ও বান্দরবানের যোগাযোগ সহজ করতে চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী নদীর ওপর ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়।
প্রায় ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ওই ফেরির ওপর নির্ভর করেই দুই পাড়ের যানবাহন পারাপার করতে হচ্ছে। পন্টুনের সমস্যা, ডুবোচর ও নদীর তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এতে যাত্রী, চালক ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাঙামাটির সওজ নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, স্টিল ও কংক্রিটের সমন্বয়ে নির্মিতব্য সেতুটির মূল অংশের দৈর্ঘ্য হবে ৫৩২ মিটার।
এর সঙ্গে থাকবে ৪৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট ও এক হাজার ২৫০ মিটারের বেশি দীর্ঘ এলিভেটেড সড়ক। চার লেনের সেতুটিতে যুক্ত করা হবে আধুনিক ‘ব্রিজ স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’, যার মাধ্যমে সেতুর অবস্থা ও স্থায়িত্ব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। থাকবে স্বয়ংক্রিয় টোল প্লাজাও। ক্যাবল-স্টেড সেতুতে উঁচু টাওয়ার বা পাইলনের সঙ্গে যুক্ত তির্যক ইস্পাতের তার সেতুর চলাচলের পথের ভার বহন করে।
ফলে দীর্ঘ স্প্যান তৈরি সম্ভব ও নদীর মাঝখানে পিলারের প্রয়োজন কমে আসে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচলে বাধা কমানোর সুযোগ থাকে। সূত্র জানায়, রাঙামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের ২১তম কিলোমিটারে সেতুটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য ৭ দশমিক ৫২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। সেতুর চূড়ান্ত নকশা ও প্রকল্প প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও হয়। এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে চন্দ্রঘোনা ফেরিতে একবারে মাত্র ৮-১০টি ট্রাক বা বাস এবং ১৫-২০টি ছোট ও হালকা যানবাহন পারাপার করা যায়।
নদী পার হতে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগে। নদীতে স্রোত বেড়ে গেলে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের গেট খুলে দিলে কিংবা পানি কমে গেলে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। ব্যবসায়ী ফরিদ আহমদ বলেন, প্রতিদিন এ ফেরিঘাট দিয়ে প্রায় ৯০০ থেকে এক হাজার ছোট-বড় যানবাহন পারাপার হয়। কিন্তু ফেরির কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
ব্যবসায়ী তনয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফেরির ঝামেলায় পাহাড়ি এলাকার কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো যায় না। অনেক সময় ফেরি বিকল হয়ে মাঝনদীতে আটকে পড়ে। সেতু নির্মিত হলে বান্দরবান ও রাঙামাটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের চিত্র বদলে যাবে। ট্রাকচালক রহিম উদ্দিন বলেন, সেতুটি হলে সময়ের অপচয় ও জীবনের ঝুঁকিÑ দুটিই কমবে। সওজর উপসহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমা বলেন, সেতুটি শুধু যাতায়াত সহজ করবে না, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুই পার্বত্য জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এ সেতু মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।





















