যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। জাতীয় পর্যায়ের জনমত জরিপে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির তুলনায় এগিয়ে রয়েছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। তবে সিনেটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আগামী ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না, বরং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ধারণ করবে। নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলই জোর প্রচার চালাচ্ছে। বুধবার ওহাইও, জর্জিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনায় নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিয়েছেন ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
জনমত জরিপে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা : রিয়েলক্লিয়ারপোলিংয়ের জাতীয় জনমত জরিপের গড় হিসাবে, ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের সমর্থন ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, জাতীয় পর্যায়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। টেক্সাসেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র বদলানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ১৯৮৮ সালের পর রাজ্যটিতে কোনো সিনেট নির্বাচনে জয় পায়নি ডেমোক্র্যাটরা।
কিন্তু এবারের জরিপে দলটির প্রার্থী জেমস তালারিকো ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। মিশিগানেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের সমর্থন বেড়েছে। সিবিএস ডেট্রয়েটের জন্য পরিচালিত এক জরিপে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের চেয়ে ৭ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে।
তবে অন্য জরিপে ব্যবধান অনেক কম। ফলে রাজ্যটির সিনেট আসনে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ : নির্বাচনে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। জ¦ালানির দাম, বাড়িভাড়া, বাড়ি কেনার ঋণের খরচ এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ সুহাইল খানের মতে, মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রাম্পের নিজস্ব কিছু সমর্থকও হতাশ হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ জোয়েল রুবিন মনে করেন, এবারের নির্বাচন ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদী ভোটে পরিণত হতে পারে। তবে দুই দলের প্রতিই অনাস্থা রয়েছে অনেক ভোটারের। কেনটাকি ও পেনসিলভানিয়ার কয়েকজন ভোটার জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের প্রত্যাশার চেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিই বেশি মনোযোগী।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণের লড়াই : যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নি¤œকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসন ৪৩৫টি। বর্তমানে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। একটি স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে রয়েছেন এবং দুটি আসন শূন্য। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত তিনটি আসন বাড়াতে হবে।
অল্প কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ফলই এ ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। এই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকা- নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। সরকারি ব্যয় ও নতুন আইন প্রণয়নেও তারা রিপাবলিকানদের পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের শুনানিতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করার ক্ষমতাও তাদের থাকবে।
সিনেটে জয় পাওয়া কঠিন : কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের আসনসংখ্যা ১০০। বর্তমানে রিপাবলিকানদের হাতে রয়েছে ৫৩টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা দুজন স্বতন্ত্র সদস্যসহ বিরোধী পক্ষের আসনসংখ্যা ৪৭। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১টিতে পৌঁছাতে হবে। তবে এ লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, নর্থ ক্যারোলাইনা ও ওহাইওতে জয় পেলেও ডেমোক্র্যাটদের আরও আসন অর্জন করতে হবে।
আলাস্কা ও টেক্সাসের মতো রাজ্যের ফল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও কেন্দ্রীয় বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, এসব গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ অনুমোদনের দায়িত্ব সিনেটের। অভিশংসন কি বিপদে ফেলবে ট্রাম্পকে? ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং অভিশংসনের প্রস্তাব আনার সুযোগ পাবেন।
তবে অভিশংসন শুরু হওয়া আর প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়। প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সিনেটে বিচার অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণ করতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ হারানো নিশ্চিত নয়।
তবে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও সরকারি ব্যয় অনুমোদনের পরিকল্পনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বাজেট নিয়ে বিরোধ বাড়লে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে অর্থসংকট দেখা দেওয়ার ঝুঁকিও থাকবে। কোন বিষয়গুলো প্রভাব ফেলবে ভোটে? জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি অভিবাসননীতি, প্রজনন অধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং ইরানকে ঘিরে মার্কিন যুদ্ধনীতিও নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত সম্প্রসারণ ও তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ চাহিদা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর নির্বাচনি পরিস্থিতির ওপর। ৩ নভেম্বর ভোটগ্রহণের পর প্রাথমিক ফল আসতে শুরু করবে। তবে ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট ও বাকি ভোট গণনার কারণে কিছু আসনের চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে তার মেয়াদের বাকি সময়ে আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় এবং নীতি বাস্তবায়নের সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে।





















