আজ শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
১৫ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৫°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৮৭%

পরাশক্তির দ্বন্দ্বে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে যুদ্ধের ঝুঁকি

  • MIT ERP
  • Update Time : 05:21:50 am, Saturday, 31 October 2026
  • 16

পরাশক্তির দ্বন্দ্বে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে যুদ্ধের ঝুঁকি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বিশ্ব কি আবারও একটি মহাযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোর আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ এই প্রশ্ন ক্রমেই সামনে নিয়ে আসছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, চীনের সামরিক তৎপরতা এবং পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলেছে।

একসময়ের তুলনামূলক নিরাপদ বলে বিবেচিত ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও এখন যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। তবে সংঘাতের বিস্তার ও সামরিক উত্তেজনা বাড়লেও বিশ্ব ইতিমধ্যে তৃতীয় মহাযুদ্ধে প্রবেশ করেছেÑ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বরং সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বিভিন্ন আঞ্চলিক যুদ্ধ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে কিংবা কোনো ভুল হিসাব থেকে পরাশক্তিগুলো সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বদলে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির হিসাব : ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আগে ইউরোপের অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননি যে, একবিংশ শতাব্দীতে বড় আকারের স্থলযুদ্ধ আবারও মহাদেশটির বাস্তবতা হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে যায় রুশ বাহিনীর হামলার মধ্য দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর পর চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান অধরা।

বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য হতাহত হয়েছেন, অসংখ্য বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং রাশিয়ার পাল্টা অবস্থান সংঘাতটিকে আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।

জার্মানিসহ একাধিক দেশ সামরিক ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পশ্চিমা সামরিক জোটের নেতৃত্ব থেকেও রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানানো হচ্ছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা : ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনির প্রাণহানি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করেছে।

রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা, ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণ এবং চীনের সঙ্গে মস্কোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব সম্পর্কের কারণে এক অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলের সামরিক ও কূটনৈতিক হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কোনো পক্ষের হামলায় অন্য কোনো শক্তির সেনা বা ভূখ- ক্ষতিগ্রস্ত হলে পাল্টা পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে ইউক্রেনকে সহায়তাকারী কোনো দেশের সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সংঘর্ষ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের লড়াই আরও বিস্তৃত হলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে তাইওয়ান : বিশ্বশান্তির আরেকটি বড় পরীক্ষা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। চীন সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি তাইওয়ানের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে।

বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখ-ের অংশ বলে মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে তাইওয়ান প্রণালিতে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরেও বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরোধ রয়েছে।

এই অঞ্চলে নৌ ও বিমান বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সামরিক মহড়া ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সংঘাতের সংখ্যা : আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক গবেষকদের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বহু অঞ্চলে একযোগে সংঘাত চলছে। ইউক্রেন ও গাজার পাশাপাশি সুদানে ভয়াবহ লড়াই, ব্যাপক প্রাণহানি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরছে।

এই সংঘাতগুলোর পেছনে শুধু স্থানীয় বিরোধ নয়, বাইরের শক্তির সমর্থন, অস্ত্র সরবরাহ এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে কোনো কোনো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, জ¦ালানি ও বাণিজ্য সরবরাহেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বড় যুদ্ধ শুরু হলে এর প্রভাব কেবল যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে : বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনও বর্তমান উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব বিস্তার করত।

এখন চীনের উত্থান, রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সক্রিয়তা আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনছে। রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বিভিন্ন মাত্রার সহযোগিতা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, এসব দেশের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের বিরোধিতা করছেন।

পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা নতুন নয়। কিন্তু কূটনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়লে সংঘাতের ঝুঁকি আরও তীব্র হতে পারে। শক্তির রাজনীতি কি শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ধারণা ক্রমেই আলোচিত হচ্ছেÑ বড় শক্তিগুলোকে নিজেদের আশপাশের অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিলে বিশ্বে স্থিতিশীলতা বজায় থাকতে পারে।

কিন্তু এই ধারণার বড় দুর্বলতা হলো, এতে ছোট দেশগুলোর স্বাধীনতা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইউক্রেন, তাইওয়ান কিংবা কানাডার মতো দেশ ও অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক দেখিয়েছে, বড় শক্তির স্বার্থ এবং ছোট দেশগুলোর নিজস্ব আকাক্সক্ষা সব সময় এক হয় না। কোনো দেশকে অন্যের আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য করা হলে প্রতিরোধ ও পাল্টা সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যায়।

আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক সমাধানের গুরুত্ব এখানেই। সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে কোনো বিরোধ দমন করা গেলেও তার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত হয় না। মিত্রদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা : বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ার আরেকটি কারণ হলো, কোনো দেশ আক্রান্ত হলে তার মিত্ররা কতটা দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা।

সামরিক জোটের পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার দুর্বল বলে মনে হলে প্রতিপক্ষ ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হতে পারে। আবার সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সরাসরি যুদ্ধে নামতে হলে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ইতিহাসে প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে কূটনৈতিক হিসাব, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিপক্ষের মনোভাব ভুলভাবে মূল্যায়নের পরিণতি ভয়াবহ হয়েছিল।

বর্তমান বিশ্বেও একই ধরনের ভুল হিসাব বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। মহাযুদ্ধ ঠেকানোর পথ কূটনীতি : বিশ্ব এখনো তৃতীয় মহাযুদ্ধের অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে একাধিক অঞ্চলে সংঘাত, পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস যে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সংলাপ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং সংঘাত নিরসনের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা এবং ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সম্মান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত বিশ্বশান্তি নির্ভর করবে শক্তিধর দেশগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে তার ওপর। যুদ্ধের আশঙ্কা কমাতে হলে হুমকি ও শক্তি প্রদর্শনের বদলে কূটনীতি, পারস্পরিক আস্থা এবং আলোচনাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

দেশের প্রথম ক্যাবল-স্টেড সেতু নির্মিত হবে কর্ণফুলীতে

পরাশক্তির দ্বন্দ্বে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে যুদ্ধের ঝুঁকি

Update Time : 05:21:50 am, Saturday, 31 October 2026

বিশ্ব কি আবারও একটি মহাযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোর আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ এই প্রশ্ন ক্রমেই সামনে নিয়ে আসছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, চীনের সামরিক তৎপরতা এবং পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলেছে।

একসময়ের তুলনামূলক নিরাপদ বলে বিবেচিত ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও এখন যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। তবে সংঘাতের বিস্তার ও সামরিক উত্তেজনা বাড়লেও বিশ্ব ইতিমধ্যে তৃতীয় মহাযুদ্ধে প্রবেশ করেছেÑ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বরং সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বিভিন্ন আঞ্চলিক যুদ্ধ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে কিংবা কোনো ভুল হিসাব থেকে পরাশক্তিগুলো সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বদলে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির হিসাব : ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আগে ইউরোপের অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননি যে, একবিংশ শতাব্দীতে বড় আকারের স্থলযুদ্ধ আবারও মহাদেশটির বাস্তবতা হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে যায় রুশ বাহিনীর হামলার মধ্য দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর পর চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান অধরা।

বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য হতাহত হয়েছেন, অসংখ্য বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং রাশিয়ার পাল্টা অবস্থান সংঘাতটিকে আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।

জার্মানিসহ একাধিক দেশ সামরিক ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পশ্চিমা সামরিক জোটের নেতৃত্ব থেকেও রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানানো হচ্ছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা : ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনির প্রাণহানি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করেছে।

রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা, ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণ এবং চীনের সঙ্গে মস্কোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব সম্পর্কের কারণে এক অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলের সামরিক ও কূটনৈতিক হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কোনো পক্ষের হামলায় অন্য কোনো শক্তির সেনা বা ভূখ- ক্ষতিগ্রস্ত হলে পাল্টা পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে ইউক্রেনকে সহায়তাকারী কোনো দেশের সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সংঘর্ষ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের লড়াই আরও বিস্তৃত হলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে তাইওয়ান : বিশ্বশান্তির আরেকটি বড় পরীক্ষা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। চীন সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি তাইওয়ানের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে।

বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখ-ের অংশ বলে মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে তাইওয়ান প্রণালিতে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরেও বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরোধ রয়েছে।

এই অঞ্চলে নৌ ও বিমান বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সামরিক মহড়া ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সংঘাতের সংখ্যা : আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক গবেষকদের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বহু অঞ্চলে একযোগে সংঘাত চলছে। ইউক্রেন ও গাজার পাশাপাশি সুদানে ভয়াবহ লড়াই, ব্যাপক প্রাণহানি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরছে।

এই সংঘাতগুলোর পেছনে শুধু স্থানীয় বিরোধ নয়, বাইরের শক্তির সমর্থন, অস্ত্র সরবরাহ এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে কোনো কোনো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, জ¦ালানি ও বাণিজ্য সরবরাহেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বড় যুদ্ধ শুরু হলে এর প্রভাব কেবল যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে : বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনও বর্তমান উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব বিস্তার করত।

এখন চীনের উত্থান, রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সক্রিয়তা আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনছে। রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বিভিন্ন মাত্রার সহযোগিতা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, এসব দেশের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের বিরোধিতা করছেন।

পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা নতুন নয়। কিন্তু কূটনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়লে সংঘাতের ঝুঁকি আরও তীব্র হতে পারে। শক্তির রাজনীতি কি শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ধারণা ক্রমেই আলোচিত হচ্ছেÑ বড় শক্তিগুলোকে নিজেদের আশপাশের অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিলে বিশ্বে স্থিতিশীলতা বজায় থাকতে পারে।

কিন্তু এই ধারণার বড় দুর্বলতা হলো, এতে ছোট দেশগুলোর স্বাধীনতা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইউক্রেন, তাইওয়ান কিংবা কানাডার মতো দেশ ও অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক দেখিয়েছে, বড় শক্তির স্বার্থ এবং ছোট দেশগুলোর নিজস্ব আকাক্সক্ষা সব সময় এক হয় না। কোনো দেশকে অন্যের আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য করা হলে প্রতিরোধ ও পাল্টা সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যায়।

আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক সমাধানের গুরুত্ব এখানেই। সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে কোনো বিরোধ দমন করা গেলেও তার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত হয় না। মিত্রদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা : বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ার আরেকটি কারণ হলো, কোনো দেশ আক্রান্ত হলে তার মিত্ররা কতটা দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা।

সামরিক জোটের পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার দুর্বল বলে মনে হলে প্রতিপক্ষ ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হতে পারে। আবার সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সরাসরি যুদ্ধে নামতে হলে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ইতিহাসে প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে কূটনৈতিক হিসাব, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিপক্ষের মনোভাব ভুলভাবে মূল্যায়নের পরিণতি ভয়াবহ হয়েছিল।

বর্তমান বিশ্বেও একই ধরনের ভুল হিসাব বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। মহাযুদ্ধ ঠেকানোর পথ কূটনীতি : বিশ্ব এখনো তৃতীয় মহাযুদ্ধের অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে একাধিক অঞ্চলে সংঘাত, পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস যে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সংলাপ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং সংঘাত নিরসনের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা এবং ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সম্মান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত বিশ্বশান্তি নির্ভর করবে শক্তিধর দেশগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে তার ওপর। যুদ্ধের আশঙ্কা কমাতে হলে হুমকি ও শক্তি প্রদর্শনের বদলে কূটনীতি, পারস্পরিক আস্থা এবং আলোচনাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।