রাজধানীর ভাটারায় পুলিশ হাউজিং প্রকল্পে অতিরিক্ত ডিআইজি (বর্তমানে সংযুক্ত) আবদুল্লাহ আল জহিরের আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়িতে মাদকের হাট বসে ২০২৫ সাল থেকে। বাড়ির ম্যানেজার মাহবুবুল আলম অনলাইন রেজিস্ট্রিশনের মাধ্যমে ভাড়া নেওয়া গেস্টদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকতেন।
উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীদের বিভিন্ন গ্রুপ ভাড়া নিয়ে বাড়িটির বিভিন্ন রুমে কখনো ডিজে পার্টি, কখনো মাদকের আসর, আবার কখনো অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালাতেন। গত প্রায় দুই বছরে প্রতি মাসে গড়ে কমপক্ষে ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টির জন্য বাড়িটি বুকিং থাকত। আর এসব পার্টির অন্তরালে ইয়াবা, কুশ, সিসাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবন, অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আস্তানা হয়ে উঠেছিল অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের ডুপ্লেক্স বাড়িটি।
বিষয়টি জানলেও কখনো এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে উদ্যোগী ছিলেন না তিনি। তবে তার ঘনিষ্ঠজনদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের কোনো কিছুই জানতেন না তিনি। অভ্যন্তরীণ বিরোধে তাকে এ ঘটনায় ফাঁসানো হয়েছে। অভিযানের সময় নিয়ম মেনে অভিযান করা হয়নি। গত মঙ্গলবার ভোরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি উত্তর) আকস্মিক অভিযান চালায় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের ডুপ্লেক্স বাড়িতে।
অভিযানের সময় মাদক সেবন, অসামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা অবস্থায় ৮৫ নারী-পুরুষকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় বাড়িটি থেকে বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের মাদক ও সেবনের সামগ্রী জব্দ করে ডিবি। পরে আটককৃতদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও জরিমানা করে জেলে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেলেই অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সংযুক্ত করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরে।
এ ঘটনায় দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে মাদকের হাট বসিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে পুলিশ বাহিনীও। এদিকে আলোচিত এই অভিযানের ঘটনায় মাদক উদ্ধার এবং আটককৃতদের সাজা দেওয়া হলেও কোনো মামলা হয়নি। বাড়িটির ম্যানেজার আটক হলেও মূল মালিক আবদুল্লাহ আল জহিরের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি।
তার বিরুদ্ধে মামলা হবে কি না, সে বিষয়ে অভিযান পরিচালনকারী ডিবির কর্মকর্তারা কিছু বলতে পারছেন না। সাড়ে ৩ কাঠার ডুপ্লেক্স বাড়িতে মাদক আর নারীদের হাট চলছিল প্রায় ২ বছর ধরে : রাজধানীর ভাটারায় ৩০০ ফিট পূর্বাচল এলাকায় গড়ে ওঠে পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১। বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা সেখানে প্লট কিনেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত থাকা অবস্থায় সাড়ে ৩ কাঠার একটি প্লট কেনেন আবদুল্লাহ আল জহিরও।
সেখানে তিনি গোল্ডেন সানরাইজ নামে ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করার পর অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে রুম ভাড়া দিতেন। বাড়িটিতে মাহবুবুল আলম নামের এক ব্যক্তি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ডিবির উপ-কমিশনার ইলিয়াস কবির জানান, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন প্রতিষ্ঠান এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের তথ্য পেয়েছেন তারা।
বাড়িটির ম্যানেজার মাহবুবুল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে সেখানে এ ধরনের আয়োজন চলছিল। প্রতি মাসে প্রায় ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো। আর এসব পার্টির আড়ালে চলছিল মাদক সেবন, উচ্চশব্দে নাচগান। অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিবন্ধনকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়া হতো। একটি আয়োজনে প্রায় ১০০ জন অংশ নিলে নিবন্ধন ফি থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ আসত।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ৩০০ ফিট এলাকায় পুলিশ অফিসার্স হাউজিং নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয় আওয়ামী লীগের সময়ে। সেখানে প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তার কেউ তিন কাঠা, কেউ পাঁচ কাঠার জমি কেনেন। অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরও সাড়ে তিন কাঠার প্লট নিয়েছেন। সেখানে তিনি স্টিলের স্ট্যাকচার দিয়ে আড়াই তলা ডুপ্লেক্স বাড়িটি মূলত গেস্টহাউস বা রিসোর্ট আদলে করেছেন।
অত্যাধুনিক ইনটেরিয়র ডিজাইন, দামি আসবাবপত্রে সাজানো পাঁচটি রুম তৈরি করে তা অলাইনে স্বল্প সময়ের জন্য ভাড়া দিতেন। মূলত এটি করা হয়েছে দেশি-বিদেশি কেউ স্বল্প সময়ের জন্য যাতে রুম ভাড়া নিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু সেখানে মূলত তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন ডিজে পার্টির জন্য ভাড়া নিয়ে নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালাতেন। বিষয়টি তিনি জানলেও চুপচাপ ছিলেন।
কারণ এতে তার ভালোই আয় হচ্ছিল। অধিকাংশ সময় ভাড়া নিত তরুণ-তরুণীদের গ্রুপগুলো : আড়াইতলা ডুপ্লেক্স বাড়িটি অনলাইনে বুকিংয়ের মাধ্যমে দেশি-বিদেশিরা ভাড়া নিতেন। কেউ সেখানে রাতযাপন করতেন, আবার কেউ আয়োজন করতেন ডিজে পার্টির। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী, উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের ছেলে-মেয়েদের গ্রুপগুলো অধিকাংশ সময় নিবন্ধনের মাধ্যমে বুকিং দিতেন।
তারা ডিজে পার্টির অন্তরালে মাদক সেবন ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড চালাতেন। এলাকাটি নীরব হওয়ার কারণে অনেকে গাড়ি নিয়ে গিয়ে সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড করতেন। বাড়িটি থেকে আয়ের একটি বড় অংশ আব্দুল্লাহ আল জহিরের ব্যাংক হিসাবে জমা হতো। গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, অনলাইনের মাধ্যমে ভাড়া নিয়ে বাড়িটিতে উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীরা পার্টির আয়োজন করতেন।
এসব আয়োজনের আড়ালে অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও মাদক সেবন চলত। বাড়িটিতে মোট পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। অনলাইনে বুকিংয়ের মাধ্যমে কক্ষগুলো ভাড়া দেওয়া হতো। একটি কক্ষ একসঙ্গে ১০ জন পর্যন্ত ভাড়া নিতেন। অতিরিক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা করে নিবন্ধন ফি নেওয়া হতো। দুপুর ১২টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা বা ১১টা পর্যন্ত এসব পার্টি চলত। মাসে ১৮ থেকে ২০টি আয়োজন হতো এবং প্রতিটি আয়োজনের জন্য প্রায় ১ লাখ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো বলে তথ্য পেয়েছেন তারা।
তারা ১০ জনের কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়ার তথ্য পেয়েছেন এক রাতের জন্য। অভিযানের সময় অর্ধনগ্ন তরুণ-তরুণীরা ছিলেন সিসা, ইয়াবা সেবনে ব্যস্ত : ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে মঙ্গলবার গভীর রাতে বাড়িটিতে অভিযান চালায় ডিবির টিম। অভিযানের সময় বাড়িটিতে মিউজিকের তালে তালে তখন তরুণ-তরুণীরা নাচানাচিতে ব্যস্ত ছিলেন।
উল্লাসে থাকা তরুণ-তরুণীদের অনেকেই সিসা, ইয়াবা, গাঁজা সেবনসহ অর্ধনগ্ন হয়ে নাচানাচি করছিলেন। পুলিশ যাওয়ার পর নাচগান বন্ধ হয়ে যায়। উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, যখন পুুলিশ অভিযান চালায়, তখন ওই পার্টিতে থাকা ৮৫ জন নারী-পুরুষের মধ্যে উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীরা সিসার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন প্রতিটি কক্ষে অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় নাচানাচি করছিলেন।
অভিযানে আটককৃতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন পেশার যুবক-যুবতী ছিলেন। এর মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়েও ছিলেন। ডিবি জানিয়েছে, আটকদের মধ্যে ২৬ জন তরুণী ছিলেন। তাদের বেশির ভাগের বয়স ২০ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও ছিলেন।
এ ছাড়া ব্যাংকারসহ বিভিন্ন পেশার তরুণ-তরুণী ছিলেন। অভিযানের সময় সেখানে আইকনিক ব্র্যান্ডের মদের বোতল, কেরু মদের বোতল, কুশ ও ইয়াবা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কনডমও উদ্ধার করা হয়েছে। আটককৃতদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা : এদিকে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাসা থেকে আটক ৮৫ জনের মধ্যে ছেলেদের এক মাসের কারাদণ্ড এবং ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ১৫ দিন কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মেয়েদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিন দিন কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়েছে। কে এই অতিরিক্ত ডিআইজি আবুদল্লাহ আল জহির : এদিকে অতিরিক্ত ডিআইজির ডুপ্লেক্স বাড়িতে অভিযানের পর আলোচনায় আসা আবদুল্লাহ আল জহির নতুন করে আলোচনায় এসেছেন।
আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধায় থাকা বিসিএস ২৪ ব্যাচের এই পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায়। ২০০৫ সালে তিনি এএসপি হিসেবে পুলিশে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগের সময়ে তিনি সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেছুর রহমানের স্টাফ অফিসার ছিলেন। এরপর পুলিশ সদর দপ্তরসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সুবিধাজনক পদায়ন পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হিসেবে পদোন্নতি পাওয়াসহ জেলায় এসপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০২৪-এ পট পরিবর্তনের পর তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পার্সোনাল ম্যানেজম্যান্ট শাখায় কর্মরত ছিলেন।

























