রংপুর নগরীর ব্যস্ততম শাপলা চত্বর। এই চত্বরের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বহু বছরের পুরোনো ‘শাপলা টকিজ’ ভবনটি শুধু ইট-পাথরের কোনো কাঠামো ছিল না; এটি ছিল উত্তরবঙ্গের চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের আবেগ, স্মৃতি আর বিনোদনের এক মস্ত বড় আশ্রয়। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় সেই রুপালি পর্দার আলো চিরতরে নিভে গেল। গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাতে শেষবারের মতো সিনেমা প্রদর্শনের পর হলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ। আর এই বন্ধের মধ্য দিয়ে উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বিভাগীয় শহর রংপুর এখন পরিণত হলো সম্পূর্ণ এক প্রেক্ষাগৃহহীন জনপদে। হলটির মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সাইদুর রহমান সুমন জানান, হলটি ভাড়ায় পরিচালনা করা হচ্ছিল। কিন্তু ভাড়াটিয়া চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলবে, তা মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। রংপুর চেম্বারের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই হলটি বন্ধ করা হয়েছে। ১৯৭৮ সালের ১৬ জুন ব্যবসায়ী মাসুম মিয়ার হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছিল শাপলা টকিজ। উদ্বোধনের পর থেকেই হলটি দ্রুত জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায়। একসময় নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই এখানে তিল ধারণের জায়গা থাকত না। টিকিট কাটার জন্য কাউন্টারের সামনে তৈরি হতো দীর্ঘ লাইন, চলত টিকিট কালোবাজারিও। দেশের নামি-দামি তারকারা বহুবার পা রেখেছেন এই প্রাঙ্গণে। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠাতা মাসুম মিয়ার মৃত্যুর পর তার পরিবার হলটির হাল ধরে এবং পরবর্তীতে এটি লিজ দেওয়া হয়। প্রায় ৪৮ বছর ধরে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রংপুরের তিন প্রজন্মের মানুষকে বিনোদন জুগিয়েছে এই প্রেক্ষাগৃহ। রংপুরের সিনেমা হলের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ ছিল। একসময় এই অঞ্চলে মডার্ন হল, দরদী হল, ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজ, নূর মহল, চায়না টকিজ, সেনাহলসহ প্রায় ১০টি সিনেমা হল দাপটের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করত। বিনোদনপিপাসু সাধারণ মানুষের অবসর কাটানোর প্রধান মাধ্যমই ছিল এসব প্রেক্ষাগৃহ। কিন্তু গত দুই দশকে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, ক্যাবল টেলিভিশন এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দাপটের কারণে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। সেই সঙ্গে যোগ হয় ভালো মানের ও রুচিশীল সিনেমার অভাব। ব্যবসায়িক মন্দা সামলাতে না পেরে একে একে বন্ধ হয়ে যায় রংপুরের অন্যসব হল। শাপলা টকিজ একাই শেষ প্রদীপ হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ক্রমাগত লোকসান আর দর্শক খরায় শেষ পর্যন্ত সেটিও আর টিকতে পারল না। এছাড়া হলটির রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সাম্প্রতিক সময়ে লিজগ্রহীতার বিরুদ্ধে ওঠা কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও হলটি দ্রুত বন্ধ করার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে জানা যায়। একটি বিভাগীয় শহর পুরোপুরি সিনেমা হলশূন্য হয়ে পড়ার এই খবর রংপুরের সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের মনে গভীর দাগ কেটেছে। স্থানীয় প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, শাপলা টকিজ বন্ধ হওয়া মানে রংপুরের একটি দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সমাপ্তি ঘটা। এটি শুধু একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল এই শহরের যৌথ স্মৃতির অংশ। তরুণ প্রজন্মের অনেকে হতাশা প্রকাশ করে বলছেন, আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স বা সুস্থ বিনোদনের কোনো বিকল্প অবকাঠামো তৈরি না করেই একের পর এক ঐতিহ্যবাহী হল বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি শহরের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বকেই স্পষ্ট করে তোলে। শাপলা টকিজের দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুরের রুপালি পর্দার যুগের আপাতত সমাপ্তি ঘটল। প্রেক্ষাগৃহের কর্মীরা কাজ হারিয়েছেন, আর শহরটি হারিয়েছে তার দীর্ঘদিনের চেনা এক বিনোদন কেন্দ্র। প্রযুক্তির এই যুগে ওটিটি বা মোবাইল স্ক্রিন হয়তো সিনেমার অভাব পূরণ করছে, কিন্তু সিনেমা হলের সেই যৌথ উল্লাস, টিকিটের দীর্ঘ লাইন আর অন্ধকার ঘরে বিশাল পর্দায় বুঁদ হয়ে থাকার যে রোমাঞ্চ—তা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হলো রংপুরবাসী। এই শূন্যতা কাটাতে ভবিষ্যতে কোনো আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স বা সরকারি উদ্যোগে কোনো প্রেক্ষাগৃহ গড়ে উঠবে কি না, সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে।
2:25 am, Monday, 3 August 2026
শিরোনাম :
Popular Post


















