২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ঘোষিত ফলাফলে সাতক্ষীরা জেলায় সার্বিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৩.৪৫ শতাংশ। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেলাজুড়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন।
তবে সার্বিক পাসের নিম্নহার এবং জেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করার বিষয়টি স্থানীয় শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও সুশীল সমাজের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী স্বাক্ষরিত ফলাফল বিবরণী পর্যালোচনা করে জানা যায়, এ বছর সাতক্ষীরা জেলার মোট ২৩টি কেন্দ্রের অধীনে ৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১১,৫৯১ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।
এর মধ্যে পরীক্ষায় চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেছেন ৫,০৩৬ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, জেলায় অকৃতকার্য হয়েছেন ৬,৫৫৫ জন শিক্ষার্থী, যা শতাংশের হিসাবে ৫৬.৫৫%। লিঙ্গভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর জেলায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের দিক থেকে ছাত্ররা এগিয়ে থাকলেও পাসের হারের বিচারে তুলনামূলক ভালো ফল করেছেন ছাত্রীরা। ছাত্রদের তথ্য: মোট অংশ নেওয়া ৫,৯২৪ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ২,১৫৭ জন।
ছাত্রদের পাসের হার ৩৬.৪১ শতাংশ। অন্যদিকে, ৫,৬৬৭ জন ছাত্রী অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২,৮৭৯ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ৫০.৮০ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও পাসের সংখ্যা—উভয় বিচারেই ছাত্রীরা এগিয়ে থেকে জেলার প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলে মূল ভূমিকা রেখেছেন। এবারের ফলাফলের সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে জেলার দুটি কলেজে, যেখান থেকে অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই পাসের মুখ দেখতে পাননি (জিরো পার্সেন্ট পাস)।
শিক্ষা বোর্ডের তালিকা অনুযায়ী: ইসলামিয়া মহিলা কলেজ (সদর উপজেলা): মোট ৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন, যাদের সকলেই অকৃতকার্য হয়েছেন। এবং. এ কে ফজলুল হক এমসি কলেজ (শ্যামনগর উপজেলা): মোট ৪৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ৪৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে একজনও পাস না করাকে শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবহেলা ও তদারকির অভাব হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
সামগ্রিকভাবে যশোর শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৪৪.৯২ শতাংশ, যেখানে জিপিএ-৫ লাভ করেছেন ৩,২২৮ জন শিক্ষার্থী। পুরো বোর্ডের অধীনে মোট ১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য। যশোর বোর্ডের সার্বিক পাসের হারের (৪৪.৯২%) চেয়ে সাতক্ষীরা জেলার পাসের হার (৪৩.৪৫%) কিছুটা নিচে। বোর্ডের সার্বিক চিত্রে সাতক্ষীরা জেলার এই অবস্থান স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও তদারকির অভাবকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
জেলায় ফলাফলের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদরা। তারা জানান, করোনাপরবর্তী শিখন ঘাটতি, গ্রামীণ এলাকার কলেজগুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব, পাঠদানে অনিয়ম এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতিই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘জিরো পার্সেন্ট’ পাস এসেছে, সেগুলোর পাঠদান পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষক পদের শূন্যতা এবং প্রশাসনিক নজরদারি কঠোরভাবে পুনঃনিরীক্ষা করা জরুরি।
অবিলম্বে শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এসব কলেজের একাডেমিক স্বীকৃতি স্থগিত করা বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।





















