আজ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
৭ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৩৯%

রাজনীতির সহিংসতায় অপরাধের জন্ম

  • MIT ERP
  • Update Time : 09:58:55 pm, Wednesday, 21 October 2026
  • 25

রাজনীতির সহিংসতায় অপরাধের জন্ম

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রাজনীতির উত্তাল মাঠে যখন কোনো কর্মী নিহত হন, নিখোঁজ হন কিংবা বছরের পর বছর কারান্তরালে থাকেন, তখন দলীয় কার্যালয় বা রাজপথে তৈরি হয় সাময়িক শোক ও প্রতিবাদের ঝড়। সভা-সমাবেশে প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়, সংবাদমাধ্যমগুলোতেও আসে বিভিন্ন শিরোনাম।

কিন্তু ক্যামেরার আলো ও মাইক সরে যাওয়ার পর কী ঘটে, সেই পরিবারগুলোর জীবনে? রাজনীতিতে ‘শহিদ’ বা ‘ত্যাগী’ হিসেবে চিহ্নিত কর্মীদের রেখে যাওয়া স্ত্রী-সন্তানেরা কীভাবে বেঁচে আছেন, সেই খবর রাখে না কেউই। রাজনীতির খেসারত দিতে গিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ছে একেকটি প্রজন্ম, নিঃস্ব হয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন শত শত নারী ও তাদের সন্তানেরা।

রাজনৈতিক মামলার জালে আটকে পড়া কিংবা রাজপথের সংঘর্ষে প্রাণ হারানো অনেক কর্মীর পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি এক লহমায় ধসে পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি কারাগারে বা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অনেকের স্ত্রীকে নামতে হয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। আর তাদের সন্তানেরা নামে অপরাধের পথে। মূলত নামতে হয় না, তাদের ঠেলে দেওয়া হয়।

রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটাও একটা বড় কারণ— এমনটাই বলছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এটা এক ধরনের রাজনীতির ক্ষত। রাজনীতির এই ক্ষতের কারণেই বৃদ্ধি পাচ্ছে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা। বেসরকারি সংস্থা হেল্ড ফর ইউ সম্প্রতি কিশোর গ্যাং নিয়ে একটি জরিপ চালিয়েছে। এই সংস্থার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট রুনা আক্তার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজধানীর একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে সক্রিয় কর্মী ছিলেন সুমন।

তিন বছর আগে রাজপথের এক সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। সুমনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রাবেয়া দুই সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন। প্রথম কয়েক মাস দল থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা মিললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ হয়ে যায়। ঘরভাড়া দিতে না পেরে এবং সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে রাবেয়া এখন অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করছেন। আর সুমনের ছেলে রাজন লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এখন কিশোর গ্যাংয়ের পেশাদার সদস্য।

রুনা আক্তার বলেন, এটি একটি উদাহরণ মাত্র। এ রকম হাজারো ঘটনা উঠে এসেছে তাদের জরিপে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা এলাকায় অভিযানে যেসব কিশোর অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশই এ ধরনের পরিবার থেকে আসা। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতি করে যারা টাকার পাহাড় গড়েছেন, তাদের কথা ভিন্ন। তারা বা তাদের পরিবার দেশে অথবা দেশের বাইরে যেখানেই থাকুন, রাজকীয় হালেই থাকেন।

কিন্তু এই সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা। কিন্তু রাজপথের আসল লড়াকু রাজনীতিবিদ বা দলীয় কর্মীদের পরিবারের চিত্র ভিন্ন। তাদের জমানো শেষ সম্বলটুকু শেষ হয়ে যায় আইনি লড়াইয়ে, জামিনের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ের খরচ জোগাতে ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। এর ওপর যুক্ত হয় এক অদৃশ্য সামাজিক অবহেলা ও ভীতি। গৃহিণী থেকে রাতারাতি অন্যের বাড়িতে কাজ নেওয়া বা অতি অল্প মজুরিতে পোশাক কারখানা কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য হন এসব নারী।

অনেকে বেছে নেন নানা অনৈতিক পথ। আর সন্তানেরা কোথাও কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেছে নেয় অপরাধের পথ। রাজধানীর ভাটারা থানার সোলমাইদ এলাকার গৃহবধূ সাজেদা খাতুন। স্বামী কারাগারে। রাজনীতি করতেন, এখন হত্যামামলায় আটক। আটটি মামলা তার বিরুদ্ধে। তিন সন্তান নিয়ে বাস করেন ভাড়াবাড়িতে। মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। এক ছেলে কলেজে যাওয়া বন্ধ করে এখন অটোরিকশা চালান।

আরেক ছেলে যোগ দিয়েছে মাদক ও কিশোর অপরাধীদের দলে। সাজেদার ভাষায়, ‘আগে দলের অনেক নেতাকর্মী আসতেন। স্বামী যখন রাজপথে বা জেলে, তখন ঘরে খাবার আছে কি না, তা জানার জন্য কোনো নেতা আসেন না। নেতাদের কাছে তিনি একজন ‘সংগ্রামী কর্মী’; কিন্তু আমার ও আমার সন্তানদের কাছে তিনি বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়। ’ নেতৃস্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীবিদদের ‘ব্যবহার করো ও ছুড়ে ফেলো’ সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা করেছেন সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজনীতির নির্মম শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। যেসব পরিবারে উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে, সেসব পরিবারের শিশুদের পড়াশোনা প্রথম ধাক্কাতেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নামি স্কুল বা কলেজ থেকে নাম কাটিয়ে তাদের ভর্তি হতে হচ্ছে সস্তা প্রতিষ্ঠানে কিংবা বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে শিশুশ্রমে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো সামাজিক ট্রমা ও মানসিক নির্যাতন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠী এবং পাড়া-মহল্লায় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এসব শিশু প্রতিনিয়ত ‘রাজনৈতিক অপরাধীর সন্তান’ বা ‘সন্ত্রাসীর বাচ্চা’র মতো কটূক্তি শুনছে। এর ফলে তাদের মধ্যে একধরনের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও হীনম্মন্যতা তৈরি হচ্ছে। মানসিক ট্রমা, বাবার অনুপস্থিতি এবং সামাজিক অবহেলার কারণে এসব শিশু-কিশোরের একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে বিষণ্নতা, তীব্র ক্ষোভ, এমনকি অপরাধ জগতের দিকে ঝুঁকে পড়ার চরম ঝুঁকিতে থাকে।

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি আমাদের রাজনীতি ও সামাজিক কাঠামোর এক চরম দেউলিয়াত্ব। একটি দল যখন তার কর্মীর পরিবারের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজে নীতি-নৈতিকতার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যায়। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে পিতৃহীন বা অভিভাবকহীন হওয়া এই শিশুরা যখন দেখে তাদের বাবার আত্মত্যাগের কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক মূল্য নেই, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের তীব্র ঘৃণা তৈরি হয়।

এটি ভবিষ্যতে সমাজে চরম বৈষম্য ও অপরাধপ্রবণতা বাড়াতে ইন্ধন জোগায়। মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. রেজাউল হাসান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যে শিশুরা ছোটবেলা থেকে বাবাকে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হতে দেখে অথবা হঠাৎ বাবাকে হারিয়ে ফেলে, তারা দীর্ঘ মেয়াদে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে’ ভোগে। তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। এই ট্রমা কাটাতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে সমর্থন দরকার, বর্তমান সমাজে তা একেবারেই অনুপস্থিত।

কোনো কর্মী নিহত বা গুম হলে বা দীর্ঘ মেয়াদে কারাবন্দি থাকলে তার পরিবারের আইনি, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা পাওয়াটা তার মৌলিক অধিকারের অংশ হওয়া উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু ‘রাজনৈতিক ফায়দা’ হাসিল না করে একটি নির্দিষ্ট ‘কল্যাণ তহবিল’ গঠন করে এই পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া দরকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজনীতির মাঠে জয়-পরাজয়ের হিসাব কষা নেতারা হয়তো নতুন কৌশলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন; কিন্তু এই নিঃস্ব স্ত্রী ও বাবার নাম-পরিচয় লুকিয়ে বেড়ে ওঠা সন্তানদের কাছে ‘রাজনীতি’ মানেই এক অভিশাপের নাম। যদি এখনই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন না আসে এবং এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সামাজিক ও মানসিকভাবে পুনর্বাসিত করা না হয়, তবে এই ক্ষোভ ও সামাজিক অবক্ষয়ের মাশুল পুরো জাতিকেই দিতে হবে।

কিশোর অপরাধের এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, একটি পরিবার যখন অভিভাবকহীন বা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কিশোরদের কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের কারণে নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই ও একধরনের ‘অসম বন্ধুত্বের’ কারণে অপরাধচক্রে বা কিশোর গ্যাংয়ে জড়ানো সহজ হয়ে যায়।

স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে তাদের অবলীলায় নিজেদের স্বার্থে, দখলদারি বা চাঁদাবাজিতে ব্যবহার করে থাকেন। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিবারগুলোর এই শূন্যতাই কিশোরদের গ্যাং কালচারে নামানোর বড় হাতিয়ার। সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর কিংবা কুমিল্লার মতো অঞ্চলগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দেখা গেছে, আটক হওয়া কিশোরদের বড় অংশই এসেছে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মাঝে পড়া এই রাজনৈতিক পরিবারগুলো থেকে।

অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়কে তারা টিকে থাকার একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

খোলামেলা পোশাক ও ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নিয়ে মুখ খুললেন রাশমিকা মান্দানা

রাজনীতির সহিংসতায় অপরাধের জন্ম

Update Time : 09:58:55 pm, Wednesday, 21 October 2026

রাজনীতির উত্তাল মাঠে যখন কোনো কর্মী নিহত হন, নিখোঁজ হন কিংবা বছরের পর বছর কারান্তরালে থাকেন, তখন দলীয় কার্যালয় বা রাজপথে তৈরি হয় সাময়িক শোক ও প্রতিবাদের ঝড়। সভা-সমাবেশে প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়, সংবাদমাধ্যমগুলোতেও আসে বিভিন্ন শিরোনাম।

কিন্তু ক্যামেরার আলো ও মাইক সরে যাওয়ার পর কী ঘটে, সেই পরিবারগুলোর জীবনে? রাজনীতিতে ‘শহিদ’ বা ‘ত্যাগী’ হিসেবে চিহ্নিত কর্মীদের রেখে যাওয়া স্ত্রী-সন্তানেরা কীভাবে বেঁচে আছেন, সেই খবর রাখে না কেউই। রাজনীতির খেসারত দিতে গিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ছে একেকটি প্রজন্ম, নিঃস্ব হয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন শত শত নারী ও তাদের সন্তানেরা।

রাজনৈতিক মামলার জালে আটকে পড়া কিংবা রাজপথের সংঘর্ষে প্রাণ হারানো অনেক কর্মীর পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি এক লহমায় ধসে পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি কারাগারে বা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অনেকের স্ত্রীকে নামতে হয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। আর তাদের সন্তানেরা নামে অপরাধের পথে। মূলত নামতে হয় না, তাদের ঠেলে দেওয়া হয়।

রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটাও একটা বড় কারণ— এমনটাই বলছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এটা এক ধরনের রাজনীতির ক্ষত। রাজনীতির এই ক্ষতের কারণেই বৃদ্ধি পাচ্ছে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা। বেসরকারি সংস্থা হেল্ড ফর ইউ সম্প্রতি কিশোর গ্যাং নিয়ে একটি জরিপ চালিয়েছে। এই সংস্থার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট রুনা আক্তার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজধানীর একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে সক্রিয় কর্মী ছিলেন সুমন।

তিন বছর আগে রাজপথের এক সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। সুমনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রাবেয়া দুই সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন। প্রথম কয়েক মাস দল থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা মিললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ হয়ে যায়। ঘরভাড়া দিতে না পেরে এবং সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে রাবেয়া এখন অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করছেন। আর সুমনের ছেলে রাজন লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এখন কিশোর গ্যাংয়ের পেশাদার সদস্য।

রুনা আক্তার বলেন, এটি একটি উদাহরণ মাত্র। এ রকম হাজারো ঘটনা উঠে এসেছে তাদের জরিপে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা এলাকায় অভিযানে যেসব কিশোর অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশই এ ধরনের পরিবার থেকে আসা। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতি করে যারা টাকার পাহাড় গড়েছেন, তাদের কথা ভিন্ন। তারা বা তাদের পরিবার দেশে অথবা দেশের বাইরে যেখানেই থাকুন, রাজকীয় হালেই থাকেন।

কিন্তু এই সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা। কিন্তু রাজপথের আসল লড়াকু রাজনীতিবিদ বা দলীয় কর্মীদের পরিবারের চিত্র ভিন্ন। তাদের জমানো শেষ সম্বলটুকু শেষ হয়ে যায় আইনি লড়াইয়ে, জামিনের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ের খরচ জোগাতে ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। এর ওপর যুক্ত হয় এক অদৃশ্য সামাজিক অবহেলা ও ভীতি। গৃহিণী থেকে রাতারাতি অন্যের বাড়িতে কাজ নেওয়া বা অতি অল্প মজুরিতে পোশাক কারখানা কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য হন এসব নারী।

অনেকে বেছে নেন নানা অনৈতিক পথ। আর সন্তানেরা কোথাও কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেছে নেয় অপরাধের পথ। রাজধানীর ভাটারা থানার সোলমাইদ এলাকার গৃহবধূ সাজেদা খাতুন। স্বামী কারাগারে। রাজনীতি করতেন, এখন হত্যামামলায় আটক। আটটি মামলা তার বিরুদ্ধে। তিন সন্তান নিয়ে বাস করেন ভাড়াবাড়িতে। মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। এক ছেলে কলেজে যাওয়া বন্ধ করে এখন অটোরিকশা চালান।

আরেক ছেলে যোগ দিয়েছে মাদক ও কিশোর অপরাধীদের দলে। সাজেদার ভাষায়, ‘আগে দলের অনেক নেতাকর্মী আসতেন। স্বামী যখন রাজপথে বা জেলে, তখন ঘরে খাবার আছে কি না, তা জানার জন্য কোনো নেতা আসেন না। নেতাদের কাছে তিনি একজন ‘সংগ্রামী কর্মী’; কিন্তু আমার ও আমার সন্তানদের কাছে তিনি বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়। ’ নেতৃস্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীবিদদের ‘ব্যবহার করো ও ছুড়ে ফেলো’ সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা করেছেন সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজনীতির নির্মম শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। যেসব পরিবারে উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে, সেসব পরিবারের শিশুদের পড়াশোনা প্রথম ধাক্কাতেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নামি স্কুল বা কলেজ থেকে নাম কাটিয়ে তাদের ভর্তি হতে হচ্ছে সস্তা প্রতিষ্ঠানে কিংবা বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে শিশুশ্রমে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো সামাজিক ট্রমা ও মানসিক নির্যাতন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠী এবং পাড়া-মহল্লায় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এসব শিশু প্রতিনিয়ত ‘রাজনৈতিক অপরাধীর সন্তান’ বা ‘সন্ত্রাসীর বাচ্চা’র মতো কটূক্তি শুনছে। এর ফলে তাদের মধ্যে একধরনের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও হীনম্মন্যতা তৈরি হচ্ছে। মানসিক ট্রমা, বাবার অনুপস্থিতি এবং সামাজিক অবহেলার কারণে এসব শিশু-কিশোরের একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে বিষণ্নতা, তীব্র ক্ষোভ, এমনকি অপরাধ জগতের দিকে ঝুঁকে পড়ার চরম ঝুঁকিতে থাকে।

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি আমাদের রাজনীতি ও সামাজিক কাঠামোর এক চরম দেউলিয়াত্ব। একটি দল যখন তার কর্মীর পরিবারের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজে নীতি-নৈতিকতার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যায়। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে পিতৃহীন বা অভিভাবকহীন হওয়া এই শিশুরা যখন দেখে তাদের বাবার আত্মত্যাগের কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক মূল্য নেই, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের তীব্র ঘৃণা তৈরি হয়।

এটি ভবিষ্যতে সমাজে চরম বৈষম্য ও অপরাধপ্রবণতা বাড়াতে ইন্ধন জোগায়। মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. রেজাউল হাসান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যে শিশুরা ছোটবেলা থেকে বাবাকে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হতে দেখে অথবা হঠাৎ বাবাকে হারিয়ে ফেলে, তারা দীর্ঘ মেয়াদে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে’ ভোগে। তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। এই ট্রমা কাটাতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে সমর্থন দরকার, বর্তমান সমাজে তা একেবারেই অনুপস্থিত।

কোনো কর্মী নিহত বা গুম হলে বা দীর্ঘ মেয়াদে কারাবন্দি থাকলে তার পরিবারের আইনি, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা পাওয়াটা তার মৌলিক অধিকারের অংশ হওয়া উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু ‘রাজনৈতিক ফায়দা’ হাসিল না করে একটি নির্দিষ্ট ‘কল্যাণ তহবিল’ গঠন করে এই পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া দরকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজনীতির মাঠে জয়-পরাজয়ের হিসাব কষা নেতারা হয়তো নতুন কৌশলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন; কিন্তু এই নিঃস্ব স্ত্রী ও বাবার নাম-পরিচয় লুকিয়ে বেড়ে ওঠা সন্তানদের কাছে ‘রাজনীতি’ মানেই এক অভিশাপের নাম। যদি এখনই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন না আসে এবং এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সামাজিক ও মানসিকভাবে পুনর্বাসিত করা না হয়, তবে এই ক্ষোভ ও সামাজিক অবক্ষয়ের মাশুল পুরো জাতিকেই দিতে হবে।

কিশোর অপরাধের এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, একটি পরিবার যখন অভিভাবকহীন বা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কিশোরদের কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের কারণে নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই ও একধরনের ‘অসম বন্ধুত্বের’ কারণে অপরাধচক্রে বা কিশোর গ্যাংয়ে জড়ানো সহজ হয়ে যায়।

স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে তাদের অবলীলায় নিজেদের স্বার্থে, দখলদারি বা চাঁদাবাজিতে ব্যবহার করে থাকেন। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিবারগুলোর এই শূন্যতাই কিশোরদের গ্যাং কালচারে নামানোর বড় হাতিয়ার। সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর কিংবা কুমিল্লার মতো অঞ্চলগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দেখা গেছে, আটক হওয়া কিশোরদের বড় অংশই এসেছে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মাঝে পড়া এই রাজনৈতিক পরিবারগুলো থেকে।

অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়কে তারা টিকে থাকার একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয়।