নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের শরীরে মোট ছয়টি গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি তার শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি গুলি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
মামলায় সাত থেকে আটজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ কাজ করছে। এর আগে শুক্রবার বিকেলে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে আলিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়।
পরে কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, আলিফের বুকে তিনটি গুলির ক্ষত ছিল। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং অন্যটি পিঠের ভেতরে আটকে থাকে। এ ছাড়া কপালের ডান দিক দিয়ে ঢুকে একটি গুলি মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাকি দুটি গুলির একটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
ক্ষত পরীক্ষা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সামনের দিক থেকে পিস্তল দিয়ে তাকে গুলি করা হয়েছিল। নিহত আলিফ বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন।
কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের বাসিন্দা আলিফ মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। তেলনজিয়া এলাকায় তার শ্বশুরবাড়ি। যেভাবে হামলার শিকার হন আলিফ প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে বসে চা পান করেন আলিফ। সেখান থেকে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের দিকে রওনা হলেও নিজের মুঠোফোন দোকানে ফেলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রায় তিন মিনিটের মধ্যে ফিরে আসেন তিনি।
ফোন নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় সেখানে হাজির হয় দুই যুবক। তারা দোকানদারের কাছে সিগারেট চাওয়ার পর আলিফকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা আলিফকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডটিকে পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন সাংবাদিক আলিফ এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হয়েছিলেন আলিফ।
ওই সময় তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়েছিল। এ ঘটনায় আলিফ বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে পুলিশ এজাহারে নাম থাকা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন। স্বামী হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন আনন্দিতা সাংমা।
দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ জীবন কীভাবে সামলাবেন, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। আলিফের বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকিরের দাবি, সাংবাদিকতার কারণে তার ভাইয়ের অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল। ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।






















