ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের যে রূপরেখা সরকার নিয়েছে, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরাও তার মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত। বাংলাদেশে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কলকারখানা চালু করা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়াও সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত রূপরেখা রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলে এই রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে মিল রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা চায়, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় বাড়াতে চায়, সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়।
একই সঙ্গে বন্ধ কলকারখানা চালুর প্রত্যাশাও রয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি অনুমোদন করে আইএমএফ। ২০২২ সালের জুলাই মাসে ঋণসহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। সেই ঋণের ৭ কিস্তির মধ্যে ৫ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ঋণ কর্মসূচির আকার ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়।
কিন্তু পরিবর্তিত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসহ কঠিন শর্তের কারণে বর্তমান সরকার তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি। গত এপ্রিল মাসে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় তা জানিয়ে দেয় সরকার। পুরোনো ঋণ বাতিলের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ডিসেম্বর মাসে নতুন নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি হতে পারে।
এখন শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। শর্তের মধ্যে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া; রাজস্বনীতি ও আদায় আলাদা করা; করছাড় যৌক্তিক করা; দেউলিয়া আইন করা; সরকারের ভর্তুকি কমানো। এসব শর্ত পুরোনো ঋণ কর্মসূচিতেই ছিল।
কিন্তু সেই শর্ত পূরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। ওই সময়সীমায় এসব সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। নতুন ঋণের ক্ষেত্রে এসব সংস্কার করতে বাড়তি সময় পাওয়া যাবে। পুরোনো ঋণ বাতিলের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে এই কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রাথমিক আলোচনা চলছে। নতুন কর্মসূচির মেয়াদ হবে তিন বছর। গত ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য চিঠি দেয় সরকার।
তখন আইএমএফের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হয়েছিল। ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার, ভর্তুকি কমানোসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতার কারণে আগের ঋণ কর্মসূচি এগোয়নি। সেই একই ধরনের সংস্কারের কথা এবারও বলবে আইএমএফ। তাদের অবস্থানের পরিবর্তন তো হবে না। একই ধরনের সংস্কারের অগ্রাধিকারের কথা দেশের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন।
এসব সংস্কার করতেই হবে। এসব সংস্কার আটকে রেখে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা করা সময়ের অপচয়। এসব সংস্কার জাতীয় স্বার্থেই করতে হবে। আইএমএফের মতো সংস্থা থাকলে একটি সময়সীমা থাকে, সংস্কারের চাপ থাকে। রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি নেই, খরচের চাপ সামলাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার চাপ বাড়ছে। আগামী নভেম্বর মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে বলে জানা গেছে।
ওই সফরেই ঋণের সংস্কার ও শর্ত চূড়ান্ত হবে। চূড়ান্ত দর-কষাকষি শেষে আগামী ডিসেম্বর মাসে ঋণচুক্তি হতে পারে। পুরোনো ঋণের আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো ৫৫০ কোটি ডলারের সব কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা ছিল। সেই ঋণের কিস্তি পেতে কিছু সংস্কার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার শর্তও দিয়েছিল আইএমএফ। অনেক সংস্কার সময়মতো হয়নি। যেমনÑ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও আদায় বিভাগ আলাদা করার শর্ত ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। ২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে যৌক্তিকভাবে সব ধরনের করছাড় বাদ দেওয়ার শর্ত ছিল। সেটিও তেমন একটা এগোয়নি। আবার প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আধা শতাংশের সমান অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের কথা ছিল, তা-ও হয়নি। এদিকে ব্যাংক খাতে বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্তও পূরণ হয়নি।
তবে ব্যাংক খাতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন হয়েছে, পাঁচ ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। কিন্তু জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানো বা যৌক্তিক করায় তেমন একটা অগ্রগতি হয়নি; বরং ভর্তুকি বেড়েছে। গত মে মাসে যখন নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার, তখন অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছিল, পুরোনো কর্মসূচিটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত দেশি প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়। ব্যাংক খাতের অর্থ লুটপাটের দায় থেকে রেহাই পাবে না কোনো সরকারই। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কারোরই তুলনা করা যাচ্ছে না। তখন সব ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লুটপাট হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে চরম ব্যর্থ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
সে সময়ের সরকারের চাওয়া মেনে লুটপাটের সব ধরনের অনুমোদন দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে দেশে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এই মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই দেশের মাত্র ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। সব মিলিয়ে বিশ্বে এখন সর্বোচ্চ ঋণখেলাপির দেশ আমরা। এর দায় অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের।
সেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এখন বলছেন, জনগণের অর্থ লুটপাট হয়েছে, আর সেই লুটপাটের টাকা জনগণকেই দিতে হবে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ভাষায়, জনগণকে জরিমানা দিতে হবে। এই জরিমানার একটি হিসাবও দিয়েছেন তিনি। অঙ্কটি বেশ বড়। প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে ধসে পড়া ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে। আর এই অর্থ দিতে হবে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ধরে।
দেশের জনসংখ্যা ধরে হিসাব করলে মাথাপিছু জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৪৩২ টাকা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণের করের টাকা না নিলে এই অর্থ কি কোনো দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ হিসাবে পাবে? পাবে না। কারণ, এখন কোনো দাতা সংস্থাই লুটপাট হওয়া ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটাতে ঋণ দেবে না। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য বিশ্বব্যাংকের একটি ঋণ কর্মসূচি চালু আছে।
৪৫ কোটি ডলারের এই কর্মসূচির আওতায় আছে আমানত সুরক্ষা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতি। অর্থাৎ ক্ষতি কাটানোর কোনো অর্থ বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে না। সুতরাং একমাত্র ভরসা দেশের জনগণের করের টাকা। মনে রাখা দরকার, কোনো দাতাই কিন্তু শর্ত ছাড়া ঋণ দেয় না। বিশ্বব্যাংকের কাছে যে অর্থ পাচ্ছে, তাতেও অনেক শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে।
দাতারা যদি ঋণ দেওয়ার সময় শর্ত জুড়ে দেয়, তাহলে জনগণ কেন শর্ত ছাড়া জরিমানার নামে নিজের করের টাকা দেবে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাংক খাত ঠিক করতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আসলে কতটা আছে? এ নিয়ে সন্দেহ করার কিছু কারণ তো অবশ্যই আছে। যেমন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৯ মে ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশে ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না।
কিন্তু বিএনপি সরকার এসে সংসদে যে আইনটি পাস করে, তাতে নতুন একটি ধারা যুক্ত করে। সেখানে ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। নির্দিষ্ট একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ীকে ফেরাতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হলে শেষ পর্যন্ত ধারাটি বাতিল করা হয়। দাতারাও আপত্তি তুলেছিল। বিগত সরকারের সময়ে অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল বেসরকারি ব্যাংকের পরিবারতন্ত্র কায়েম।
আগের সরকার এটি করেছিল লুটপাটের সুযোগ দেওয়ার জন্যই। সবারই প্রত্যাশা ব্যাংক খাতে আর পরিবারতন্ত্র কায়েম হবে না। সরকারি হিসাবে, দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের জন্য দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ, ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে দেশে রয়েছে ৫৭ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার সম্পদ।
বিদেশে থাকা সম্পদের মূল্য ১৯ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। আমরা জানি বিদেশে থাকা সম্পদ ফেরত আনা সহজ নয়। এ জন্য নানা ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তবে জব্দ হওয়া সম্পদ দেশেই বেশি। এগুলো উদ্ধার করলেও তো ব্যাংক খাত খানিকটা স্বস্তি পেত। এ জন্য কেবল টাস্কফোর্স গঠনের কথা বললেই জরিমানা দেওয়া জনগণ আশ্বস্ত হবে না। দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চাইবে সবাই।
বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করেছে। এটি সফল হবে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে কেবল একীভূত করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। দুর্বল ব্যাংক খাত কীভাবে ঠিক করতে হয়, তার উদাহরণ হচ্ছে মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরও কিছু দেশ। ১৯৯৭ সালের আর্থিক সংকটে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ব্যাংক খাত ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল।
সেখান থেকে ফিরে আসার গল্প বাংলাদেশের জন্য বড় উদাহরণ হতে পারে। সরকার ব্যাংক খাতের অবস্থা ও সহায়তার তথ্য প্রকাশ করায় জবাবদিহিও ছিল এই কর্মসূচির অংশ। দাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিলে সেই অর্থ ব্যবহারের শর্ত পূরণ করতে হয়, অগ্রগতির হিসাবও দিতে হয়। ব্যাংক বাঁচাতে সাধারণ মানুষের করের টাকা ব্যবহার করলেও একইভাবে শর্ত পূরণ করতে হবে। স্পষ্ট করতে হবে যে এই অর্থের বিনিময়ে কী সংস্কার হবে, কী ফল মিলবে এবং ব্যর্থ হলে দায় কার, আর পূর্বের সংকটের জন্য কে কী শাস্তি পেল।
ব্যাংক পুনরুদ্ধারে অর্থ প্রয়োজন, কিন্তু সেই অর্থের বিনিময়ে ব্যাংক খাত কতটা বদলাবে, সেটিও দেখাতে হবে।

























