আন্তর্জাতিক অপরাধ গবেষণা সূচক নমবিও-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ ও অনিরাপদ শহরের তালিকায় চার নম্বরে স্থান পেয়েছে ঢাকা। এদিকে রাজধানীতে প্রতিদিন গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে ছিনতাইয়ের বিভিন্ন ঘটনা।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের একাধিক সূত্র অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’ ৪৩২টি। এসব চিহ্নিত স্থানে এক হাজারের বেশি পেশাদার ছিনতাইকারী সক্রিয়। গত ২০ বছরের অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই ৪৩২টি হটস্পটের মধ্যে ৪০০টিই পুরোনো। প্রায় দুই যুগ ধরে তালিকায় থাকা এই এলাকাগুলোর পরিস্থিতি কেন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না পুলিশ— সেটাই এখন প্রশ্ন অপরাধ বিশ্লেষকদের।
তারা বলছেন, অসৎ পুলিশের অবৈধ আয়ের একটি বড় উৎস এসব এলাকা। তাই নিজেদের স্বার্থেই এলাকাগুলোকে জিইয়ে রাখছেন তারা। বিপরীত দিকে যেসব পুলিশ সদস্য এলাকাগুলোকে অপরাধমুক্ত করতে চাইছেন, তাদের রয়েছে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব। পুলিশ সূত্র মতে, রাজধানীর ৪৩২টি হটস্পটের মধ্যে রেড জোন বা উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুর বিভাগের মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ ও জেনেভা ক্যাম্প, তেজগাঁও স্টেশন এলাকা ও বেগুনবাড়ি এবং আদাবর।
উত্তরা ও বিমানবন্দর এলাকার বিমানবন্দর মোড়, টঙ্গী ব্রিজসংলগ্ন রাস্তা, স্টেশন রোড, উত্তরার বিভিন্ন নির্জন সংযোগ সড়ক। যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা এলাকার ধোলাইপাড় মোড়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকা। মতিঝিল ও পল্টন জোনের দৈনিক বাংলা মোড়, কমলাপুর বটতলা, মালিবাগ রেলগেট, খিলগাঁও, শান্তিনগর, শাহজাহানপুর ও গুলিস্তান এলাকা। রমনা শাহবাগ থানার পার্ক এলাকা, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও নীলক্ষেত।
লালবাগের হাজারীবাগ, আজিমপুর, কিল্লার মোড়, ট্যানারি রোড, গণকটুলী, কালুনগর, চকবাজার ও পোস্তা। মিরপুর ও পল্লবী এলাকার মিরপুর ১০ ও ১১ নম্বর গোলচত্বর, বিহারি ক্যাম্প, শেওড়াপাড়া, টেকনিক্যাল মোড় এবং পল্লবী মাঠের আশপাশ। অপরাধ বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর মতে, একই এলাকায় প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ সর্বস্ব হারালেও এলাকাগুলো অপরাধমুক্ত না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু গাফিলতি দায়ী।
এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে, কোনো ছিনতাই ঘটনার পর মামলার বদলে ‘জিডি’ করার প্রবণতা। অধিকাংশ ঘটনার পর ভুক্তভোগী থানায় গেলে পুলিশ ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা ‘হারানো জিডি’ হিসেবে নথিভুক্ত করে। এতে প্রকৃত অপরাধের পরিসংখ্যান আড়ালে থেকে যায় এবং অপরাধীদের বড় শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। তবে এটাও সত্য, ভয়ে বা হয়রানির কারণে অনেক ভুক্তভোগীও মামলা করেন না।
ফলে ছিনতাইকারী এসব এলাকাকে তাদের জন্য অভয়ারণ্য বলে মনে করে। অপরাধ বিশ্লেষক ব্যারিস্টার আহমেদ ইমতিয়াজ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে জামিনে মুক্তি ও পুনরাবৃত্তি। পুলিশ কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেও আইনি ফাঁকফোকর বা দুর্বল মামলার কারণে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে একই স্পটে পুনরায় ছিনতাই শুরু করে। ছিনতাই বা দস্যুতার মামলায় আসামিরা খুব দ্রুত জামিন পেয়ে যায়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের সঠিক পরিচয় বা নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের সময়টাও পুলিশ পায় না, বা ইচ্ছা করেও করে না। এটাও একটি বড় কারণ। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর, পল্লবী, মিরপুরের জেনেভা বা বিহারি ক্যাম্পগুলোর অপরাধ তো কিছু অসৎ পুলিশ এবং স্থানীয় সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরাই টিকিয়ে রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, অপর্যাপ্ত সড়কবাতির অন্ধকারের সুযোগ আরেকটি কারণ।
রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে সড়কবাতির কিছুটা আলো থাকলেও ফ্লাইওভারের নিচের অংশ, ফুট ওভারব্রিজ, গলির রাস্তা এবং সংযোগ সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত আলো নেই। বিশেষ করে ভোরবেলা ও গভীর রাতে সড়কবাতি বন্ধ থাকা বা নষ্ট থাকার সুযোগ নেয় ছিনতাইকারীরা। স্পটগুলোতে ওত পেতে থাকা ‘টানা পার্টি’ রিকশা বা চলন্ত গাড়ির যাত্রীদের ব্যাগ বা মোবাইল টান দিয়ে মুহূর্তে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
আলোচিত এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর অভাব দীর্ঘদিনের। ডিএমপি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ছিনতাই প্রতিরোধে তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা এবং টহল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের কিছু জায়গায় দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তা বা জনবল সংকটের কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, অধিকাংশ ছিনতাই ভোরবেলা বা গভীর রাতে ঘটে, যখন টহলদলের সংখ্যা সীমিত থাকে।
তারা নাগরিকদের সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করছেন। আরেক অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রেজওয়ানুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, চিহ্নিত স্পটগুলো এখন শুধু মূল্যবান সামগ্রী লুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এগুলো খুনের স্পট হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্পট জিইয়ে থাকার প্রধান কারণ পুলিশের জবাবদিহির অভাব।
বারবার অভিযোগ ওঠা বা ঘটনা ঘটলেও পুলিশের নিয়মিত টহল ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাই কোনো এলাকায় বারবার ছিনতাই হলে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয় না। তিনি আরও বলেন, ঢাকাকে নিরাপদ করতে শুধু চিহ্নিত স্পট বা ‘হটস্পট’ তালিকাভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়।
সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা, ফুট ওভারব্রিজ ও অন্ধকার গলিগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পুলিশের প্রযুক্তিনির্ভর ও সচল টহল জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। নইলে ২০ বছর কেন, ২০০ বছরেও এই একই তালিকা থেকে যাবে। পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি আজিজুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র কতটা ভয়াবহ, তা শুধু থানায় নথিভুক্ত মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) হিসাব দিয়ে বোঝা কঠিন।
কোন এলাকায় বারবার ছিনতাই হচ্ছে, কোন সময়ে ঝুঁকি বেশি, কোথায় অপরাধীরা সহজে পালিয়ে যাচ্ছে এবং ঘটনার পর পুলিশ কত দ্রুত পৌঁছাচ্ছে— এসব প্রশ্নের সমন্বিত উত্তর খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে হবে, যেটা মোটেও হয় না। নগর নিরাপত্তার বড় দুর্বলতা এখানেই। অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরিবেশ ও সুযোগগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কতটা সম্ভব হচ্ছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বছরের পর বছর ধরে একই এলাকা চিহ্নিত হয়ে থাকা এবং এসব এলাকায় অপরাধ না কমার কারণও এটিই। থানাভিত্তিক মামলা, জিডি, অপরাধের স্থান ও সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে অন্তত নথিভুক্ত ঘটনার একটি মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব। সেই সঙ্গে আগের কয়েক মাস বা বছরের একই সময়ের তথ্য তুলনা করলে বোঝা যাবে, নির্দিষ্ট এলাকায় ছিনতাই কেন বাড়ছে। আজিজুল হক বলেন, এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কি শুধু ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করছে, নাকি একই স্থানে বারবার অপরাধের ঘটনাকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করছে?
একই সড়কে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একাধিক ঘটনা ঘটলে সেখানে অতিরিক্ত টহল, সাদা পোশাকে নজরদারি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা কিংবা স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই জায়গায় বারবার কেন ছিনতাই ঘটছে এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অধিকাংশ অপরাধ বিশ্লেষক বলছেন, অপর্যাপ্ত আলোর অভাব, নির্জন সড়ক, ফুটপাত বা গলিতে নজরদারির ঘাটতি, গণপরিবহনের যাত্রী নামানোর অনিরাপদ স্থান কিংবা দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
নগর নিরাপত্তায় পুলিশের টহল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু টহলের গাড়ি চলাচল আর অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর উপস্থিতি এক বিষয় নয়। কোন এলাকায় কখন অপরাধ বেশি ঘটছে, অপরাধীরা কীভাবে পালাচ্ছে এবং কোন পথে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব— এসব তথ্যের ভিত্তিতে টহল পরিকল্পনা করা হচ্ছে কি না, সেটিই মূল বিবেচ্য। তারা বলছেন, কোনো এলাকায় যদি রাতের শেষ ভাগে কিংবা ভোরে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে, তাহলে শুধু সন্ধ্যায় টহল বাড়িয়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন।
আবার একাধিক সড়ক সংযুক্ত এমন কোনো এলাকায় অপরাধী দ্রুত অন্য এলাকায় চলে যেতে পারলে শুধু ঘটনাস্থলের থানার তৎপরতা যথেষ্ট না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী থানাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি পুলিশকে খবর দেওয়ার পর কত সময়ে সাড়া পাচ্ছেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছাচ্ছে কি না, আশপাশের সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে কি না এবং মামলা হলে তদন্ত কত দূর এগোচ্ছে— এসব সূচক দিয়ে পুলিশের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যায়।
সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ বলেন, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার ছিনতাই প্রতিরোধ শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়। সড়কের আলো, ফুটপাতের নিরাপত্তা, গণপরিবহনের ব্যবস্থাপনা, পরিত্যক্ত স্থাপনায় নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একাধিক সংস্থার দায়িত্ব ভাগ হয়ে থাকলে অনেক সময় সমন্বয়ের অভাব দেখা দিতে পারে। কোথাও সড়কবাতি নষ্ট, কোথাও ফুটপাত দখল, আবার কোথাও জননিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেই— এমন পরিস্থিতি অপরাধের সুযোগ বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের না হয়ে আসার কারণেই একই এলাকা বছরের পর বছর ধরে চিহ্নিত হয়ে আসছে। হাসান মাহমুদ বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশ, দুই সিটি করপোরেশন, পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করে অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। কোন এলাকায় কতটি অভিযোগ এসেছে, কোথায় সড়কবাতি বা নজরদারির ঘাটতি রয়েছে এবং কোন ব্যবস্থা নেওয়ার পর অপরাধ কমেছে— এসব তথ্য নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার।
এ ছাড়া ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করাটাও জরুরি। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে জানতে হবে, কোথায়, কখন এবং কীভাবে মানুষ বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে টহল, তদন্ত, নজরদারি ও নাগরিক সেবার পরিকল্পনা করতে হবে। ছিনতাইয়ের সংখ্যা কমেছে কি না, অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না এবং অভিযোগের পর পুলিশ কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে— এসব প্রশ্নের নিয়মিত উত্তর প্রকাশ করা গেলে জবাবদিহিও বাড়বে।





















