মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে শুধু সুদের হার ও মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি।
এর জন্য দুর্বল ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে ঋণদাতা সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জেইন চন্দ্র।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি, মুদ্রানীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশটি এখনো রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলার কথা জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলেছে, গত মে মাসে বাংলাদেশ নতুন আইএমএফ সমর্থিত কর্মসূচির অনুরোধ জানিয়েছে।
আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি : বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার গড়ে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির চাপ স্থায়ী রূপ নিয়েছে। গত জুনে বার্ষিক গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগের বছর মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি ছিল। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই হার প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা জরুরি বলে মনে করে আইএমএফ। তবে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না বলে সতর্ক করেছেন সোনালি জেইন চন্দ্র। তার মতে, মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। দুর্বল ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ : বাংলাদেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল প্রয়োজন। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে বেশ দুর্বল— এমন মূল্যায়ন তুলে ধরে সোনালি জেইন চন্দ্র বলেন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর সংস্কার জরুরি। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, ঋণ আদায়ে দুর্বলতা এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এসব সমস্যা ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আইএমএফের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু মূল্যস্ফীতি কমানো নয়, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশ রাজস্ব আদায় : বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমএফ।
সংস্থাটির হিসাবে, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমতে কমতে প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশ্বে সবচেয়ে কম রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। আইএমএফের মতে, উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি। এ জন্য রাজস্ব আহরণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত কম হওয়ার অর্থ হলো, দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের তুলনায় সরকার কর ও অন্যান্য রাজস্ব হিসেবে খুব সামান্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে।
এতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কঠিন হয়ে পড়ে। রাজস্ব আয় বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব প্রশাসনের কার্যকারিতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করব্যবস্থার দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত : বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে আইএমএফ। সোনালি জেইন চন্দ্র জানান, গত মে মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির জন্য অনুরোধ জানায়। এর আগে বাংলাদেশ আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে।
সে সময় নতুন কর্মসূচির সম্ভাব্য সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। আইএমএফের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় উঠে আসা সংস্কারের বিষয়গুলো চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পর্যালোচনায় উল্লেখ করা সুপারিশের সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। জুলাইয়ের ওই সফরের পরও দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ : আইএমএফের বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি প্রধান দুর্বলতা উঠে এসেছে— উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল আর্থিক খাত এবং কম রাজস্ব আদায়।
সংস্থাটির মতে, এসব সমস্যা আলাদাভাবে মোকাবিলা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। বরং সমন্বিত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চললেও এর অর্থায়নের পরিমাণ, ঋণের শর্ত এবং কর্মসূচির চূড়ান্ত কাঠামো সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে আইএমএফের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নতুন কর্মসূচির আলোচনায় শুধু অর্থায়ন নয়, অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।





















