একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি তার নিজস্ব রাজস্ব আহরণের ক্ষমতা। ঋণ, অনুদান কিংবা বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কখনোই টেকসই অর্থনীতির পরিচায়ক হতে পারে না। তাই রাজস্ব সংগ্রহের প্রতিটি কার্যকর উদ্যোগ রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে এবং উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করে। সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গৃহীত নতুন কৌশল নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে। এমন বাস্তবতায় নতুন অর্থবছরে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু উচ্চ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এনবিআরের ২১ সদস্যের মনিটরিং কমিটি গঠন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ সেই প্রয়োজনীয়তারই প্রতিফলন। বিশেষভাবে তামাক খাতকে অধিকতর নজরদারির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। দেশে তামাকজাত পণ্যের একটি বড় অংশ এখনো অনিয়ন্ত্রিত বা তথাকথিত ‘গ্রে মার্কেট’-এর মাধ্যমে বিক্রি হয়, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে কর পরিশোধকারী উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরাও বৈষম্যের শিকার হন। উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা এবং গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত রাজস্ব ফাঁকি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এনবিআরের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো অটোমেটেড অডিট ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রযুক্তিনির্ভর নিরীক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনি ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকি শনাক্ত করাও সহজ হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে বিদেশি ও নকল সিগারেটের অবৈধ বিপণন বন্ধে সুপারিশ প্রণয়নের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। ডিজিটাল অর্থনীতির এই সময়ে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকেও প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই হবে। তবে শুধু কমিটি গঠন বা পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের দুর্বলতায় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তাই কমিটির সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন, মাঠপর্যায়ে সমন্বয় জোরদার, কর প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে করের আওতা বাড়াতে হবে নতুন খাত ও নতুন করদাতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। কেবল বিদ্যমান করদাতার ওপর চাপ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব নয়। এটিও মনে রাখতে হবে, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। অতিরিক্ত করের বোঝা বা প্রশাসনিক জটিলতা যেন উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। কর আদায়ের উদ্দেশ্য কখনোই ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করা নয়; বরং একটি ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় নির্বাহের প্রধান উৎস রাজস্ব। তাই রাজস্ব সংগ্রহে দক্ষতা বাড়ানো সময়ের দাবি। এনবিআরের বর্তমান কৌশল বাস্তবায়নে যদি আন্তরিকতা, দক্ষতা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা যায়, তবে শুধু চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাই নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে উঠবে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনাকে কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান সাফল্যে রূপ দেওয়া। তাহলেই রাজস্ব আদায়ে এনবিআرهای এই ইতিবাচক কৌশল দেশের অর্থনীতির জন্য সত্যিকার অর্থেই সুফল বয়ে আনবে।
4:22 am, Sunday, 2 August 2026
শিরোনাম :

















