বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বিশালপুর, গাড়ীদহ ও কুসুম্বিসহ কয়েকটি ইউনিয়নের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক-কর্মচারী নিয়োগ না থাকায় এবং ওষুধ সরবরাহ সীমিত হওয়ায় তৃণমূলের মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে ভবানীপুর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়ে চালু রয়েছে। তবে ১৯৭৭ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত আরডিএ (RDA) প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা বিশালপুর, গাড়ীদহ ও কুসুম্বি এলাকার উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভবনগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে গাড়ীদহ কেন্দ্রের একটি ভবন ব্যবহারযোগ্য থাকলেও অন্য ভবনগুলো দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বিশালপুর কেন্দ্রেও একই চিত্র। পরিত্যক্ত পরিবেশ, ভাঙাচোরা অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় কেন্দ্রগুলো অনেকটা পরিত্যক্ত ভবনের মতো দাঁড়িয়ে আছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন কেন্দ্রে জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে অনেক সময় নিয়মিত সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধ সরবরাহও খুবই সীমিত। ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে রোগীরা তিন থেকে চার ধরনের প্রাথমিক ওষুধের বেশি পাচ্ছেন না। ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের সামান্য অসুস্থতার চিকিৎসার জন্যও উপজেলা শহরে ছুটতে হচ্ছে। বর্তমানে তৃণমূল পর্যায়ে তিনটি পৃথক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের অধীনে সিএইচসিপি (CHCP) এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউএ) কাজ করছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, একই ধরনের কাজ তিনটি পৃথক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ কারণে সরকার তিনটি ব্যবস্থাকে সমন্বিত করে একীভূত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, “আরডিএ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভবনগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হলেও জনবল দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রগুলো চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ভবানীপুর উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবল রয়েছে। অনুমোদন ও বরাদ্দ পেলে অন্য কেন্দ্রগুলোও পুনরায় চালু করে মানুষের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।” পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার সুঘাটে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া আরও ছয়টি ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং সীমাবাড়িতে পূর্ণ জনবলসহ একটি মডেল সেবা কেন্দ্র রয়েছে। তবে প্রায় সব কেন্দ্রেই মাঠকর্মীর ঘাটতি রয়েছে। সুঘাটে ছয়জনের স্থলে চারজন মাঠকর্মী কর্মরত, কোনো পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নেই। গাড়ীদহে ছয়জনের স্থলে চারজন, খামারকান্দিতে ছয়জনের স্থলে তিনজন এবং বিশালপুরে ছয়জনের স্থলে তিনজন মাঠকর্মী রয়েছেন। এসব কেন্দ্রেও কোনো পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নেই। খানপুরে পরিদর্শিকা থাকলেও ছয়জনের স্থলে মাত্র তিনজন মাঠকর্মী রয়েছেন। মির্জাপুরে সাতজনের বিপরীতে কর্মরত আছেন পাঁচজন। ভবানীপুরে চারজন মাঠকর্মী থাকলেও পরিদর্শিকা নেই। সীমাবাড়িতে ছয়জনের স্থলে মাত্র দুইজন মাঠকর্মী কর্মরত। এ ছাড়া পৌরসভায় পরিবার পরিকল্পনা সুপারভাইজার ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের পদও শূন্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েকটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। খানপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে শাহ বন্দেগী ইউনিয়নে নতুন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক কেন্দ্র সপ্তাহের অধিকাংশ সময়ই বন্ধ থাকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে অফিস সময় শেষ হওয়ার আগেই কর্মস্থল ত্যাগ করা হয়। ফলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি গাড়ীদহ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রটির মূল ফটকে তালা ঝুলছে। একটি ভবন বিশেষ বরাদ্দে সংস্কার করা হলেও পাশের ভবনগুলো দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশালপুর ইউনিয়নের পেচুল স্বাস্থ্যকেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা মাসুদুর রহমান বলেন, “স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকলেই পরিত্যক্ত ভবনের মতো পরিবেশ চোখে পড়ে। চারপাশে পানি জমে থাকে, ভবন ভেঙে পড়ার উপক্রম। বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। অধিকাংশ সময় কেন্দ্র তালাবদ্ধ থাকে। দ্রুত সংস্কার করে জনবল নিয়োগ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা চালুর দাবি জানাই।” উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুল আলীম বলেন, “কুসুম্বি, গাড়ীদহ ও বিশালপুর ইউনিয়নে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের নিজস্ব কোনো সেবা কেন্দ্র নেই। মাঠ পর্যায়ে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। তবে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান। কয়েকটি কেন্দ্রে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে আরও ভালো স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে। সরকার থেকে যে পরিমাণ ওষুধ পাওয়া যায়, তা নির্দেশনা অনুযায়ী বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়।”
8:00 pm, Friday, 31 July 2026
শিরোনাম :
শেরপুর উপজেলায় উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো জরাজীর্ণ, জনবল সংকটে সেবা ব্যাহত
-
MIT ERP
- Update Time : 05:40:45 pm, Friday, 31 July 2026
- 4
Tag :
Popular Post























