নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার একটি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল সূচক। কারণ মূল্যস্ফীতির হার, প্রবৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের চেয়েও সাধারণ মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের বাজারে কত টাকায় চাল, ডাল, ডিম, মাছ, সবজি কিংবা কাঁচামরিচ কিনতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজার এখন এমন এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিদিনই ক্রেতাদের নতুন দামের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। বর্ষা ও বন্যার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে, এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে যদি অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকট ও অতিমুনাফার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তবে সেটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমস্যা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কাঁচা মরিচের দাম। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি ১০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় পৌঁছে যাওয়া কোনোভাবেই একটি স্বাভাবিক বাজারের চিত্র হতে পারে না। একই সময়ে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। করলা, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, পটোল, ঝিঙে, কাঁকরোল, শসা প্রায় সবজিই এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ডিমের দামও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্ষাকালে সাধারণত দেশি মাছের সরবরাহ বাড়ার কথা থাকলেও সেখানেও স্বস্তি নেই। অর্থাৎ বাজারের প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যই এখন উচ্চমূল্যের চাপে। বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষকের জমিতে কাঁচা মরিচের গাছ নষ্ট হয়েছে, অনেক সবজিখেত পানিতে ডুবে গেছে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরবরাহ কিছুটা কমলেই খুচরা বাজারে মূল্য চারগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাবে কেন? উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক কি সেই অনুপাতে বেশি দাম পাচ্ছেন? নাকি উৎপাদক থেকে ভোক্তার মাঝখানের কোনো স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই সরকারের দায়িত্ব। বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ নতুন নয়। প্রতি বছর রমজান, কোরবানির ঈদ, বর্ষা কিংবা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই একই চিত্র দেখা যায়। কোনো একটি অজুহাত সামনে এনে বাজারে হঠাৎ দাম বাড়ে। পরে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও অনেক সময় সেই দাম আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। অর্থাৎ সংকটকে স্থায়ী মুনাফায় পরিণত করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটি কেবল বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করে না, ভোক্তার আস্থাও ধ্বংস করে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব শুধু বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বা কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক কৌশল। উৎপাদন এলাকা থেকে পাইকারি বাজার, আড়ত, পরিবহন এবং খুচরা বাজার পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রে বাজার নিজে নিজে নিয়ন্ত্রিত হয় না, তাকে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। তাই এখন প্রয়োজন নিয়মিত, দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ বাজার মনিটরিং। প্রয়োজন সিন্ডিকেট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা এবং সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখার সমন্বিত উদ্যোগ। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা রক্ষারও পূর্বশর্ত। সরকার যত দ্রুত এ বাস্তবতা উপলব্ধি করবে, তত দ্রুতই বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হবে।
5:38 am, Thursday, 30 July 2026
শিরোনাম :











