উন্নত জীবনের স্বপ্ন, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ কিংবা যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও নির্যাতন থেকে মুক্তিÑএমন নানা কারণে প্রতিবছর বিশ্বের লাখো মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথই অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে মৃত্যুর যাত্রায়। বৈধ পথ সংকুচিত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বাধ্য হয়ে অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে অভিবাসনের চেষ্টা করছেন। সমুদ্র, মরুভূমি, পাহাড় ও দুর্গম সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই মানবিক সংকটের ভয়াবহ চিত্রই তুলে ধরেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন অভিবাসনপথে ৬৪ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। এদের প্রায় ষাট শতাংশের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। তবে এই সংখ্যাকেও প্রকৃত চিত্রের একটি অংশ বলে মনে করছে সংস্থাটি। কারণ অনেক দুর্ঘটনার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না এবং বহু মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। ভূমধ্যসাগর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ : বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসনপথ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ভূমধ্যসাগর। উত্তর আফ্রিকার উপকূল থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় ছোট নৌকায় যাত্রা করেন হাজারো মানুষ। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং উদ্ধারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এই পথেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে। গত এক দশকে শুধু এই পথেই ২৭ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার বিশ্লেষকদের মতে, ভূমধ্যসাগরের তথ্য তুলনামূলকভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও সাহারা মরুভূমির মতো দুর্গম অঞ্চলে প্রকৃত মৃত্যুর হিসাব পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের বাইরেও বহু মানুষের মৃত্যু অজানাই থেকে যাচ্ছে। অসংখ্য মানুষ পরিচয়হীন : অভিবাসনপথে প্রাণ হারানো মানুষের বড় একটি অংশের পরিচয়ও জানা যায় না। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি তিনজন মৃত বা নিখোঁজ মানুষের মধ্যে দুজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অনেকের বয়স, লিঙ্গ কিংবা জাতীয়তাও নির্ধারণ করা যায়নি। ফলে অসংখ্য পরিবার বছরের পর বছর ধরে তাদের স্বজনের খোঁজে অপেক্ষা করলেও কোনো নিশ্চিত তথ্য পায় না। নতুন পথ, নতুন ঝুঁকি : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিবাসননীতিতে কঠোরতার কারণে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা আগের পরিচিত পথ ছেড়ে নতুন রুট ব্যবহার করছেন। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জগামী আটলান্টিক রুট এখন বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে পরিণত হয়েছে। ছোট নৌকায় দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করতে গিয়ে শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন অথবা নিখোঁজ হচ্ছেন। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই স্পেনের উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টাকালে এক হাজার তিন শতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। একই সময়ে বহু নৌকার আরোহীসহ নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। সংকটের পেছনের কারণ : বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উন্নত জীবনের আকাক্সক্ষাই নয়, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নির্যাতন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণও মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। আফগানিস্তান, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে প্রাণঘাতী সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন। নিরাপদ ও বৈধ পথের অভাবে তারা মানবপাচারকারী চক্রের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
4:40 am, Thursday, 30 July 2026
শিরোনাম :














