বাংলাদেশের জনগণ বড়ই নিরীহ প্রাণী। তারা ভোট দেয় সরকার বানানোর জন্য। তারপর সরকারকে বলে, ভাই, দেশটাকে একটু ভালোভাবে চালান। সরকারও প্রথমে খুব উৎসাহ নিয়ে বলে, অবশ্যই। জনগণই আমাদের শক্তি। তারপর বাজারে গিয়ে জনগণ যখন দেখে এক কেজি কাঁচামরিচ বা পেঁয়াজের দাম তার মাসিক বেতনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, এক লিটার সয়াবিন তেল কিনতে গিয়ে পকেটের ভেতর গণতন্ত্রের অবস্থা কাহিল, তখন জনগণ আবার সরকারকে বলে, ভাই, একটু দাম কমান। সরকার বলে, অবশ্যই কমাব। জনগণ আশাবাদী হয়। এরপর সরকার ব্যবসায়ীরা ডাকে। ব্যবসায়ীরা আসেন। চা খান। বিস্কুট খান। লাঞ্চ করেন, ডিনার করেন। সেলফি তুলেন। কিছুক্ষণ আলোচনাও করেন। তারপর বলেন, দাম কমানো সম্ভব নয়। সরকার বলে, কেন? ব্যবসায়ী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার। সরকার বলে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তো দাম কমেছে। ব্যবসায়ী বলেন, ডলার। সরকার বলে, ডলারও তো কমেছে। ব্যবসায়ী বলেন, আমদানি খরচ। সরকার বলে, আমদানি খরচও তো কমেছে। ব্যবসায়ী একটু চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, স্যার, লাভের কথাটা বলব? সরকার চমকে ওঠে। না না। সেটা বলার দরকার নেই। জনগণ শুনে ফেললে বিপদ হবে। এই হলো বাংলাদেশের বাজার অর্থনীতি। এখানে সবকিছুর দাম বাড়ার কারণ আছে। শুধু লাভ বাড়ার কোনো কারণ নেই। লাভ যেন এমন এক নিষিদ্ধ শব্দ, যেটা ব্যবসায়ীরা মুখে উচ্চারণ করেন না। কিন্তু ক্যালকুলেটরে প্রতিদিন হিসাব করেন। বাংলাদেশে সরকার বদলায়। কিন্তু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বদলায় না। এ এক অসাধারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সরকারের মেয়াদ আছে। মন্ত্রীর মেয়াদ আছে। সংসদের মেয়াদ আছে। এমনকি রাষ্ট্রপতি- প্রধানমন্ত্রীরও মেয়াদ আছে। কিন্তু সিন্ডিকেটের? না। তাদের কোনো মেয়াদ নেই। তারা চিরস্থায়ী। তারা সব সরকারের আমলে একই অবস্থানে থাকেন। তারা যেন জনগণের বাজার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের আজীবন নির্বাচিত প্রতিনিধি। এ পদ পেতে তাদের কোনো ভোট লাগে না। কোনো ইশতেহার লাগে না। কোনো মিছিল লাগে না। কোনো পোস্টার লাগে না। শুধু একটি ফোন করলেই হয়। দাম বাড়াব? অন্য প্রান্ত থেকে উত্তর আসে, বাড়ান। কত? উত্তর, দেখে শুনে। প্রশ্ন, মানে? উত্তর, জনগণ যতটা সহ্য করতে পারে, তার একটু বেশি। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের বাজার গবেষণা। এখানে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা মাপা হয় না। মাপা হয়, জনগণ আর কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজার। গ্যাসের দাম বাড়বে। কারণ উৎপাদন খরচ। গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সরবরাহ সংকট। পরিবহন ভাড়া বাড়বে। কারণ গ্যাস নেই। বিদ্যুতের দাম বাড়বে। কারণ জ্বালানি ব্যয়। সবজির দাম বাড়বে। কারণ ডিজেলের দাম। মাছের দাম বাড়বে। কারণ বরফের দাম। মাংসের দাম বাড়বে। কারণ গরুর খাবারের দাম। ডিমের দাম বাড়বে। কারণ মুরগির খাবারের দাম। মুরগির দাম বাড়বে। কারণ ডিমের দাম। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, বাংলাদেশে সবকিছুর দাম বাড়ার পেছনে একটা করে কারণ আছে। শুধু মানুষের বেতন কেন বাড়ছে না। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবীদের। এটার কোনো কারণ নেই। সম্ভবত বেতনের সিন্ডিকেট এখনো তৈরি হয়নি। তৈরি হলে হয়তো বেতনও একদিন ঘোষণা দিয়ে বাড়বে। কোনো একদিন হয়তো বেতন বাড়ানোর আন্দোলন চলছে। তখন মালিকপক্ষ বলবে, দুঃখিত। আন্তর্জাতিক বেতন বাজার মন্দা। এবার আবার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাব! শব্দটা খুব সুন্দর। দাম বাড়ানোর কথা সরাসরি বললে জনগণ রেগে যায়। তাই বলা হয়, দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব। সমন্বয় শব্দটিরও একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। দাম বাড়ানোর সমন্বয়। ভাড়া বাড়ানোর সমন্বয়। গ্যাসের দাম বাড়ানোর সমন্বয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সমন্বয়। শুধু জনগণের আয় কমে গেলে সেটা অসামঞ্জস্য । সয়াবিন তেলের বোতল এখন এমন এক জিনিস, যেটা কিনতে যাওয়ার আগে পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়। স্ত্রী বলে এক লিটার আনতে, স্বামী বলে, এক আউন্স হলে চলে না? স্ত্রী ক্ষেপে যায়। স্বামী বলে, তুমি কি চাও না আমাদের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো পড়াশ করুক। এক লিটার তেল কিনলে এই মাসে তাদের পড়ার খরচ কমাতে হবে। স্ত্রী একটু ভেবে বলে, তাহলে আধা আউন্স এনো। আলমারি বা সোকেসে তালা মেরে রেখে দিব। চোর যদি গহনা না নিয়ে, তেল নিয়ে পালায়। এমন দিনও হয়তো দূরে নয়। সত্য যে, এখন বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে তেলের ব্যবহারও পরিকল্পিত। তেল এখন আর রান্নার উপকরণ নয়। তেল এখন পরিবারের বাজেটের সদস্য। বাংলাদেশে জনগণ যখন দাম কমানোর জন্য আন্দোলন করে, তখন সরকার বলে, আমরা বিষয়টি দেখছি। এই দেখছি শব্দটি খুব রহস্যময়। সরকার দেখে। মন্ত্রী দেখেন। সচিব দেখেন। কর্তৃপক্ষ দেখে। মনিটরিং টিম দেখে। মোবাইল কোর্ট দেখে। সাংবাদিক দেখে। বিশেষজ্ঞ দেখে। শুধু দাম কমে না। দাম সম্ভবত এত বেশি উচ্চতায় উঠে গেছে যে, কেউ নিচে দাঁড়িয়ে তাকে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না। বাজার মনিটরিং করতে গিয়ে কর্মকর্তারা দোকানে ঢোকেন। তেলের দাম কত? দোকানি বলেন। কর্মকর্তা বলেন, এত বেশি কেন? দোকানি বলেন, স্যার, আমরা তো কম দামে কিনিনি। কার কাছ থেকে কিনেছেন? সরবরাহকারীর কাছ থেকে। সরবরাহকারী কোথা থেকে পেয়েছে? আমদানিকারকের কাছ থেকে। আমদানিকারক? উত্তর, জানি না। প্রশ্ন, তাহলে সিন্ডিকেট কে? সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে, জানি না। বাংলাদেশে সিন্ডিকেট এমন এক জিনিস, যার অস্তিত্ব সবাই জানে, কিন্তু পরিচয় কেউ জানে না। এ এক ভূতের গল্প। সবাই ভূত দেখেছে। কেউ ভূতের ছবি তুলতে পারেনি। ব্যবসায়ীরা আবার বলেন, তারা সিন্ডিকেট নন। অবশ্যই নন। আপনারা স্বাধীন ব্যবসায়ী। শুধু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সবাই একই দিনে দাম বাড়ান। একই দামে বিক্রি করেন। একই যুক্তি দেন। একই ভাষায় কথা বলেন। একই সময়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। এমন ঐক্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নেই। রাজনীতিবিদরা একসঙ্গে বসতে পারেন না। ব্যবসায়ীরা পারেন। রাজনীতিবিদরা জোট করতে বছর কাটিয়ে দেন। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর সময় এক রাতেই জোট করে ফেলেন। রাজনীতিতে বলা হয়, আমরা জনগণের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ। ব্যবসায়ীরা বলেন, আমরা ব্যবসা আর মুনাফার স্বার্থে একমত। ফারাক শুধু এটুকু, রাজনীতিবিদদের ঐক্যে জনগণ হাততালি দেয়। ব্যবসায়ীদের ঐক্যে জনগণ পকেট চেপে ধরে। সরকার বেচারাই বা কী করবে? একদিকে জনগণ। অন্যদিকে ব্যবসায়ী। জনগণ বলে, দাম কমান। ব্যবসায়ী বলে, দাম বাড়ান। সরকার মাঝখানে বসে। দুপক্ষের দিকে তাকায়। তারপর ব্যবসায়ীদের দিকে একটু বেশি তাকায়। কারণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা যায় না। তারা বাজার চালান। অর্থনীতি চালান। সরবরাহ চালান। আর জনগণ? জনগণ শুধু ভোট চালায়। ভোট শেষ হলে জনগণের কাজ শেষ। তারপর শুরু হয় বাজারের পালা। দাম কমানোর দাবিতে, জনগণ রাস্তা আটকে দাঁড়ালে বলা হয়, জনদুর্ভোগ। ব্যবসায়ী বাজার আটকে দিলে বলা হয়, বাজার পরিস্থিতি। জনগণ পণ্য কিনতে না পারলে সেটা, ক্রয়ক্ষমতার সংকট। ব্যবসায়ী পণ্য না ছাড়লে বলা হয়, সরবরাহ সংকট। ভাষার কী সুন্দর খেলা! এই খেলায় জনগণ সব সময় হারে। একদিন হয়তো বাংলাদেশে এমন একটি নতুন মন্ত্রণালয় হবে। সিন্ডিকেট বিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী হবেন একজন ব্যবসায়ী। প্রতিমন্ত্রী হবেন আরেকজন ব্যবসায়ী। সচিব হবেন একজন আমদানিকারক। উপদেষ্টা হবেন একজন পাইকার। আর জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাখা হবে একজন সাধারণ ক্রেতাকে।
5:16 am, Thursday, 30 July 2026
শিরোনাম :
জন দাবি দাম কমানোর, ব্যবসায়ীরা চান বাড়াতে
-
MIT ERP
- Update Time : 04:26:23 am, Thursday, 30 July 2026
- 2
Tag :












