ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম হিসেবে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। চলতি বছরের শুরু থেকে ৭ মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫০ জনের। এর মধ্যে চলতি জুলাই মাসেই মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে আগের ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ৫০ জনের। যার মধ্যে জুলাইয়ের ২৮ দিনে মারা গেছেন ৩২ জন। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে গত বছরের মতো এবারও ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করতে পারে বলে আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৩৪ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ১৪ হাজার ৬৯০ জনে। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১৩ হাজার ৯ জন ডেঙ্গুরোগী। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ১৮৮ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে একজন করে রয়েছেন। এখন পর্যন্ত মোট মারা যাওয়া ৫০ জনের মধ্যে ৩২ জনই মারা গেছেন চলতি জুলাইয়ে। এর আগে জুনে ১৩ জন, মে মাসে ১ জন, ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতে একজন করে মারা যান। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট মারা যাওয়া ৫০ জনের মধ্যে নারী ৬০ শতাংশ এবং পুরুষ ৪০ শতাংশ। ডেঙ্গুতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটিতে ৬ জন, বরিশালে ৬ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন, সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগে ১ জন, খুলনায় ৬ জন, ময়মনসিংহে ৬ জন, রাজশাহীতে ১ জন ও রংপুরে ১ জন মারা গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রকোপ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং চিকিৎসার বিশেষ প্রটোকলসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। পরিত্যক্ত ওয়াশরুম, ছাদ ও গ্যারেজে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহারের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে, ডেঙ্গু ভ্যাকসিন এখনো বিশ্বজুড়ে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত না হওয়ায় এই মুহূর্তে তা প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ডেঙ্গু নিয়ে অংশীদারদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, অনেক পরিত্যক্ত বাথরুমের কমোড এবং গ্যারেজে পানি জমে থাকে, যা মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এসব জায়গায় ‘নোভালিয়ুরন’ নামক বিশেষ ট্যাবলেট ও লার্ভিসাইড স্প্রে করা হবে। স্থল ও জল উভয়পথেই সমানে স্প্রে কার্যক্রম চালানো হবে। ছাদ ও ক্যানেল পরিচ্ছন্নতায় মোবাইল কোর্ট ও জরিমানা : সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের বরাত দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বাড়ির ছাদ, ক্যানেল, মজা পুকুর ও গ্যারেজ নিয়মিত পরিষ্কার রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন বাড়িগুলোতে মোবাইল কোর্টের (ভ্রাম্যমাণ আদালত) মাধ্যমে তল্লাশি চালানো হবে এবং অবহেলা পাওয়া গেলে জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে’। দেশব্যাপী চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও প্রটোকল বুক : সোসাইটি অব প্রাইভেট মেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আগামী শনিবার থেকে ঢাকা থকে চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হবে, যা পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে ৬৪টি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ইউনিসেফ এবং সরকারের যৌথ অর্থায়নে এই কার্যক্রম চলবে। এ ছাড়া, চিকিৎসকদের সঠিক গাইডলাইনের জন্য নিজস্ব খরচে ১ লাখ প্রটোকল বুক (চিকিৎসা নির্দেশিকা) প্রকাশ করেছে সোসাইটি অব মেডিসিন, যা দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিতরণ করা হবে। বেসরকারি হাসপাতালে বেডে ১০ এবং টেস্টে ৮০ শতাংশ ছাড় : বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মোট সিটের ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিটে রোগীদের কোনো ডাক্তার বা বেড চার্জ দিতে হবে না (শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ রোগী বহন করবে)। এ ছাড়া, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব ডেঙ্গু রোগীর জন্য ল্যাব ইনভেস্টিগেশনে (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) ৮০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। এখনই নয় ডেঙ্গু ভ্যাকসিন : ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো কিছু দেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হলেও এটি এখনো বিশ্বজুড়ে সার্বজনীন স্বীকৃতি পায়নি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এলডিসি কান্ট্রি হিসেবে হঠাৎ করে এই ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করতে পারি না। খোদা না খাস্তা একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সব দায় আমাদের ওপর আসবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে কথা বলে যদি এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে হয়, তবেই ভবিষ্যতে বিবেচনা করা হবে। আপতত ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না। প্রচারে বেসরকারি হাসপাতাল ও মিডিয়ার সহযোগিতা : টেলিভিশনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর স্পন্সর করা বিভিন্ন প্রোগ্রামে অন্তত ৩০ সেকেন্ড ডেঙ্গু সচেতনতামূলক স্লোগান (যেমন : পানি সরানো, চারপাশ পরিষ্কার রাখা) প্রচার করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষকদের পরামর্শ গ্রহণের নির্দেশ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা করছেন বলে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতকে অবিলম্বে ওই গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেন। তার গবেষণালব্ধ ফল এবং পরামর্শ বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘শূন্য ভান্ডার থেকে যেভাবে অতীতে নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করা হয়েছে, ঠিক তেমনি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবারও ডেঙ্গুর হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে’。
5:31 am, Thursday, 30 July 2026
শিরোনাম :









