বিএসএমএমইউ হাসপাতালের গেট। কোলের শিশুকে নিয়ে ভেতরে ঢুকছিলেন এক মা। ঠিক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলেন তিনজন মানুষ। ধোঁয়া গায়ে লাগার আগেই মা তার আঁচল দিয়ে শিশুর মুখ ঢেকে দিলেনÑ নিঃশব্দে, প্রতিবাদহীনভাবে, যেন এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। অথচ যে হাসপাতাল মানুষকে রোগমুক্ত করার কথা, তার গেটেই যদি বিষ-ধোঁয়া ওতপেতে থাকে, তাহলে বুঝতে বাকি থাকে নাÑআইন আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্বটা ঠিক কতখানি। এই একটি দৃশ্যই আসলে গোটা দেশের চিত্র। বারডেম কিংবা ঢাকা মেডিকেলের সামনের ভাসমান চা স্টলগুলোতেও একই ছবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে আসা একজন অভিভাবক একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ক্যাম্পাসের কোথাও এমন একটুকরো জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না, যেখানে সিগারেটের ধোঁয়া পৌঁছায় না। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, শপিং মল, রেস্তোরাঁÑকোথাও গিয়েই স্বস্তি নেই। ধোঁয়া যেন পিছু ছাড়ে না। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই দৃশ্যগুলো আজ আর কারো চোখে অস্বাভাবিক ঠেকে না। যা একসময় লজ্জার বিষয় ছিল, তা আজ নিছক দৈনন্দিন বাস্তবতা। আজ কিশোর ও তরুণদের হাতে যে ধোঁয়া উঠছে, তা নিছক অভ্যাস নয়Ñএটি একটি সভ্যতার জন্য অশনিসংকেত। পড়াশোনার চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অশান্তি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর হতাশা থেকে সাময়িক মুক্তি খুঁজতে গিয়েই অনেকে হাত বাড়ায় সিগারেটের দিকে। বন্ধুদের প্রভাব আর ‘ধূমপান মানেই আধুনিকতা বা সাহসিকতা’Ñএই ভুল ধারণা তরুণদের বিবেককে দুর্বল করে দেয়, আর ফ্লেভারযুক্ত তামাক-ই-সিগারেট সেই দুর্বলতাকে আরও সহজ করে তোলে, যদিও এগুলো সাধারণ তামাকের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। ধূমপায়ীরা প্রায়ই দাবি করেন সিগারেট মানসিক চাপ কমায়, কিন্তু বাস্তবতা উল্টোÑনিকোটিন-নির্ভরতা আসলে দীর্ঘমেয়াদে চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়; ধূমপানের আপাত ‘স্বস্তি’ আসলে শুধু ধূমপান না করার সময়কার অস্বস্তিরই প্রতিফলন, যা থেকে বেরিয়ে আসা দিনকে দিন কঠিন হয়ে ওঠে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে আসল বিপদÑ ধূমপান কখনো একা আসে না, এটি প্রায়ই আরও ভয়ংকর মাদকাসক্তির প্রবেশদ্বার হয়ে দাঁড়ায়, আর একবার সেই চক্রে পড়লে জীবন অকালে শেষ হয়ে যায়, স্বপ্ন ভেঙে যায়, পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এই নেশার মূল্য শুধু স্বাস্থ্য দিয়ে শোধ হয় নাÑ প্রতিদিন সিগারেটে পুড়ে যাওয়া অর্থ হতে পারত পরিবারের খাবার, শিক্ষা বা চিকিৎসার খরচ, আর সেই আর্থিক চাপ থেকে জন্ম নেয় অশান্তি, হতাশা এবং শেষ পর্যন্ত চুরি, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, যা আজ শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে। ধূমপানের ক্ষতি কখনোই শুধু ধূমপায়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নাÑ প্রকাশ্যে ধূমপান একধরনের সামাজিক অপরাধ, যেখানে একজন সিগারেটখোর নিজের ফুসফুস ধ্বংস করার পাশাপাশি আশপাশের শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবার নিঃশ্বাসকেও বিষে ভরে দেন, আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৯২টি দেশে পরিচালিত এক গবেষণা বলছে, শুধু পরোক্ষ ধোঁয়ার প্রভাবে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ছয় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে প্রায় পৌনে দুই লাখই শিশুÑ যারা মূলত নিউমোনিয়া ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে ঝুঁকে পড়ে মৃত্যুর দিকে। আইনে শুধু প্রকাশ্যে ধূমপানই নয়, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, বিনা মূল্যে নমুনা বিতরণ, দান-পুরস্কারের মাধ্যমে প্রণোদনা, সিনেমা-নাটকে তামাক ব্যবহারের দৃশ্য প্রচার, সাদৃশ্যপূর্ণ মোড়ক তৈরি এমনকি সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির আড়ালে তামাক প্রতিষ্ঠানের নামÑ লোগো ব্যবহারও কড়াভাবে নিষিদ্ধ, আর এসব লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদ- বা এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান আছেÑ তাই আইনের কাঠামো আসলে দুর্বল নয়, দুর্বলতা বাস্তবায়নে; শুধু জরিমানা বাড়ালেই চলবে না, দরকার নিয়মিত ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেদের আগে আইন মানার দৃষ্টান্ত স্থাপন, প্রয়োজনে ডোপ টেস্টের মতো উদ্যোগ, রেলস্টেশন-বিমানবন্দর-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে নিয়মিত অভিযান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এবং এমন একটি নির্ভরযোগ্য অভিযোগ-ব্যবস্থা যেখানে অভিযোগকারী হয়রানির শিকার না হয়ে প্রকৃত প্রতিকার পান। তরুণ প্রজন্মকে এই ধোঁয়ার জাল থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে লড়াইটা একার নয়Ñপরিবার, সমাজ আর রাষ্ট্র, তিন স্তরেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই লড়াই শুরু হতে পারে ব্যক্তি পর্যায় থেকে, তারপর পরিবার, পাড়া-মহল্লা হয়ে ক্রমান্বয়ে দেশ পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ১. সন্তানের মানসিক চাপ, বন্ধুমহল আর দৈনন্দিন আচরণ বোঝার মতো সংবেদনশীলতা পরিবারকেই দেখাতে হবে সবার আগে। নীরব দর্শক না থেকে খোলামেলা কথোপকথনের পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। সন্তান ইতোমধ্যে জড়িয়ে পড়লে তিরস্কারের বদলে প্রয়োজন সহানুভূতিপূর্ণ সহায়তা। ছাড়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, ট্রিগার এড়িয়ে চলা, গান-বই-আড্ডার মতো বিকল্প খুঁজে নেওয়া, ছেড়ে দেওয়া মানুষদের পরামর্শ নেওয়াÑএসব অভ্যাসও পরিবার থেকেই উৎসাহিত করা যায়। ২. স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও কাউন্সেলিং চালাতে হবে, আর যারা ধূমপান ছেড়েছেন তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায় অনুপ্রেরণা হিসেবে। ধর্মীয় উপাসনালয়ের দায়িত্বরত ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে তার প্রভাব হবে গভীর। গণমাধ্যম ও সংগঠনগুলোকেও বিজ্ঞাপন-নাটক-প্রবন্ধের মাধ্যমে বার্তা ছড়াতে হবে, আর ক্যাম্পাসে ধূমপায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট জোন তৈরির প্রস্তাবও বিবেচনাযোগ্য। ৩. আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিয়মিত অভিযান আর নিরপেক্ষ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। সঙ্গে দরকার কাউন্সেলিং, ওষুধ ও আচরণগত সহায়তার সমন্বিত কর্মসূচিÑগবেষণা বলছে এমন সমন্বিত সহায়তা জোর করে ছাড়ানোর চেয়ে বেশি কার্যকর, আর ধূমপান ত্যাগে আগ্রহীদের একাধিক বিকল্প দিলে সাফল্যের হার বাড়ে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক হস্তক্ষেপ বিশেষভাবে সহায়ক, যা অকাল জন্মের ঝুঁকিও কমাতে পারে। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ তার যুব সমাজ। সেই বিনিয়োগ যদি প্রতিদিন একটু একটু করে ধোঁয়ায় পুড়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। আজ যদি আমরা এই ধোঁয়ার মিছিল থামাতে না পারি, আগামীকাল হয়তো থামানোর মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে পাড়া-মহল্লা, সেখান থেকে থানা-উপজেলা-জেলা হয়ে জাতীয় পর্যায় পর্যন্তÑপ্রতিটি স্তরে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই লড়াইয়ে অংশ নিতে পারিÑ একটি সচেতন প্রশ্ন, একটি প্রতিবাদী কণ্ঠ, কিংবা একটি পরিবারের ভেতরকার খোলামেলা কথোপকথন দিয়েই এই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে। তামাকের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম আসলে শুধু স্বাস্থ্য রক্ষার লড়াই নয়, এটি একটি জাতিকে নেশার হাত থেকে বাঁচানোর লড়াই। এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার, আর এখনই সময় সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার। কারণ আগামী প্রজন্মের সুস্থতা, কর্মক্ষমতা আর মানবিকতা নির্ভর করছে আজকের এই সিদ্ধান্তের ওপরই।
5:15 am, Thursday, 30 July 2026
শিরোনাম :
ধোঁয়ার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে যে প্রজন্ম
-
MIT ERP
- Update Time : 04:31:01 am, Thursday, 30 July 2026
- 1
Tag :








