আজ শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
১৫ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৭৭%

মাত্র ২০ হাজার টাকা সম্বল নিয়ে হেঁটেই মক্কার পথে ৬০ বছরের আব্দুর রহিম

  • MIT ERP
  • Update Time : 09:28:58 pm, Friday, 30 October 2026
  • 15

মাত্র ২০ হাজার টাকা সম্বল নিয়ে হেঁটেই মক্কার পথে ৬০ বছরের আব্দুর রহিম

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মাথার ওপর টিনের ছাউনি, অভাবের সংসার। জীবিকা নির্বাহ করেন অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করে। সংসারের খরচ জোগাতে স্ত্রীও কাজ করেন স্থানীয় একটি হোটেলে। এমন বাস্তবতার মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বপ্ন লালন করে আসছেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ৬০ বছর বয়সী আব্দুর রহিম।

তার সেই স্বপ্ন পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ পালন করা। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের আশায় মাত্র ২০ হাজার টাকা সম্বল করে পায়ে হেঁটে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন তিনি। আব্দুর রহিম শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের আমিনপুর আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত ফয়েজ উদ্দিন। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

তবে সীমিত অর্থ নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছানো এবং হজ পালনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘর বলতে ছোট একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে টিনের ছাউনির ওপর বিছিয়ে রাখা হয়েছে পলিথিন। এই ঘরেই স্ত্রী রহিতন বিবিকে নিয়ে বসবাস করেন আব্দুর রহিম।

আব্দুর রহিমের স্ত্রী রহিতন বিবি জানান, তার স্বামী অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দিনমজুরি করে যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। সংসারের আর্থিক সংকট সামাল দিতে তিনিও স্থানীয় একটি হোটেলে মসলা বাটার কাজ করেন। তাদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। রহিতন বিবি বলেন, প্রায় ছয় বছর আগে তার স্বামী বরিশালের চরমোনাইয়ে ওরশ মাহফিলে গিয়েছিলেন।

সেখান থেকে ফেরার পর তার মধ্যে হজ পালনের প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই হজে যাওয়ার কথা বলতেন। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি বলেন, স্বামীর এই স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষায় কখনো বাধা দেননি। শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তার জন্য দোয়া করছেন। আল্লাহ যেন তার স্বামীর মনের আশা পূরণ করেন।

তবে স্বামীর কাছে ঠিক কত টাকা রয়েছে, তা তিনি জানেন না। এ কারণে তার মনে দুশ্চিন্তাও রয়েছে। একই গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, শফিকুল ইসলাম ও সুলতান মাহমুদসহ অন্তত ১০ জন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে আব্দুর রহিম হজ পালনের ইচ্ছার কথা বলে আসছেন। কাজের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে এ নিয়ে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন।

প্রতিবেশীরা জানান, অর্থ সঞ্চয়ের জন্য আব্দুর রহিম কাটা গাছের গোড়া ও মোথা সংগ্রহ করতেন। পরে সেগুলো থেকে লাকড়ি তৈরি করে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করতেন। এভাবে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তার সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জমেছে। প্রতিবেশীরা আরও জানান, প্রায় দুই বছর আগে অনেক কষ্টে পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন আব্দুর রহিম। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় ভিসা সংগ্রহ করতে পারেননি।

শেষ পর্যন্ত সীমিত অর্থ নিয়েই পায়ে হেঁটে মক্কার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তিনি। বাড়ি থেকে যাত্রার সময় আব্দুর রহিমের গলায় ঝোলানো ছিল পায়ে হেঁটে হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা লেখা একটি নেমপ্লেট। হাতে ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আশায় সামান্য অর্থ সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছেন তার এই যাত্রা। তার এ উদ্যোগে বিস্মিত হয়েছেন গ্রামের অনেকে।

তবে একই সঙ্গে তার নিরাপত্তা, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতা এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রতিবেশীরা। তাদের প্রত্যাশা, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা সামর্থ্যবান প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে দাঁড়ালে স্বপ্ন পূরণের একটি পথ তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে ভবানীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন বলেন, আব্দুর রহিম তার কাছ থেকে একটি নাগরিকত্ব সনদ নিয়েছেন।

তিনি শুনেছেন, আব্দুর রহিম পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রওনা হয়েছেন। তবে মাত্র ২০ হাজার টাকা নিয়ে তার এই দীর্ঘ যাত্রা কতটা এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে আব্দুর রহিমের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ভিসা ও যাতায়াতসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জামায়াত কর্মীকে দেখতে গেলেন ডা. জাহাঙ্গীর

মাত্র ২০ হাজার টাকা সম্বল নিয়ে হেঁটেই মক্কার পথে ৬০ বছরের আব্দুর রহিম

Update Time : 09:28:58 pm, Friday, 30 October 2026

মাথার ওপর টিনের ছাউনি, অভাবের সংসার। জীবিকা নির্বাহ করেন অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করে। সংসারের খরচ জোগাতে স্ত্রীও কাজ করেন স্থানীয় একটি হোটেলে। এমন বাস্তবতার মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বপ্ন লালন করে আসছেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ৬০ বছর বয়সী আব্দুর রহিম।

তার সেই স্বপ্ন পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ পালন করা। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের আশায় মাত্র ২০ হাজার টাকা সম্বল করে পায়ে হেঁটে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন তিনি। আব্দুর রহিম শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের আমিনপুর আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত ফয়েজ উদ্দিন। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

তবে সীমিত অর্থ নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছানো এবং হজ পালনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘর বলতে ছোট একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে টিনের ছাউনির ওপর বিছিয়ে রাখা হয়েছে পলিথিন। এই ঘরেই স্ত্রী রহিতন বিবিকে নিয়ে বসবাস করেন আব্দুর রহিম।

আব্দুর রহিমের স্ত্রী রহিতন বিবি জানান, তার স্বামী অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দিনমজুরি করে যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। সংসারের আর্থিক সংকট সামাল দিতে তিনিও স্থানীয় একটি হোটেলে মসলা বাটার কাজ করেন। তাদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। রহিতন বিবি বলেন, প্রায় ছয় বছর আগে তার স্বামী বরিশালের চরমোনাইয়ে ওরশ মাহফিলে গিয়েছিলেন।

সেখান থেকে ফেরার পর তার মধ্যে হজ পালনের প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই হজে যাওয়ার কথা বলতেন। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি বলেন, স্বামীর এই স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষায় কখনো বাধা দেননি। শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তার জন্য দোয়া করছেন। আল্লাহ যেন তার স্বামীর মনের আশা পূরণ করেন।

তবে স্বামীর কাছে ঠিক কত টাকা রয়েছে, তা তিনি জানেন না। এ কারণে তার মনে দুশ্চিন্তাও রয়েছে। একই গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, শফিকুল ইসলাম ও সুলতান মাহমুদসহ অন্তত ১০ জন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে আব্দুর রহিম হজ পালনের ইচ্ছার কথা বলে আসছেন। কাজের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে এ নিয়ে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন।

প্রতিবেশীরা জানান, অর্থ সঞ্চয়ের জন্য আব্দুর রহিম কাটা গাছের গোড়া ও মোথা সংগ্রহ করতেন। পরে সেগুলো থেকে লাকড়ি তৈরি করে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করতেন। এভাবে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তার সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জমেছে। প্রতিবেশীরা আরও জানান, প্রায় দুই বছর আগে অনেক কষ্টে পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন আব্দুর রহিম। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় ভিসা সংগ্রহ করতে পারেননি।

শেষ পর্যন্ত সীমিত অর্থ নিয়েই পায়ে হেঁটে মক্কার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তিনি। বাড়ি থেকে যাত্রার সময় আব্দুর রহিমের গলায় ঝোলানো ছিল পায়ে হেঁটে হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা লেখা একটি নেমপ্লেট। হাতে ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আশায় সামান্য অর্থ সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছেন তার এই যাত্রা। তার এ উদ্যোগে বিস্মিত হয়েছেন গ্রামের অনেকে।

তবে একই সঙ্গে তার নিরাপত্তা, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতা এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রতিবেশীরা। তাদের প্রত্যাশা, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা সামর্থ্যবান প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে দাঁড়ালে স্বপ্ন পূরণের একটি পথ তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে ভবানীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন বলেন, আব্দুর রহিম তার কাছ থেকে একটি নাগরিকত্ব সনদ নিয়েছেন।

তিনি শুনেছেন, আব্দুর রহিম পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রওনা হয়েছেন। তবে মাত্র ২০ হাজার টাকা নিয়ে তার এই দীর্ঘ যাত্রা কতটা এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে আব্দুর রহিমের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ভিসা ও যাতায়াতসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা জরুরি।