সরকারের ওপর ক্রমাগত অনাস্থা এনে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ নানা ইস্যু ও দাবিতে আগামী দিনগুলোয় রাজপথ নিজেদের দখলে নিতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনের ফল তাদের আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। আসন্ন আন্দোলনের মূল রণকৌশল কেবল সরকারের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা নয়; বরং জামায়াত-এনসিপির ভেতরে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও সাংগঠনিক ফাটল ঘুচিয়ে একটি নিñিদ্র ‘ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করা।
নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির ১৯৫ সদস্যের নতুন কমিটি গঠনের পর এবং নোয়াখালীর সুবর্ণচরের মতো জায়গায় জামায়াত ব্যাকগ্রাউন্ডের নেতাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দুই দলের লিবারেল ও কট্টরপন্থী অংশের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা মেটাতেই এই যৌথ আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। দুই দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমাবেশ আর লংমার্চ কর্মসূচি শেষে তারা নতুন পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামবে।
দুই দল যৌথভাবে মাঠে নামবে, নাকি গোপনে একসঙ্গে বসে পরিকল্পনা ও কৌশল অবলম্বন করে মাঠে নামবে— সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে এখনো আলোচনা চলছে। তবে লক্ষ্য এক রেখে দল দুটি পৃথক কর্মসূচি নিয়ে আন্দোলনের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। দুই দলের নেতাদের ভাষ্য, বিএনপি সরকারের আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে টেক্কা দিতে সম্পূর্ণ নতুন অলআউট আন্দোলনের ব্লুপ্রিন্ট চূড়ান্ত করেছে জামায়াত-এনসিপি অক্ষ।
এর বিপরীতে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলেও চলছে পাল্টা প্রস্তুতি। সরকারপক্ষ বলছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা আন্দোলন করতেই পারে। দাবিও থাকতে পারে। কিন্তু আন্দোলনের নামে যদি দেশ বা রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতার পথ বেছে নেয় বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে হাত মেলায়, তাহলে সেসব ষড়যন্ত্র কঠিনভাবে রুখতে হবে। এসব মোকাবিলায় সম্পন্ন হয়েছে পাল্টা ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ লকডাউনে’র গোপন প্রস্তুতি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নভেম্বরের শুরুতেই দেশের মাঠপর্যায়ের রাজনীতি চরম মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়াবে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই জামায়াত-এনসিপি জোটের মূল স্ট্র্যাটেজি কেবল প্রথাগত সভা-সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না। তবে সবার আগে তাদের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা হলো, প্রতিটি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যৌথ ‘নাগরিক প্রতিরোধ ও নজরদারি কমিটি’ গঠন করে নিজেদের ভেতরের গ্রাসরুট লেভেলের দূরত্ব পুরোপুরি মিটিয়ে ফেলা।
ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনে ফলাফল দেখার পর তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের যেকোনো একতরফা সিদ্ধান্তকে একটি ঐক্যবদ্ধ অ্যানালগ কমিটির মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে; বিশেষ করে ফিজিক্যাল ট্রান্সপোর্টার সিন্ডিকেট এবং গ্রামীণ বাজার কমিটিগুলোকে বিএনপির একক নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে এনে সমান্তরাল এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বলয় তৈরি করাই এই জোটের মূল লক্ষ্য।
দৃশ্যত দুই দল আলাদা ব্যানার ব্যবহার করলেও পর্দার আড়ালে সচল হওয়া একটি ‘যৌথ অ্যাকশন কমিটি’ এরই মধ্যে তৈরি করে রোডম্যাপ চূড়ান্ত করছে, যা তাদের মধ্যকার সাংগঠনিক দূরত্ব ঘোচানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বিশ্লেষকেরা আরও জানান, গত সপ্তাহে জামায়াত ও এনসিপির মাঠপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে একাধিক গোপন সমন্বয় সভা হয়েছে।
এসব সভায় দুই দলের নেতারাই স্বীকার করেছেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন বা নেতৃত্ব বণ্টন নিয়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও মাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বিএনপির বিরুদ্ধে এককাট্টা হওয়া ছাড়া তাদের গতি নেই। বিশেষ করে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এনসিপিতে জামায়াত ব্যাকগ্রাউন্ডের নেতাদের অন্তর্ভুক্তির পর যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি হয়েছিল, তা এই যৌথ আন্দোলনের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানান, মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কাছে একটি অত্যন্ত জরুরি ও গোপন বার্তা বা নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পাঠানো এই বিশেষ নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট উল্লেখ করেছে, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় ‘নাগরিক কমিটি’ বা সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির লজিস্টিকস ও গোপন তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সরকারের আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের স্থানীয়ভাবে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠপর্যায়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাদের গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখতে হবে, যাতে তারা কোনো অশুভ তৎপরতা চালাতে না পারেন।
অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ঘোষিত আজকের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চের মূল রুট ম্যাপে শেষ মুহূর্তে কৌশলগত ও সমান্তরাল বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূল হাইওয়েগুলোয় সিসিটিভি ক্যামেরা ও পুলিশের কড়া ব্যারিকেড ও চেকিং এড়াতে মূল রুট থেকে সরে গিয়ে মফস্বলের অভ্যন্তরীণ এবং শাখা নদীপথের ট্রানজিট পয়েন্টগুলোকে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই অক্ষ।
প্রশাসনের নজরদারি ও সরাসরি সংঘাত ফাঁকি দিয়ে ব্যাপক জনসমাগম নিশ্চিত করতেই লংমার্চের এই গোপন রুটবদল বলে বিশ্বস্ত দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। আন্দোলনের এই কৌশল ও নিজেদের ভেতরের সমীকরণ নিয়ে জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, “ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনে আমাদের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের ওপর যেভাবে জুলুম করা হয়েছে এবং ‘বিএনপিকে ভোট না দিলে বাড়িতে থাকতে হবে’ বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা প্রমাণ করে এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
আমাদের এই আন্দোলন কেবল একটি উপনির্বাচনের বিরুদ্ধে নয়; এটি পুরো শাসনব্যবস্থা সংস্কারের দাবি। এনসিপির সঙ্গে আমাদের কিছু কৌশলগত দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করেছিল চক্রান্তকারীরা; কিন্তু রাজপথে আমাদের লক্ষ্য এক। আমরা নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও প্রশাসনের খোলনলচে বদলাতে অলআউট কর্মসূচির দিকে যাচ্ছি।
” অন্যদিকে এনসিপির পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও জুলাই অভ্যুত্থানের অগ্রভাগের এক সংগঠক দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও আন্দোলন নিয়ে তার অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ‘২৩ অক্টোবরের ১৯৫ সদস্যের কমিটি নিয়ে দলের ভেতরে যে সামান্য ভুল-বোঝাবুঝি ছিল, তা আমরা আলোচনার মাধ্যমে গুছিয়ে আনার চেষ্টা করছি। নোয়াখালী বা তৃণমূলের কিছু জায়গায় জামায়াত ব্যাকগ্রাউন্ডের নেতা অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি ছিল মাঠের বাস্তবতা ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা।
সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে আমাদের সব শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং নির্বাচন কমিশনের আমূল সংস্কারের দাবিতে অটল। নভেম্বর থেকে শাহবাগ বা সচিবালয় ঘেরাওয়ের যে আলটিমেটাম দেওয়া আছে এবং আরও যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, তা থেকে আমরা একচুলও নড়ব না। ’ জামায়াত-এনসিপি অক্ষের এই অলআউট ব্লুপ্রিন্ট ও সরকার পতনের সুপ্ত চেষ্টা নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যারা রাজপথে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চায়, তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক হয়েছে, পরাজয়ের ভয়ে জামায়াত এখন অপপ্রচার চালাচ্ছে। প্রশাসনের ওপর কোনো দলীয় নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়নি। আমলাতন্ত্র তার নিজস্ব গতিতে চলছে। তবে কেউ যদি সমাজসেবা বা আন্দোলনের মুখোশ পরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করতে চায়, তবে সরকার ও প্রশাসন কাউকেই ছাড় দেবে না। রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক সাইফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জামায়াত ও এনসিপির এই জোট মূলত আদর্শিক নয়, এটি সম্পূর্ণ কৌশলগত।
এনসিপি তার জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লিবারেল ও তরুণ স্পিরিট ধরে রাখতে গিয়ে জামায়াতের মতো সুসংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক দলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এনসিপির ভেতর আরও ভাঙন ধরাতে পারে। জামায়াত ঘরানার অনুপ্রবেশ নিয়ে দলের ভেতরে যে মনস্তাত্ত্বিক ফাটল ধরেছে, তা রাজপথ গরম করে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বুমেরাং হবে।
তিনি যোগ করেন, বিএনপি সরকারও এই মুহূর্তে একধরনের ‘প্রশাসনিক লকডাউন’ বা আমলাতান্ত্রিক কঠোরতার নীতি গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অফিস আদেশ ও ডিসিদের কাছে পাঠানো কড়া নির্দেশনা তারই প্রতিফলন। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে আন্দোলনের চালিকাশক্তিদের শুরুতেই আইনি মারপ্যাঁচে আটকে ফেলার যে কৌশল সরকার নিয়েছে, তা মাঠের সংঘাতকে আরও আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে যেতে পারে।
হাইওয়ের নজরদারি এড়াতে শাখা নদী ও গ্রামীণ অ্যানালগ রুট ব্যবহার করে যেভাবে কর্মীবাহিনী স্থানান্তরের ছক কষা হচ্ছে, তা প্রমাণ করে রাজনৈতিক দলগুলো এখন রাষ্ট্রীয় নজরদারি ফাঁকি দেওয়ার নতুন নতুন কৌশল রপ্ত করছে। আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, এনসিপির ভেতরের লিবারেল ফ্রন্টের একটি বড় অংশ মনে করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের লংমার্চ ও শাহবাগের ব্লকেড কর্মসূচিতে অন্ধভাবে অংশ নিলে এনসিপি তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা হারাবে।
এই মনস্তাত্ত্বিক ফাটলই এখন বিএনপি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা। সার্বিক বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিরোধী দল এখনো হরতাল বা অবরোধের মতো কঠোর কোনো কর্মসূচি দেয়নি। তবে জনগণের দাবি আদায়ে ও অধিকার রক্ষায় প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় তারা এমন কঠোর কর্মসূচি দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
দ্রুত নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন, নিরপেক্ষভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী করে স্বরাষ্ট্র ও বিদ্যুৎমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পুলিশপ্রধানের (আইজিপি) বিতর্কিত মন্তব্যের পর তার অপসারণ দাবি করেন নাহিদ। আন্দোলন প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘সরকারের প্রতিটি অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী তীব্র ও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সরকার একটার পর একটা অঘটন ঘটাবে, আর আমরা বসে থাকব, এটা হয় না। ইতিহাস কি আমাদের ক্ষমা করবে? ’ তিনি আরও বলেন, মানুষ সংবিধানের ঘষামাজা নয়, আমূল পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। অবিলম্বে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা না হলে আরও কঠোর আন্দোলন করা হবে বলে জানান হামিদুর রহমান।






















