ভাবুন, অনলাইনে সন্তানের জন্য একটি সুন্দর পোশাক কিনলেন। ছবিতে যেমন দেখেছিলেন, হাতে পাওয়ার পরও অনেকটা তেমনই। কিন্তু একবার ধোয়ার পরই উঠে গেল রং! আরেকবার পরার উপায় নেই। পুরো টাকাটাই যেন জলে গেল।
এটি কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়। অনলাইনে কেনাকাটা করে এমন অভিজ্ঞতার কথা জানান একাধিক ক্রেতা। প্রতারণার চিত্র শুধু নিম্নমানের পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোথাও অগ্রিম টাকা নিয়ে বিক্রেতার উধাও হয়ে যাওয়া, কোথাও নকল পণ্য, আবার কোথাও আকর্ষণীয় ছাড়ের ফাঁদে ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চুরি।
প্রশ্ন হলো, অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়ে প্রতারিত হলে কী করবেন? কোথায় অভিযোগ জানাবেন? আর আইনই বা আপনাকে কী সুরক্ষা দিচ্ছে?
অনলাইনে কেনাকাটার এমন অভিজ্ঞতা যে বিচ্ছিন্ন নয়, তার প্রমাণ মিলছে সরকারি পরিসংখ্যানে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংস্থাটিতে মোট অভিযোগ জমা পড়ে ৫২ হাজার ৪৫৯টি। এর মধ্যে ৩১ হাজার ৯৭০টি অভিযোগ ছিল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন কেনাকাটাসংক্রান্ত। অর্থাৎ, মোট অভিযোগের প্রায় ৬১ শতাংশই এই খাতের বিরুদ্ধে।
প্রতি ১০০টি অভিযোগের মধ্যে প্রায় ৬১টিই অনলাইন কেনাকাটা নিয়ে। আর ২০২৬ সালের আগস্টে সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮ হাজার ৭২০টি। এসব অভিযোগে গ্রাহকদের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।
প্রতারণার কৌশলও বদলাচ্ছে। পরিচিত ব্র্যান্ডের নামে ফেসবুক পেজ খুলে বিক্রি করা হচ্ছে নিম্নমানের পণ্য। বিজ্ঞাপনে এক রকম পণ্য দেখিয়ে পাঠানো হচ্ছে অন্য কিছু। কখনো কুরিয়ার চার্জ বা বুকিং মানির নামে আগাম টাকা নেওয়ার পর আর যোগাযোগই করছে না বিক্রেতা।
এর বাইরেও আছে ভুয়া ওয়েবসাইট, সাজানো রিভিউ এবং অস্বাভাবিক ছাড়ের প্রলোভন। এসব লিংকে ক্লিক করে কেউ কেউ ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড কিংবা পাসওয়ার্ডের মতো গোপন তথ্যও হারাচ্ছেন।
তাই শুধু পণ্যের ছবি দেখে বা কম দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বিক্রেতার পরিচয়, পেজের পুরোনো কার্যক্রম, ক্রেতাদের বিশ্বাসযোগ্য রিভিউ এবং পেমেন্টের পদ্ধতি যাচাই করাও জরুরি।
অনলাইনে প্রতারিত হলে প্রথমেই যোগাযোগ করতে পারেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে। সংস্থাটির সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগ জানাতে হটলাইন নম্বর ১৬১২১। অনলাইনেও অভিযোগ করা যায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ওয়েবসাইটে।’
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৬০ ধারা অনুযায়ী, অভিযোগের কারণ সৃষ্টির ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ দায়ের করতে হয়। সময় পেরিয়ে গেলে অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তাই প্রতারিত হওয়ার পর দেরি না করাই ভালো।
*অভিযোগের সঙ্গে পণ্য কেনার রসিদ বা পেমেন্টের প্রমাণ দিতে হবে।
*অর্ডারের স্ক্রিনশট, বিক্রেতার পেজ বা ওয়েবসাইটের লিংক, কথোপকথন, পণ্যের ছবি এবং টাকা পাঠানোর রেকর্ডও সংরক্ষণ করুন।
*অভিযোগে নিজের পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্যের পাশাপাশি বিক্রেতার বিস্তারিত তথ্য দিন।
প্রতারণার ধরন অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে টাকা ফেরত বা ক্ষতিপূরণ চাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। অপরাধের উপাদান থাকলে থানায়ও অভিযোগ করা যায়। কোন পথে এগোবেন, তা নির্ভর করবে ঘটনার ধরন ও প্রমাণের ওপর।
অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে রয়েছে ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা-২০২১। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় পণ্যের বিবরণ, ডেলিভারি, মূল্য ফেরত এবং ছাড়ের বিষয়ে নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, সম্পূর্ণ মূল্য নেওয়ার পর পণ্য নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে না পারলে অর্থ ফেরতের বিধান রয়েছে। পণ্য বা সেবার মূল্য, গুণগত মান, ডেলিভারি চার্জ এবং প্রাসঙ্গিক শর্তও ক্রেতার কাছে স্পষ্ট করতে হবে। স্টকে নেই এমন পণ্যের ক্ষেত্রে সেটি পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।
এদিকে সরকার জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা ও ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি বা ডিবিআইডি নিবন্ধন নির্দেশিকার মাধ্যমে অনলাইন ব্যবসায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে নিয়ম থাকা আর প্রতিটি ঘটনায় কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং ভোক্তার অর্থ ফেরত পাওয়ার বাস্তব প্রক্রিয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনে কেনাকাটা বন্ধ করে দেওয়াই সমাধান নয়। বরং কেনাকাটার আগে কয়েকটি অভ্যাস আপনাকে ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে পারে।
অপরিচিত পেজে অস্বাভাবিক কম দামের অফার দেখলে সতর্ক হোন। সম্ভব হলে ক্যাশ অন ডেলিভারি বেছে নিন। তবে মনে রাখবেন, পণ্য হাতে পেয়ে টাকা দিলেও পণ্যের মান বা সত্যতা নিশ্চিত হয় না।
পেমেন্টের জন্য অপরিচিত লিংকে যাবেন না, আর কাউকে পাসওয়ার্ড বা গোপন আর্থিক তথ্য দেবেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অর্ডার, পেমেন্ট ও বিক্রেতার সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ মুছে ফেলবেন না।
অনলাইনে কেনাকাটায় সুবিধা আছে, কিন্তু সেই সুবিধা যেন প্রতারণার সুযোগ না হয়ে ওঠে। সচেতন ক্রেতা হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং প্রতারিত মানুষের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা।





















