রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং হাসপাতাল ঘেরাওয়ের আহ্বানকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি যেমন উঠেছে, তেমনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চার বছর বয়সি শিশু আভানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার খ-িত বিবরণ ও ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এমনকি ফেসবুকে হাসপাতাল ঘিরে ‘মব’ সৃষ্টির ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রাজধানীসহ সারাদেশে এ রকম ঘটনা মাঝে মধ্যেই ঘটে। একপক্ষের দাবি, কান্নাকাটি আর ভুঁইফোঁর ইউটিউবারদের প্রচারণায় আড়াল হয়ে যায় প্রকৃত সত্য। সৃষ্টি হয় মবের। হামলা হয় হাসপাতালে। মারধর করা হয় চিকিৎসকদের। পক্ষান্তরে আড়াল পড়ে যায়, প্রকৃত ঘটনা। উন্মোচন হয় না আর প্রকৃত কারণ। সম্প্রতি এ ধরনের একটি ঘটনায়, রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে এসব অভিযোগ তুলে ধরে জরুরি পদক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
এতে শিশুটির চিকিৎসার ধারাবাহিক বিবরণ তুলে ধরার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার বন্ধ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং চিকিৎসাজনিত অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের স্মারকলিপি অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে চার বছর বয়সি ওয়াইজ নি আভানকে নাক দিয়ে রক্তপাত ও হেমোরেজিক ডেঙ্গুর সন্দেহ নিয়ে হাসপাতালে আনা হয়।
প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শিশুটিকে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। পরে শিশুটিকে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের বিবরণে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও সি-আরপি, ফেরিটিন, প্রোক্যালসিটোনিন এবং লিভার এনজাইমসহ কয়েকটি পরীক্ষার ফল ডেঙ্গুর জটিলতাপূর্ণ উপসর্গের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল বলে চিকিৎসকেরা মনে করেন।
সে অনুযায়ী চিকিৎসা চলছিল। ১ অক্টোবর সন্ধ্যার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। হাসপাতালের দাবি, এ সময় শিশুটিকে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হলেও তার মা প্রথমে তাতে সম্মত হননি। পরদিন সকালে শিশুটির অবস্থা আরও খারাপ হলে চিকিৎসকেরা আবারও নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২ অক্টোবর বিকেল চারটার দিকে শিশুটিকে পিআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রক্তচাপ ও শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করার জন্য বিভিন্ন তরল ও ওষুধ দেওয়া হয়। পরদিন শিশুটির অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। হৃদযন্ত্রের জটিলতার আশঙ্কায় পরীক্ষার ফল বিবেচনায় চিকিৎসকেরা আইভিআইজি ও মিথাইলপ্রেডনিসোলোন প্রয়োগ করেন বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩ অক্টোবর বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে শিশুটির শ্বাস-প্রশ্বাসের অবস্থা আরও খারাপ হলে ভেন্টিলেটরসহ জীবনরক্ষাকারী সহায়তা দেওয়া হয়। পরে তার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেলে সিপিআর দেওয়া হয়। সব চেষ্টা সত্ত্বেও বিকেল ৫টা ২ মিনিটে শিশুটির মৃত্যু হয় বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। মৃত্যুর পর পরিবারের কাছে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ও মৃত্যু সনদ হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ রয়েছে।
শিশুটির মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া বিবেচনা না করে খ-িত তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। তাদের দাবি, এ ধরনের প্রচার চিকিৎসকদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণœ করছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা যেমন হাসপাতালের বক্তব্যের ভিত্তিতে খারিজ করা যায় না, তেমনি একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অভিযোগও স্বাধীন যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
শিশুটির চিকিৎসার নথি, পরীক্ষার ফল, ওষুধ প্রয়োগের সময়, নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ভূমিকা পর্যালোচনার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাসেবায় কোনো অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু ঘটলে রোগীর স্বজনদের প্রশ্ন ও অভিযোগ জানানোর সুযোগ যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি পাশাপাশি চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, রোগীর গোপনীয়তা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবেশও বজায় রাখা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপে নয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ফেসবুকে হাসপাতাল ঘেরাও করে মব সৃষ্টির আহ্বান জানানো হচ্ছে। এ ধরনের আহ্বান বাস্তবে সহিংসতায় রূপ নিলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। একই সঙ্গে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অন্য রোগীদের সেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার প্রতিকার চাওয়ার আইনি পথ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগের নিষ্পত্তির আগে ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি, ভাঙচুর কিংবা সংঘবদ্ধ হামলার পরিবেশ তৈরি হলে তা ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রতিষ্ঠানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে সংকটাপন্ন রোগীদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এ ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের মধ্যে আইনি জটিলতা ও সামাজিক হয়রানির ভয় বাড়লে তারা জটিল রোগীর চিকিৎসা ও জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়তে পারেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ডিফেন্সিভ মেডিসিন’ নামে পরিচিত এ প্রবণতায় চিকিৎসকেরা সম্ভাব্য অভিযোগ এড়াতে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে পারেন।
তবে এ ধরনের প্রভাবের মাত্রা নির্ধারণে প্রমাণ ও গবেষণা প্রয়োজন। স্মারকলিপিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসাসংক্রান্ত মিথ্যা তথ্য, অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স এবং অন্য কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠলে জনরোষ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের পরিবর্তে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থার ওপরও জোর দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া পিআইসিইউ বা আইসিইউতে রোগী স্থানান্তরের মতো জরুরি সিদ্ধান্তের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এ ঘটনায় স্থানান্তরে বিলম্ব শিশুটির মৃত্যুর কারণ হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য চিকিৎসাবিষয়ক স্বাধীন পর্যালোচনা প্রয়োজন। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কারো মৃত্যু তার পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
সেই শোকের মধ্যে মৃত্যুর কারণ জানতে চাওয়া ও জবাবদিহি দাবি করা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দাবি যেন অপপ্রচার, হুমকি কিংবা সহিংসতার রূপ না নেয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। চিকিৎসার নথি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তই পারে প্রকৃত সত্য সামনে আনতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘিরে অনিশ্চয়তা ও সংঘাত কমাতে। এর বাইরে গিয়ে অহেতুক মব সুষ্টি করে কিছু ঘটানোর চেষ্টা করলে সেটা হবে, চিকিৎসা প্রাপ্তি নিয়ে জটিলতা।
সেটা যে হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রেই হোক। চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই যদি এক ধরনের ট্রমায় থাকেন তাতে করে ক্ষতি রোগী বা সেবাগ্রহিতাদেরই।





















