আজ বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫৮%

বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের উত্থান: বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য

  • MIT ERP
  • Update Time : 01:57:08 am, Wednesday, 28 October 2026
  • 20

বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের উত্থান: বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করলে হেজিমনি ধারণাটি সামনে আসে। সহজ ভাষায়, যে শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার করে, তাকে হেজিমন বলা হয়।

একটি রাষ্ট্র তখনই হেজিমনিক বা পরাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে উত্থাপিত হয়, যখন ওই দেশে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ইত্যাদি দিক হতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি পরাশক্তিধর রাষ্ট্র, কারণ যুক্তরাষ্ট্র হেজিমনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার সবগুলো শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। যখনই কোনো একটি রাষ্ট্র পরাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে উত্থাপিত হয়, তখনই বিপরীত/শত্রু রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ওই রাষ্ট্রের থ্রেট হিসেবে মনে করে।

ঠিক তখনই বিপরীত/শত্রু রাষ্ট্রগুলো তাদের দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক দিয়ে নিজেদের শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যালেন্স অফ পাওয়ার বা শক্তির ভারসাম্য বিষয়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিক পরিচিতি পেলেও বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাস্তববাদীদের মতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নৈরাজ্যময়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়Ñ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে নিয়ে। আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র নয়, কিন্তু সে ঞযৎবংযড়ষফ হঁপষবধৎ বা দ্বারপ্রান্তের রাষ্ট্র। তাই ইরান যদি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয় সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দমিয়ে রাখার জন্য নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে তার মধ্যে অন্যতম হলোÑ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক চাপ।

নিষেধাজ্ঞা যখন ইরানকে থামাতে পারেনি তখন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঙঢ়বৎধঃরড়হ ঊঢ়রপ ঋঁৎু শুরু হয়। বর্তমানে অক্টোবর ২০২৬ এ যুদ্ধ এক অচল অবস্থায় আছে। এটাই শক্তির ভারসাম্যের বাস্তব উদাহরণ। বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বলতে আমরা গত ৮০ বছর ধরে একটি মাত্র বাস্তবতাকে বুঝে এসেছি, তা হলোÑ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একমেরু ব্যবস্থা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে ডলারকে ‘বিশ্ব মুদ্রা’ আই এম এফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক বানিয়ে যে হেজিমনিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল তা এতদিন প্রশ্নাতীত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিকসের উত্থান সেই প্রশ্নাতীত ব্যবস্থায় প্রথম কাঠামোগত ফাটল ধরিয়েছে। রবার্ট গিলপিনের মতে, হেজিমনিক স্থিতিশীলতা কখনো একদিনে আসে না।

ব্রিকস এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইবহবাড়ষবহঃ ঐবমবসড়হ হতে পারেনি বরং জড়নবৎঃ শবড়যধহব-এর ভাষায় তারা অভঃবৎ ঐবমবসড়হু পরিস্থিতি তৈরি করছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দেয়নি কিন্তু তার একচেটিয়া ক্ষমতাকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষয় করে দিয়েছে। তাই ব্রিকসের উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, এটি হেজিমনিক রাষ্ট্র হিসেবে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ইতিহাস।

ব্রিকস প্রথম ১৬ জুন ২০০৯ সালে ৫ সদস্য ইংরেজি নামে প্রথম অক্ষর নিয়ে ১৭ বছর আগে গঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চায়না (২০০৯)। পরবর্তীতে ২০১০ সালে সাউথ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর ২০১১ সালে ব্রিক নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ব্রিকস। ব্রিকসের শক্তি এখন আর পাঁচ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়া যোগ দেওয়ার পর এটি এখন এগারো দেশের এক বিশাল জোট, যার সঙ্গে নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মতো আরও দশটি দেশ পার্টনার হিসেবে যুক্ত।

এই বিস্তৃত জোট এখন বিশ্বের প্রায় আটচল্লিশ শতাংশ জনসংখ্যা এবং ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে বিশ্বের চল্লিশ শতাংশ অর্থনীতির প্রতিনিধিত্ব করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিকসের গড় প্রবৃদ্ধি যেখানে তিন দশমিক আট শতাংশ, সেখানে জি সাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র এক শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির গতিতে ব্রিকস জি সাতের চেয়ে তিনগুণ এগিয়ে।

শুধু তাই নয়, বিশ্বের প্রায় তেতাল্লিশ শতাংশ তেল, বাহাত্তর শতাংশ রেয়ার আর্থ এবং বিয়াল্লিশ শতাংশ গম এখন এই জোটের নিয়ন্ত্রণে। এই বাস্তবতাই শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দিচ্ছে। এই ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের মাধ্যমে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় সফট ব্যালান্সিং বলা হয়।

বাস্তববাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন হেজিমনিক রাষ্ট্র তার ক্ষমতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই ভারসাম্য তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন রাশিয়ার তিনশ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ জব্দ করে, তখন উন্নয়নশীল বিশ্ব বুঝে যায় ডলারভিত্তিক ব্যবস্থা আর নিরাপদ নয়। এই আস্থার সংকট থেকেই ব্রিকস ডলারের বিকল্প তৈরি করতে শুরু করে।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আইএমএফের তথ্য বলছে, বিশ্ব রিজার্ভে ডলারের হিস্যা ছাপ্পান্ন দশমিক নয় দুই শতাংশে নেমে এসেছে, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বনি¤œ। একই সঙ্গে ব্রিকসের ভেতরে সাতষট্টি শতাংশ বাণিজ্য এখন নিজস্ব মুদ্রায় হচ্ছে। তারা সুইফটের বিকল্প হিসেবে ব্রিকস পে এবং এমব্রিজ চালু করেছে, আইএমএফের বিকল্প হিসেবে ঘবি উবাবষড়ঢ়সবহঃ ইধহশ এবং ঈড়হঃরহমবহঃ জবংবৎাব অৎৎধহমবসবহঃ তৈরি করেছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আঠারোতম ব্রিকস সম্মেলনে এই পেমেন্ট সিস্টেমগুলোকে কার্যকর করার রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি আক্রমণ না করে, তার তৈরি করা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখছে। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনি শেষ হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিকভাবে অপ্রতিরোধ্য এবং ডলার এখনো বিশ্ব লেনদেনের আটাশি শতাংশে ব্যবহৃত হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ২০২৬ সালের অক্টোবরে যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের ইচ্ছায় একা হয়ে যাচ্ছে, সে একটি খড়হবষরবৎ চড়বিৎ হয়ে যাচ্ছে। ব্রিকস সেই একাকিত্বের সুযোগ নিচ্ছে। তাই চূড়ান্ত বিচারে বলা যায়, ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনির অবসান ঘটায়নি, বরং এর একচেটিয়া বৈধতাকে ভেঙে দিয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর টহরঢ়ড়ষধৎ নয়, এটি গঁষঃরঢ়ড়ষধৎ হওয়ার পথে, যেখানে শক্তির ভারসাম্য এখন আর একজন ঠিক করে না, বরং দর-কষাকষির মাধ্যমে বজায় রাখা হয়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

চার মহাদেশের নির্বাচন ও বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের সংকট

বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের উত্থান: বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য

Update Time : 01:57:08 am, Wednesday, 28 October 2026

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করলে হেজিমনি ধারণাটি সামনে আসে। সহজ ভাষায়, যে শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার করে, তাকে হেজিমন বলা হয়।

একটি রাষ্ট্র তখনই হেজিমনিক বা পরাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে উত্থাপিত হয়, যখন ওই দেশে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ইত্যাদি দিক হতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি পরাশক্তিধর রাষ্ট্র, কারণ যুক্তরাষ্ট্র হেজিমনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার সবগুলো শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। যখনই কোনো একটি রাষ্ট্র পরাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে উত্থাপিত হয়, তখনই বিপরীত/শত্রু রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ওই রাষ্ট্রের থ্রেট হিসেবে মনে করে।

ঠিক তখনই বিপরীত/শত্রু রাষ্ট্রগুলো তাদের দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক দিয়ে নিজেদের শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যালেন্স অফ পাওয়ার বা শক্তির ভারসাম্য বিষয়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিক পরিচিতি পেলেও বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাস্তববাদীদের মতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নৈরাজ্যময়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়Ñ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে নিয়ে। আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র নয়, কিন্তু সে ঞযৎবংযড়ষফ হঁপষবধৎ বা দ্বারপ্রান্তের রাষ্ট্র। তাই ইরান যদি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয় সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দমিয়ে রাখার জন্য নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে তার মধ্যে অন্যতম হলোÑ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক চাপ।

নিষেধাজ্ঞা যখন ইরানকে থামাতে পারেনি তখন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঙঢ়বৎধঃরড়হ ঊঢ়রপ ঋঁৎু শুরু হয়। বর্তমানে অক্টোবর ২০২৬ এ যুদ্ধ এক অচল অবস্থায় আছে। এটাই শক্তির ভারসাম্যের বাস্তব উদাহরণ। বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বলতে আমরা গত ৮০ বছর ধরে একটি মাত্র বাস্তবতাকে বুঝে এসেছি, তা হলোÑ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একমেরু ব্যবস্থা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে ডলারকে ‘বিশ্ব মুদ্রা’ আই এম এফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক বানিয়ে যে হেজিমনিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল তা এতদিন প্রশ্নাতীত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিকসের উত্থান সেই প্রশ্নাতীত ব্যবস্থায় প্রথম কাঠামোগত ফাটল ধরিয়েছে। রবার্ট গিলপিনের মতে, হেজিমনিক স্থিতিশীলতা কখনো একদিনে আসে না।

ব্রিকস এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইবহবাড়ষবহঃ ঐবমবসড়হ হতে পারেনি বরং জড়নবৎঃ শবড়যধহব-এর ভাষায় তারা অভঃবৎ ঐবমবসড়হু পরিস্থিতি তৈরি করছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দেয়নি কিন্তু তার একচেটিয়া ক্ষমতাকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষয় করে দিয়েছে। তাই ব্রিকসের উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, এটি হেজিমনিক রাষ্ট্র হিসেবে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ইতিহাস।

ব্রিকস প্রথম ১৬ জুন ২০০৯ সালে ৫ সদস্য ইংরেজি নামে প্রথম অক্ষর নিয়ে ১৭ বছর আগে গঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চায়না (২০০৯)। পরবর্তীতে ২০১০ সালে সাউথ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর ২০১১ সালে ব্রিক নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ব্রিকস। ব্রিকসের শক্তি এখন আর পাঁচ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়া যোগ দেওয়ার পর এটি এখন এগারো দেশের এক বিশাল জোট, যার সঙ্গে নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মতো আরও দশটি দেশ পার্টনার হিসেবে যুক্ত।

এই বিস্তৃত জোট এখন বিশ্বের প্রায় আটচল্লিশ শতাংশ জনসংখ্যা এবং ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে বিশ্বের চল্লিশ শতাংশ অর্থনীতির প্রতিনিধিত্ব করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিকসের গড় প্রবৃদ্ধি যেখানে তিন দশমিক আট শতাংশ, সেখানে জি সাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র এক শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির গতিতে ব্রিকস জি সাতের চেয়ে তিনগুণ এগিয়ে।

শুধু তাই নয়, বিশ্বের প্রায় তেতাল্লিশ শতাংশ তেল, বাহাত্তর শতাংশ রেয়ার আর্থ এবং বিয়াল্লিশ শতাংশ গম এখন এই জোটের নিয়ন্ত্রণে। এই বাস্তবতাই শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দিচ্ছে। এই ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের মাধ্যমে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় সফট ব্যালান্সিং বলা হয়।

বাস্তববাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন হেজিমনিক রাষ্ট্র তার ক্ষমতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই ভারসাম্য তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন রাশিয়ার তিনশ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ জব্দ করে, তখন উন্নয়নশীল বিশ্ব বুঝে যায় ডলারভিত্তিক ব্যবস্থা আর নিরাপদ নয়। এই আস্থার সংকট থেকেই ব্রিকস ডলারের বিকল্প তৈরি করতে শুরু করে।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আইএমএফের তথ্য বলছে, বিশ্ব রিজার্ভে ডলারের হিস্যা ছাপ্পান্ন দশমিক নয় দুই শতাংশে নেমে এসেছে, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বনি¤œ। একই সঙ্গে ব্রিকসের ভেতরে সাতষট্টি শতাংশ বাণিজ্য এখন নিজস্ব মুদ্রায় হচ্ছে। তারা সুইফটের বিকল্প হিসেবে ব্রিকস পে এবং এমব্রিজ চালু করেছে, আইএমএফের বিকল্প হিসেবে ঘবি উবাবষড়ঢ়সবহঃ ইধহশ এবং ঈড়হঃরহমবহঃ জবংবৎাব অৎৎধহমবসবহঃ তৈরি করেছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আঠারোতম ব্রিকস সম্মেলনে এই পেমেন্ট সিস্টেমগুলোকে কার্যকর করার রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি আক্রমণ না করে, তার তৈরি করা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখছে। তবে এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনি শেষ হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিকভাবে অপ্রতিরোধ্য এবং ডলার এখনো বিশ্ব লেনদেনের আটাশি শতাংশে ব্যবহৃত হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ২০২৬ সালের অক্টোবরে যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের ইচ্ছায় একা হয়ে যাচ্ছে, সে একটি খড়হবষরবৎ চড়বিৎ হয়ে যাচ্ছে। ব্রিকস সেই একাকিত্বের সুযোগ নিচ্ছে। তাই চূড়ান্ত বিচারে বলা যায়, ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনির অবসান ঘটায়নি, বরং এর একচেটিয়া বৈধতাকে ভেঙে দিয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর টহরঢ়ড়ষধৎ নয়, এটি গঁষঃরঢ়ড়ষধৎ হওয়ার পথে, যেখানে শক্তির ভারসাম্য এখন আর একজন ঠিক করে না, বরং দর-কষাকষির মাধ্যমে বজায় রাখা হয়।