বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চার মহাদেশের চারটি নির্বাচন। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম ভাগের মধ্যে ব্রাজিল, সার্বিয়া, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করতে পারে শুধু এসব দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধের গতিপথ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিও।
এসব নির্বাচনে গণতন্ত্রপন্থি শক্তির উত্থান ঘটবে, নাকি কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির প্রভাব আরও বাড়বেÑ তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। বিশ্লেষকদের মতে, চার দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলাদা হলেও তাদের মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র। ডানপন্থি রাজনীতির বিস্তার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতÑ সবকিছুই নির্বাচনি আলোচনায় প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ভোটে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ : বিশ্বের নজর সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বাচনের দিকে। দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের নির্বাচন মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। ইসরায়েলে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। গাজা যুদ্ধ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়েও তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ক্ষমতাসীনদের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তবে কোনো পক্ষই পার্লামেন্টের ১২০ আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ফলে নির্বাচনের পর জোট গঠন নিয়ে দীর্ঘ দর-কষাকষি এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে। ইরান যুদ্ধ ও অর্থনীতির চাপ : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বাচনের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘœ এবং বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নির্বাচনি প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যনীতির অনিশ্চয়তা নিয়ে অসন্তোষ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সামরিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের নীতিতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে ইরান, গাজা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে কতটা পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরীক্ষা : ইউরোপের সার্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচের দীর্ঘ শাসন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল করার অভিযোগ রয়েছে। দুই বছর আগে নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ব্রাজিলে ডানপন্থা বনাম লুলার রাজনীতি : দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলেও নির্বাচনের ফল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ডানপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো এবং প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার রাজনৈতিক অবস্থান দেশটির ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফ্লাভিও বলসোনারো সংবিধান পরিবর্তন, তার বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলায় ক্ষমা এবং আমাজন বনাঞ্চল রক্ষার বিধি-নিষেধ শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে : চার দেশের নির্বাচনের মধ্যে আরেকটি অভিন্ন বিষয় হলো রাজনৈতিক মেরুকরণ ও তথ্যপ্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নির্বাচনি পরিবেশকে জটিল করে তুলছে। সুইডেনভিত্তিক ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মাত্রা কয়েক দশক আগের অবস্থায় নেমে এসেছে।
সব মিলিয়ে, চার দেশের নির্বাচনের ফল শুধু ক্ষমতার পালাবদল নির্ধারণ করবে না; বরং যুদ্ধ, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক জোট এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। তাই এসব নির্বাচনের দিকে নজর রাখছে গোটা বিশ্ব।





















