আজ বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫৮%

রেলওয়ের টিকিটিংয়ে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ: পাঁচ বছরেও ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ

  • MIT ERP
  • Update Time : 01:13:57 am, Tuesday, 27 October 2026
  • 26

রেলওয়ের টিকিটিংয়ে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ: পাঁচ বছরেও ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থাপনায় চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে লিড পার্টনার সহজ ডটকমের বিরুদ্ধে। শাস্তি হিসেবে চুক্তি বাতিলসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গত পাঁচ বছরেও তা নেওয়া হয়নি, বরং ব্যাকডোর কালোবাজারিসহ ১৯টি অপকর্মের সুযোগ করে দেওয়ার তথ্য মিলেছে।

চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করায় প্রায় দুই বছর আগে সহজ ডটকমকে জরিমানা করা হয় ১ কোটি ৩ লাখ টাকা। সেটি মওকুফের আবেদন করায় ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ‘সহজ-সিনসিস-ভিনসেন জেভি’র বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করা হয়। সূত্র জানায়, ‘পিপিয়ার-২০২৫’-এর গাইডলাইন অনুসারে চুক্তিভঙ্গ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এমন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আগামী ডিসেম্বরে টেন্ডারে অংশ নিতে যাচ্ছে সহজ ডটকম।

চুক্তি মোতাবেক, টেন্ডারে উল্লিখিত শর্তানুসারে কোনো শর্তপূরণ না হলে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। সে হিসাবে প্রায় ৫ কোটি টাকা জরিমানা হয়; কিন্তু রেলওয়ে সব ছাড় দিতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, আশঙ্কা রয়েছে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পাওনা নির্ধারণ, জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া এবং ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত পর্যালোচনা না করলে সরকারি অর্থ আদায় আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, আগামী ফেব্রুয়ারিতে চুক্তি শেষের আগেই নতুন টেন্ডারের প্রস্তুতি চলছে। তবে ডিজাস্টার রিকভারি সার্ভার স্থাপন নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য মিলেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, টিকিটিং ব্যবস্থা নির্ধারিত সময়ে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হলে দৈনিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইন প্রয়োগের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৫ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিলব্যাপী প্রায় ১৫ ঘণ্টা টিকিটিং ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। এ ঘটনায় ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা জরিমানা আদায়ের জন্য রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দিয়েছিল জোনাল অফিস। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই অর্থ আদায় হয়নি। পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আইটি অডিটে উঠে এসেছে, রেলের ই-টিকিটিং ব্যবস্থার বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছেন ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমের কর্মীরা।

সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট উন্মুক্ত হওয়ার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই তা ব্লক করার সুযোগ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। চুক্তি অনুযায়ী, সহজের কর্মীদের দায়িত্ব ছিল হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ। টিকিট বিক্রি, আসন সংরক্ষণ, কোটা সমন্বয় কিংবা টিকিট ব্লক ও রিলিজের মতো কার্যক্রমে তাদের সরাসরি যুক্ত থাকার কথা ছিল না। অডিটে উঠে আসা এসব তথ্যের পর টিকিটিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন এবং সম্ভাব্য অনিয়মের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনলাইনে ট্রেনের টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার জন্য সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তির ৮ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, ১৮ মাসের মধ্যে— অর্থাৎ ২০২৩ সালের ১৪ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্টিগ্রেটেড টিকিটিং সিস্টেমের (বিআরআইটিএস) সব কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ বা কাজের অংশবিশেষ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে দৈনিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানা আরোপের বিধান রাখা হয়।

পরবর্তী সময়ে চুক্তি বাতিলের ব্যবস্থাও ছিল। রিকভারি সার্ভার নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য : গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো, ডিজাস্টার রিকভারি সার্ভার সরবরাহ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য দেওয়া। চুক্তির কাজের অগ্রগতি জানতে ২০২৩ সালের ১১ মে রেলওয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দেয়। চুক্তি অনুযায়ী কোন কোন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনগুলো বাকি রয়েছে, তা জানতে চাওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি জবাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন ও সরবরাহের তথ্য তুলে ধরে।

তবে ডিজাস্টার রিকভারি সার্ভার ২০২২ সালের নভেম্বরেই সরবরাহ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে সহজ ডটকম। পরবর্তী সময়ে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আইটি অডিটে সার্ভারটি সরবরাহ না হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। অডিট আপত্তির জবাবে প্রতিষ্ঠানটি পরে সার্ভার সরবরাহ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ একদিকে আগেই সার্ভার সরবরাহের দাবি, অন্যদিকে অডিট আপত্তির পর তা আবার সরবরাহের কথা জানানো, এই দুই বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি রয়েছে।

১৬৯ অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ : রেলের টিকিটিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আইটি অডিটেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত কার্যক্রম পর্যালোচনা করে পরিচালিত অডিটে বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট সহজ ডটকমের কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার তথ্য মিলেছে।

অডিটের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ই-টিকিটিং ড্যাশবোর্ডে ছয়টি সক্রিয় ব্যবহারকারীর তালিকা সহজ ডটকমের নিয়ন্ত্রণে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। সিলেট স্টেশনে দায়িত্বরত ভেন্ডর প্রতিনিধির অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড থেকে দেশের বিভিন্ন রুটের টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই ব্লক করার সুযোগ থাকার বিষয়টিও শনাক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যর্থ হয়েও নতুন দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা : সহজের সঙ্গে রেলওয়ের বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি। অথচ চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ, জরিমানা অনাদায় এবং রিকভারি সার্ভার নিয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি না করেই প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও টিকিটিং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছেন রেলওয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সূত্রটির দাবি, নতুন করে টিকিটিং ব্যবস্থাপনার দরপত্রের প্রস্তুতিও চলছে।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জরিমানা আদায়, চুক্তি বাতিল কিংবা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে নতুন দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জরিমানা, ব্যাংক গ্যারান্টি ও সরকারি অর্থের নিরাপত্তা : অনলাইনে টিকিট বিক্রির পাঁচ দিনের অর্থের প্রায় ২০ কোটি টাকা সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির কাছে থাকে।

বিপরীতে রেলওয়ের কাছে প্রতিষ্ঠানটির জামানত হিসেবে রয়েছে ৫০ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি। এ অবস্থায় জরিমানার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছালে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পাওনা আদায় কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জরিমানার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি আদালতে গেলে এবং একই সময়ে পরবর্তী টিকিটিং ব্যবস্থাপনার দরপত্রে অংশ নিতে চাইলে রেলওয়ে কীভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করবে, সেটিও নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পাওনা নির্ধারণ, জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া এবং ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত পর্যালোচনা না করলে সরকারি অর্থ আদায় আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫ (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষের অবস্থান স্পষ্ট করা দরকার।

এ বিষয়ে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ রূপালী বাংলাদেশকে, ‘রেলের ই-টিকেটিং নিয়ে ১৯টি আপত্তির বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ১১ অক্টোবর লিড পার্টনার সহজ ডটকমকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত জবাব আসেনি। জরিমানা করা বাবদ ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা মওকুফ চেয়ে তারা একটি আবেদন করেছে। আবেদনের পরিপেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পেলে সেই সুপারিশ অনুসারে ব্যবস্থা। আমার চাই বেশিসংখ্যক কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নিক, তাই আগাম কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে ডিসেম্বর মাসে টেন্ডার আহ্বানের লক্ষ্য নিয়ে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

চার মহাদেশের নির্বাচন ও বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের সংকট

রেলওয়ের টিকিটিংয়ে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ: পাঁচ বছরেও ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ

Update Time : 01:13:57 am, Tuesday, 27 October 2026

রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থাপনায় চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে লিড পার্টনার সহজ ডটকমের বিরুদ্ধে। শাস্তি হিসেবে চুক্তি বাতিলসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গত পাঁচ বছরেও তা নেওয়া হয়নি, বরং ব্যাকডোর কালোবাজারিসহ ১৯টি অপকর্মের সুযোগ করে দেওয়ার তথ্য মিলেছে।

চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করায় প্রায় দুই বছর আগে সহজ ডটকমকে জরিমানা করা হয় ১ কোটি ৩ লাখ টাকা। সেটি মওকুফের আবেদন করায় ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ‘সহজ-সিনসিস-ভিনসেন জেভি’র বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করা হয়। সূত্র জানায়, ‘পিপিয়ার-২০২৫’-এর গাইডলাইন অনুসারে চুক্তিভঙ্গ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এমন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আগামী ডিসেম্বরে টেন্ডারে অংশ নিতে যাচ্ছে সহজ ডটকম।

চুক্তি মোতাবেক, টেন্ডারে উল্লিখিত শর্তানুসারে কোনো শর্তপূরণ না হলে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। সে হিসাবে প্রায় ৫ কোটি টাকা জরিমানা হয়; কিন্তু রেলওয়ে সব ছাড় দিতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, আশঙ্কা রয়েছে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পাওনা নির্ধারণ, জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া এবং ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত পর্যালোচনা না করলে সরকারি অর্থ আদায় আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, আগামী ফেব্রুয়ারিতে চুক্তি শেষের আগেই নতুন টেন্ডারের প্রস্তুতি চলছে। তবে ডিজাস্টার রিকভারি সার্ভার স্থাপন নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য মিলেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, টিকিটিং ব্যবস্থা নির্ধারিত সময়ে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হলে দৈনিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইন প্রয়োগের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

২০২৫ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিলব্যাপী প্রায় ১৫ ঘণ্টা টিকিটিং ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। এ ঘটনায় ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা জরিমানা আদায়ের জন্য রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কাছে চিঠি দিয়েছিল জোনাল অফিস। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই অর্থ আদায় হয়নি। পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আইটি অডিটে উঠে এসেছে, রেলের ই-টিকিটিং ব্যবস্থার বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছেন ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমের কর্মীরা।

সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট উন্মুক্ত হওয়ার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই তা ব্লক করার সুযোগ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। চুক্তি অনুযায়ী, সহজের কর্মীদের দায়িত্ব ছিল হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ। টিকিট বিক্রি, আসন সংরক্ষণ, কোটা সমন্বয় কিংবা টিকিট ব্লক ও রিলিজের মতো কার্যক্রমে তাদের সরাসরি যুক্ত থাকার কথা ছিল না। অডিটে উঠে আসা এসব তথ্যের পর টিকিটিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন এবং সম্ভাব্য অনিয়মের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনলাইনে ট্রেনের টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার জন্য সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তির ৮ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, ১৮ মাসের মধ্যে— অর্থাৎ ২০২৩ সালের ১৪ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্টিগ্রেটেড টিকিটিং সিস্টেমের (বিআরআইটিএস) সব কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ বা কাজের অংশবিশেষ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে দৈনিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানা আরোপের বিধান রাখা হয়।

পরবর্তী সময়ে চুক্তি বাতিলের ব্যবস্থাও ছিল। রিকভারি সার্ভার নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য : গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো, ডিজাস্টার রিকভারি সার্ভার সরবরাহ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য দেওয়া। চুক্তির কাজের অগ্রগতি জানতে ২০২৩ সালের ১১ মে রেলওয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দেয়। চুক্তি অনুযায়ী কোন কোন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনগুলো বাকি রয়েছে, তা জানতে চাওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি জবাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন ও সরবরাহের তথ্য তুলে ধরে।

তবে ডিজাস্টার রিকভারি সার্ভার ২০২২ সালের নভেম্বরেই সরবরাহ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে সহজ ডটকম। পরবর্তী সময়ে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আইটি অডিটে সার্ভারটি সরবরাহ না হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। অডিট আপত্তির জবাবে প্রতিষ্ঠানটি পরে সার্ভার সরবরাহ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ একদিকে আগেই সার্ভার সরবরাহের দাবি, অন্যদিকে অডিট আপত্তির পর তা আবার সরবরাহের কথা জানানো, এই দুই বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি রয়েছে।

১৬৯ অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ : রেলের টিকিটিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের আইটি অডিটেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত কার্যক্রম পর্যালোচনা করে পরিচালিত অডিটে বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট সহজ ডটকমের কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার তথ্য মিলেছে।

অডিটের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ই-টিকিটিং ড্যাশবোর্ডে ছয়টি সক্রিয় ব্যবহারকারীর তালিকা সহজ ডটকমের নিয়ন্ত্রণে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। সিলেট স্টেশনে দায়িত্বরত ভেন্ডর প্রতিনিধির অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড থেকে দেশের বিভিন্ন রুটের টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই ব্লক করার সুযোগ থাকার বিষয়টিও শনাক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যর্থ হয়েও নতুন দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা : সহজের সঙ্গে রেলওয়ের বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি। অথচ চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ, জরিমানা অনাদায় এবং রিকভারি সার্ভার নিয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি না করেই প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও টিকিটিং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছেন রেলওয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সূত্রটির দাবি, নতুন করে টিকিটিং ব্যবস্থাপনার দরপত্রের প্রস্তুতিও চলছে।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জরিমানা আদায়, চুক্তি বাতিল কিংবা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে নতুন দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জরিমানা, ব্যাংক গ্যারান্টি ও সরকারি অর্থের নিরাপত্তা : অনলাইনে টিকিট বিক্রির পাঁচ দিনের অর্থের প্রায় ২০ কোটি টাকা সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির কাছে থাকে।

বিপরীতে রেলওয়ের কাছে প্রতিষ্ঠানটির জামানত হিসেবে রয়েছে ৫০ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি। এ অবস্থায় জরিমানার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছালে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পাওনা আদায় কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জরিমানার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি আদালতে গেলে এবং একই সময়ে পরবর্তী টিকিটিং ব্যবস্থাপনার দরপত্রে অংশ নিতে চাইলে রেলওয়ে কীভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করবে, সেটিও নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পাওনা নির্ধারণ, জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া এবং ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত পর্যালোচনা না করলে সরকারি অর্থ আদায় আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫ (পিপিআর-২০২৫) অনুযায়ী প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষের অবস্থান স্পষ্ট করা দরকার।

এ বিষয়ে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ রূপালী বাংলাদেশকে, ‘রেলের ই-টিকেটিং নিয়ে ১৯টি আপত্তির বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ১১ অক্টোবর লিড পার্টনার সহজ ডটকমকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত জবাব আসেনি। জরিমানা করা বাবদ ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা মওকুফ চেয়ে তারা একটি আবেদন করেছে। আবেদনের পরিপেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পেলে সেই সুপারিশ অনুসারে ব্যবস্থা। আমার চাই বেশিসংখ্যক কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নিক, তাই আগাম কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে ডিসেম্বর মাসে টেন্ডার আহ্বানের লক্ষ্য নিয়ে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।