বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে ৩৪টি লটের রি-টেন্ডারে বা পুনঃদরপত্রে প্রেস মালিকদের মধ্যে অবাধ প্রতিযোগিতা হয়েছে। এতে উল্লেখিত লটের বই ছাপাতে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি), যা ৩৪টি লটের এনসিটিবির প্রাক্কলিত মোট টাকার প্রায় ১৪ শতাংশ।
এর ফলে ইতিপূর্বে ৭২১টি লটে সমঝোতার দরে একক অথবা দ্বিতীয় ডামি দরপত্র দিয়ে প্রেসগুলোর ২৫০ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে। এনসটিবি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিযোগিতার কারণে রি-টেন্ডারে ৩৪টি লটে যেখানে সাড়ে ৯ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে, সেখানে আগের ৭২১টি লটে প্রেসগুলোর মধ্যে সমঝোতার সিন্ডিকেট না হলে এনসিটিবির প্রাক্কলিত মোট টাকার ১৪ শতাংশ বা ২৬৬ কোটি টাকা কম ব্যয়ে প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর কাজ করা যেত।
জানা গেছে, আগের টেন্ডারের দর ফাঁস হওয়ায় প্রাক্কলিত দরের খুব কাছাকাছি (প্রায় ১ শতাংশেরও কম) দর দিয়ে কাজ নিয়েছে প্রেসগুলো। রি-টেন্ডারের ৩৪ লটে সাশ্রয় সাড়ে ৯ কোটি টাকা : ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ৭৫৫টি লটে ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপানো হচ্ছে ২৩৪ লটে, আর ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানো হচ্ছে ৫২১ লটে।
প্রথা অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ৭২১টি লটের কাজ শুরু করে প্রেসগুলো। বাকি ৩৪ লটে সর্বনিম্ন দর দিয়ে এককভাবে দরদাতা হিসেবে কাজ পাওয়ার সুযোগ ছিল প্রেসগুলোর। কিন্তু এনসিটিবির চাহিদামত প্রেসগুলোর প্রয়োজনীয় সঠিক ডকুমেন্টস সরবরাহ করতে না পারা, কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সর্বোপরি বিকল্প আবেদনকারি না থাকায় এই দরপত্রগুলো বাতিল হয়ে যায়।
ফলে এসব লটের রি-টেন্ডার করতে হয়। সূত্র জানায়, ৩৪টি লটের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একক দরদাতা (সিংগেল বিডার) হওয়ায় এনসিটিবির হাতে বিকল্প অন্য কাউকে কাজ দেওয়ার পরিস্থিতি ছিল না। সূত্র মতে, এবার প্রেসগুলো নিজেদের মধ্যে দর নিয়ে সমঝোতা করে দরপত্র জমা দিয়েছে। এতে অনেক লটে দরদাতা ছিল একজনই। ফলে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ পেয়েছে প্রেসগুলো।
তবে সমঝোতার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনেক প্রেস কাজ পায়নি। ফলে রি-টেন্ডার হওয়া ৩৪টি লটের ক্ষেত্রে প্রেসগুলো স্বাধীনভাবে দরপত্র জমা দিয়েছে। সূত্র জানায়, আগে যেখানে প্রতিটি লটের জন্য ১০ থেকে ৩০টি টেন্ডার (দরপত্র) ডকুমেন্টস বিক্রি হলেও জমা পড়েছে মাত্র ১টি বা কোন ক্ষেত্রে ২টি বা ৩টি, পুনঃদরপত্রের ক্ষেত্রে দরপত্র জমা পড়েছে ১৮ থেকে ৩৩টি।
ফলে কাজ পাওয়ার জন্য প্রেসগুলোর মধ্যে অবাধ প্রতিযোগিতা হয়েছে, দরও প্রত্যেকে দিয়েছে নিজেদের হিসাব অনুযায়ী। সূত্র একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘যেমন টেন্ডারে কোনো লটে একটি প্রেস দিয়েছে ৯৯ টাকা, ওই লটে আরেক দরদাতা দিয়েছে ১২০ টাকা, স্বাভাবিকভাবেই ৯৯ টাকার দরদাতা কাজ পেয়েছে। কিন্তু ৩৪ লটের ক্ষেত্রে এমন হয়নি। প্রেসগুলো নিজেদের হিসাব অনুযায়ী দর দিয়েছে।
প্রতিযোগিতা হওয়ায় দর কমেছে। সাশ্রয় হয়েছে এনসিটিবির। ’ রি-টেন্ডারে ইবতেদায়ির (প্রথম-পঞ্চম) ১টি, ষষ্ঠ শ্রেণির ৫টি, সপ্তম শ্রেণির ৬টি, অষ্টম শ্রেণির ২টি ও নবম শ্রেণির ২০টিসহ মোট ৩৪টি পুনঃদরপত্রের মূল্যায়ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এনসিটিবির প্রাক্কলিত দর থেকে সর্বনিম্ন ৪ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ পর্যন্ত কম দর দিয়ে দরপত্র উদ্ধৃত করা হয়েছে।
৩৪টি পুনঃদরপত্রের মোট দাপ্তরিক প্রাক্কলিত দর ছিল ৬৭ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৮ টাকা। অন্যদিকে কাজের সুপারিশ পাওয়া মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানসমূহের মোট উদ্ধৃত দর ছিল ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৬ টাকা। এই ৩৪ লটে এনসিটিবির সাশ্রয় হয়েছে ৯ কোটি ৩৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকা বা ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ৭২১ লটে অতিরিক্ত ব্যয় ২৬৬ কোটি টাকা : সূত্রমতে, প্রতিযোগিতাপূর্ণ দরপত্রের কারণে ৩৪ লটে প্রাক্কলিত মোট টাকার প্রায় ১৪ শতাংশ সাশ্রয় হয়।
এই হিসাবকে ভিত্তি ধরলে সমঝোতার দরে ৭২১ লটে এনসিটিবির অতিরিক্ত ব্যয় ২৬৬ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে বই ছাপায় অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি তদন্ত করতে সম্প্রতি এনসটিবিতে অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়ে গেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এনসিটিবির নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম-পঞ্চম শ্রেণির ৮টি, ষষ্ঠ শ্রেণির ১২টি, সপ্তম শ্রেণির ১০টি, অষ্টম শ্রেণির ৪টি ও নবম-দশম শ্রেণির ১১টিসহ মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে একক দরপত্র জমা পড়েছে ৩০টি বা ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ, দুটি করে দরপত্র জমা পড়েছে ১৩টি বা ২৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং তিনটি করে দরপত্র জমা পড়েছে দুটি বা ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
প্রথম-পঞ্চম শ্রেণিতে দরপত্র বিক্রি হয়েছে সর্বনিম্ন ১৬টি ও সর্বোচ্চ ২৪টি, ষষ্ঠ শ্রেণিতে দরপত্র বিক্রি হয়েছে সর্বনিম্ন ৯টি ও সর্বোচ্চ ১৯টি, সপ্তম শ্রেণিতে দরপত্র বিক্রি হয়েছে সর্বনিম্ন ৯টি ও সর্বোচ্চ ১৭টি, অষ্টম শ্রেণিতে দরপত্র বিক্রি হয়েছে সর্বনিম্ন ১টি ও সর্বোচ্চ ৬টি এবং নবম-দশম শ্রেণিতে দরপত্র বিক্রি হয়েছে সর্বনিম্ন ১টি ও সর্বোচ্চ ৮টি।
প্রথম-পঞ্চম শ্রেণির ৩৪১ নং লটে ২৪টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ২টি, ৩৫৯ নং লটে ২২টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ২টি, ৩৮৮ নং লটে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি। ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৫২ নং লটে ১৯টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি, ৬২১ নং লটে ১৮টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি, ৬৩৪ নং লটে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি।
সপ্তম শ্রেণির ৭১০ নং লটে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি, ৭১৪, ৭৩০, ৭৭১ নং লটে ১৪টি করে দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি করে, ৭৬৬ নং লটে ১৩টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি। অষ্টম শ্রেণির ৮৮০ নং লটে ৬টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ২টি, ৮৮১ নং লটে ৪টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি, ৮৬১ নং লটে ২টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি, ৮২৭ নং লটে ১টি দরপত্র বিক্রি হয়েছে ও জমা পড়েছে ১টি।
নবম-দশম শ্রেণির ১০৩০ নং লটে ৮টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি, ৯৫৯ নং লটে ৫টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে ১টি, ৯৩৯, ১০০৯, ১১১৩, ১১২৮ নং লটে ১টি করে দরপত্র বিক্রি হয়েছে ও জমা পড়েছে ১টি করে। দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের ফর্মাপ্রতি গড় মুদ্রণমূল্যও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকে যেখানে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ৩ দশমিক ৪৪ টাকা বা প্রতি রিম ৩ হাজার ৪৪০ (১০০০ ফর্মায় ১ রিম) সেখানে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রতি ফর্মায় দর বেড়েছে ৩ দশমিক ৫৪ টাকা বা প্রতি রিম ৩ হাজার ৫৪০ টাকা।
গত বছরের তুলনায় এ বছর দর বেড়েছে শূন্য দশমিক ১০ টাকা। অন্যদিকে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ২ দশমিক ৩১ টাকা বা প্রতি রিম ২ হাজার ৩১০ টাকা, সেখানে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ফর্মাপ্রতি গড় দর বেড়েছে ৩ দশমিক ৩২ টাকা বা প্রতি রিম ৩ হাজার ৩২০ টাকা। অর্থাৎ, মাধ্যমিকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ফর্মাপ্রতি দর বেড়েছে ১ দশমিক ০১ টাকা।
এসব তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ বিতরণের ক্ষেত্রে অবাধ প্রতিযোগিতা হয়নি এবং একে অপরের সঙ্গে যোগসাজশ করে দরপত্র দাখিল করেছে বলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। ফলে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ) ২০০৬-এর শুরুতে বলা হয় ‘সরকারি তহবিলের অর্থ দ্বারা কোনো পণ্য, কার্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে (স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অর্থের সর্বত্তোম মূল্য, দক্ষতা, নৈতিকতা, গুণগতমান ও টেকসই ক্রয়) নিশ্চিত করা’ প্রতিফলিত হয়নি।
দরপত্রে প্রতিযোগিতা না হওয়ায় এসব লটের বই ছাপাতে প্রায় ২৬৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে এনসিটিবিকে। যা বলছেন অংশীজনেরা : পুনঃদরপত্রে বই ছাপার খরচ কম হওয়ার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রেস মালিকেরা জানিয়েছেন, আগের টেন্ডারের সঙ্গে রি-টেন্ডারের দরের বিষয়টি এক করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে তারা বলেন, টেন্ডারের সময় প্রেস মালিকদের ইনভেস্টমেন্ট ছয়-সাত মাস ধরে আটকে থাকে, অন্যদিকে রি-টেন্ডারে পুরো কাজ শেষ করতে সময় লাগে ১৫ থেকে এক মাসের মধ্যে।
ফলে ইনভেস্টমেন্ট দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে ব্যাংক লোনের সুদও বাড়ে। এ ছাড়া টেন্ডারের কাজ করার পর অনেক প্রেস কাজের অভাবে বসে থাকে, তাই প্রেসগুলো চিন্তা করে দর কিছুটা কম দিয়ে হলেও কাজ নিতে হবে। তবে এমন যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, টেন্ডারে দর সমঝোতার বিষয়টি পরিষ্কার। ১৭টি টেন্ডার ডকুমেন্টস কিনে যদি সিংগেল টেন্ডার হয়, তাহলে প্রতিযোগিতা বলতে কিছুই থাকে না।
অন্যদিকে রি-টেন্ডারে প্রেসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হওয়ায় দর কম পড়েছে, সাশ্রয় হয়েছে এনসিটিবির। টেন্ডারে যদি এমন প্রতিযোগিতা হতো, স্বাভাবিকভাবেই অনেক টাকা সাশ্রয় হতো এনসিটিবির। এ বিষয়ে এনসটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, ‘টেন্ডারের দরের চেয়ে রি-টেন্ডারে দর বরাবরই কম হয়। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও একই ধারা ছিল।
’ যেসব প্রেস তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ পায়নি, তারা দর কিছুটা কম দিয়ে হলেও রি-টেন্ডারে কাজ পাওয়া নিশ্চিত করতে চায়, এতে বিডারের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দরও কমে যায় বলে জানান এই কর্মকর্তা। ‘দর বেশি-কম যাই হোক, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মানসম্পন্ন বই যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে এনসিটিবি সর্র্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
’ বলেন এই কর্মকর্তা।





















