সকাল হতেই সরু গলিতে মানুষের ভিড় দেখা যায়। কোথাও ঘরের দরজার সামনেই রান্না হচ্ছে, আবার কোথাও কাপড় শুকানোর কোনো জায়গাও নেই। ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে একাধিক মানুষ। শিশুরা গলিতে খেলছে এবং এক পাশে আড্ডা দিচ্ছে কয়েকজন তরুণ।
আশপাশের কোনো কোনো জায়গায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগও রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের চিত্র এটি। এই ক্যাম্প ‘বিহারি ক্যাম্প’ নামেও পরিচিত। কয়েক দশক ধরে এখানে বসবাস করছে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই পরিবেশে বড় হচ্ছে শিশুরা। কারো স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করা, কারো লক্ষ্য ছোট ব্যবসা গড়ে তোলা।
কিন্তু ঘনবসতি, দারিদ্র্য, সীমিত শিক্ষার সুযোগ ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা অনেকের ভবিষ্যৎ কঠিন করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক ব্যবসা, অপরাধী গোষ্ঠীর আধিপত্য এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি। এসব ঘটনায় সাধারণ বাসিন্দারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ফলে ক্যাম্পের তরুণদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন— প্রতিকূলতার মধ্যে কীভাবে স্বাভাবিক জীবন গড়ে তোলা সম্ভব?
জেনেভা ক্যাম্পে বসবাসের সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক পরিবারকে ছোট ঘরের মধ্যেই ঘুমানো, রান্না ও দৈনন্দিন কাজ সারতে হয়। কোনো কোনো ঘরে একাধিক প্রজন্মের সদস্য একসঙ্গে বসবাস করেন। শিশুদের পড়ার আলাদা জায়গা নেই, খেলাধুলার পর্যাপ্ত মাঠও নেই। ঘরের বাইরে সরু গলি, ভেতরে সীমিত পরিসর। ফলে অবসর কাটানো ও সামাজিকতার বড় জায়গা হয়ে ওঠে ক্যাম্পের পথঘাট।
২০২৪ সালে হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ৩১৩ জন বাসিন্দার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশের নিজস্ব টয়লেট নেই। তাদের যৌথ টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। পানি সরবরাহ নিয়ে অসন্তুষ্টি বা সামান্য সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা।
মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ পানি সরবরাহ নিয়ে খুব সন্তুষ্ট ছিলেন। গবেষণায় আরও উঠে আসে, ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতার পরিবারের জন্য রয়েছে মাত্র একটি ঘর। ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের ব্যবহৃত একই টয়লেট ১৬ থেকে ২০ জন ব্যবহার করেন। আর ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা বসার ঘরের কোনো এক কোণে রান্না করার কথা জানিয়েছেন। এসব তথ্য ক্যাম্পের বাসস্থান ও মৌলিক নাগরিক সুবিধার সংকটের চিত্র তুলে ধরে।
এমন পরিবেশে শিশু-কিশোরদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য নিরিবিলি পরিবেশে পড়ার সুযোগ, খেলাধুলা এবং নিরাপদ সামাজিক পরিসর গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক পরিবারের পক্ষে এসব সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন। সূত্রমতে, ক্যাম্পের তরুণদের জন্য শিক্ষা দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম পথ। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেককে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে হয়।
কেউ পরিবারের আয় বাড়াতে দোকানে কাজ নেয়, কেউ কারখানায় শ্রম দেয়, কেউ ছোট ভাইবোনের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে। এসব কারণে কারো কারো শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যায়। আবার পড়াশোনা শেষ করেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পের কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, চাকরির আবেদন বা সাক্ষাৎকারের সময় ঠিকানা জানার পর কোনো কোনো নিয়োগকর্তার আচরণ বদলে যায়।
যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মুখে পড়তে হয়। এমন অভিজ্ঞতার কারণে কেউ কেউ চাকরি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের ঠিকানা প্রকাশ করতে অস্বস্তি বোধ করেন। মূলধারার সমাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেও পরিচয় ও ঠিকানার কারণে বৈষম্যের আশঙ্কা তাদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করে। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যাম্পের অনেক পরিবারের জীবিকা ছোট ব্যবসা, রিকশা চালানো, দর্জির কাজ, কারখানার শ্রমসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশার ওপর নির্ভরশীল।
এসব কাজ সংসার চালাতে সহায়তা করলেও সব ক্ষেত্রে স্থায়ী আয় বা পেশাগত উন্নতির সুযোগ নেই। ফলে তরুণদের কেউ দ্রুত আয় করা যায় এমন কাজে ঢুকে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ বা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও অনেকের থাকে না। জেনেভা ক্যাম্পের সংকটের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক মাদক ব্যবসা ও অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা। ক্যাম্পের ভেতরে ও আশপাশে মাদক কেনাবেচা, আধিপত্য বিস্তার এবং সংঘর্ষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এসব ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটেছে। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু তরুণ অর্থের বিনিময়ে মাদক বিক্রির কাজে যুক্ত হচ্ছেন। দ্রুত টাকা পাওয়ার প্রলোভন, অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব এবং পারিবারিক সংকট তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে টানছে। আবার একই প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও বিপুলসংখ্যক তরুণ সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ক্যাম্পবাসীর দেওয়া তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একজন কিশোরের সামনে যখন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বিকল্প সীমিত থাকে, তখন অপরাধী গোষ্ঠীর প্রলোভন থেকে তাকে দূরে রাখতে পরিবার ও সমাজের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাই অপরাধ দমনের পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা শিশু-কিশোরদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই। উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বের প্রশ্নে ২০০৮ সালের ১৮ মে হাইকোর্টের একটি রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই রায়ে বাংলাদেশে বসবাসরত বিহারিদের নাগরিকত্ব স্বীকার করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি আর বাস্তব জীবনে সমান সুযোগ পাওয়া এক বিষয় নয়। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত না হলে শুধু আইনি স্বীকৃতি দিয়ে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করা কীভাবে সম্ভব? ক্যাম্পের সব পরিবার একই অর্থনৈতিক অবস্থায় নেই। তুলনামূলক সচ্ছল কিছু পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা ও উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ক্যাম্পের বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন।
তাদের একজন ব্যবসায়ী মাহতাব উদ্দিন। তিনি জানান, সন্তানদের লেখাপড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনি বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। তার মতো আরও অনেকে একই কারণে ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে থাকার চেষ্টা করছেন। তবে বাড়িভাড়া, অগ্রিম জামানত ও নিয়মিত আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতা আবাসন ও শিক্ষার সুযোগ নিয়ে বাসিন্দাদের উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আনে।
ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা সুমন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ক্যাম্পের ঠিকানা নিয়ে নেতিবাচক ধারণার কারণে কেউ কেউ নিজেদের পরিচয় প্রকাশেও অস্বস্তি বোধ করেন। কারণ সামাজিক বৈষম্য তাদের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথে বাধা তৈরি করে। এদিকে ক্যাম্পের অপরাধ দমনে পুলিশ সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এর পরও বন্ধ হচ্ছে না অপরাধ। ক্যাম্পের একদিকে অভিযান চলে, অন্যদিকে চলে মাদক বিক্রি।
তবে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মো. ইবনে মিজান জানান, জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধ ও মাদক ব্যবসা রুখে দিতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোপূর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের গডফাদাররাও ধরা পড়েছেন। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, জেনেভা ক্যাম্পের সংকট সমাধানে মাদকবিরোধী অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও জনস্বাস্থ্য খাতে সমন্বিত উদ্যোগ।
মাদকাসক্তি বা অপরাধের ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের জন্য কাউন্সেলিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, জেনেভা ক্যাম্পের প্রতিটি শিশু বা তরুণের ভবিষ্যৎ এক নয়। কেউ প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা করছে, কেউ পরিবারের দায়িত্ব নিচ্ছে, কেউ কর্মজীবনে প্রবেশ করছে। তবে একটি বড় অংশই হতাশ কিংবা অপরাধপ্রবণ।
প্রশ্ন হলো, তাদের সম্ভাবনা বিকশিত করার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ কী সুযোগ তৈরি করছে? নাগরিকত্বের স্বীকৃতির পরও যদি নিরাপদ বাসস্থান, মানসম্মত শিক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকে, তাহলে বৈষম্য ও বঞ্চনার চক্র ভাঙা কঠিন হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্যাম্পের গলিতে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া, একজন তরুণকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা এবং অপরাধী চক্রের প্রলোভন থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়, রাষ্ট্র এবং সমাজেরও।
তারা বলছেন, অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। কিন্তু হতাশার বিরুদ্ধে লড়াইও জরুরি। কারণ একটি প্রজন্মের সামনে বিকল্প পথ তৈরি করা না গেলে তার শূন্যস্থান দখল করতে পারে অপরাধী চক্র। আর সেই মূল্য দিতে হবে শুধু ক্যাম্পের বাসিন্দাদের নয়, পুরো নগর সমাজকে।























