পুঁজিবাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়ানোর সবচেয়ে বড় বাধা কাটল। এখন থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়াই শর্তযোগ্য উপায়ে পুঁজিবাজারে সরাসরি কোম্পানি তালিকাভুক্তি হতে পারবে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানিগুলোকে এই সুযোগ দিয়ে সোমবার (১৯ অক্টোবর) এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
প্রজ্ঞাপন অনুসারে, সরকারি-বেসরকারি মিলে ২৬টি কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে আসার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারি এবং বেসরকারি মিলে বেশ কয়েকটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে। যার রেশ ধরেই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে। ’ ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রথম জারি করা স্মারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, ঠিক ১৫ বছর পরে চলতি বছরের ৫ অক্টোবর বিধি-নিষেধ তুলে নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
সব বিধি-বিধান অনুসরণ করে গতকাল সোমবার থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরাসরি তালিকাভুক্তিতে সুযোগ তৈরি করে দেয়। এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়ায় থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অধীন মোট ১২টি ক্যাপিটাল মার্কেট সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ব্যাবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে বলে জানায় বিএসইসি। তবে কমিশনের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন বিধিমালায় আইপিও ছাড়াই পুঁজিবাজারে যুক্ত হতে পারবে সরকারি এবং বেসরকারি কোম্পানি।
নতুন নিয়মে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানিকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ পরিশোধিত শেয়ার বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। তালিকাভুক্তির প্রথম দিনের শেয়ারদর নির্ধারণের জন্য প্রথম দুই ঘণ্টা মূল্য অনুসন্ধান বা প্রাইস ডিসকভারি সময় হিসেবে রাখা হবে। এ সময় বিনিয়োগকারীরা কেনার প্রস্তাব দিতে পারবেন, তবে বিক্রেতারা কোনো বিক্রয়াদেশ দিতে পারবেন না।
মূল্য অনুসন্ধান শেষে বাজারে প্রচলিত সর্বোত্তম দামে শেয়ার বিক্রি করতে হবে। বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শেয়ারের ন্যূনতম প্রস্তাবিত মূল্য বা মিনিমাম আস্কিং প্রাইস নির্ধারণ করতে হবে। তা হলো— রেফারেন্স প্রাইসের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কম। তবে এই মূল্যকে চূড়ান্ত বাজারদর হিসেবে ধরা হবে না, প্রথম দিনের মূল্য অনুসন্ধান ও লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ারের বাজারদর নির্ধারিত হবে।
বিএসইসির নতুন বিধিমালায় একক ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির আওতায় বিক্রির জন্য নির্ধারিত মোট শেয়ারের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ কেনার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রথম দুই লেনদেন দিবসে একক আদেশে ১০০টির কম বা এক হাজারের বেশি শেয়ার কেনার আদেশ গ্রহণ করা হবে না। এসব বিধানের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে আসার প্রক্রিয়ায় কোম্পানি : বিএসইসির একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারী লাভজনক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে— এসেনসিয়াল ড্রাগস, কনফিডেন্স পাওয়ার, টিকে স্টিল, র‌্যাংকস পেট্রোলিয়াম, র‌্যানকম মোটরবাইক লিমিটেড, ফাইবার অ্যাট হোমসহ ডজনখানেক কোম্পানি।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য : ২০১০ সালের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত ও প্রসারিত করতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে। আমরা সামগ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি।
ইনশাআল্লাহ, আগামী এক বছরের মধ্যে আপনারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত চেহারা দেখতে পাবেন। ’ তার আগে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগ আমলের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘অল্প সময়ের মধ্যে সরকারি ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পুঁজিবাজারে না ছাড়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগ করতে হবে।
’ নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার আগে থেকেই সরকারি সেই ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার তালিকাভুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার সূত্র ধরে সম্ভাবনার পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে বলে মনে করেন পুঁজিবাজারের অনেক বিনিয়োগকারী। সচিবালয়ে ঢাকা চেম্বারের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বাজারে আসছে না।
এতে আমি হতাশ। অল্প সময়ের মধ্যে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার যদি বাজারে না আসে, তবে ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগ করতে হবে। ’ যদিও পরে তা হয়নি এবং সরাসরি তালিকভুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আওয়ামী লীগ সরকার। পুঁজিবাজারের প্রসার সম্পর্কে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত ও প্রসারিত করতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে। সামগ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ, আগামী এক বছরের মধ্যে আপনারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত চেহারা দেখতে পাবেন। ’ জানতে চাইলে ফাস্ট ক্যাপিটালের সাধারণ বিনিয়োগকারী মুশফিকুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন কোম্পানির অন্তর্ভুক্তিতে তারল্য সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি মুনাফার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
আর সরকারি-বেসরকারি লাভজনক কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হবে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগের পথও উন্মোচিত হবে, যা বাজারের জন্য হবে অর্থবহ পদক্ষেপ। ’ জানতে চাইলে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, পুঁজিবাজার বর্তমানে ‘নন-ফাংশনাল মার্কেট’ বা অকার্যকর বাজারে পরিণত হয়েছে ২০১০ সালের পর থেকে।
এখানে মূলত সুশাসনের অভাব। তবে নতুন কমিশন ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভালো দিক। এতে বাজারে দীর্ঘদিনের খরা কাটবে আর আস্থা বাড়বে’ বলেন তিনি। বিএসইসির যুগান্তকারী পদক্ষেপ : বিএসইসির সভায় গতকাল কমোডিটি ডেরিভেটিভস লাইসেন্সের নীতিগত অনুমোদন, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং লাইসেন্স বাতিল প্রক্রিয়ায় থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্যাপিটাল মার্কেট সাবসিডিয়ারিগুলোর বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভা শেষে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকার নিবন্ধন : সভায় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির (সিএসই) সুপারিশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের ভিত্তিতে ছয়টি স্টক ব্রোকারেজ কোম্পানিকে কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকার নিবন্ধন সনদ প্রদানের নীতিগত অনুমোদন এবং লেটার অব ইনটেন্ট ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— সোহেল সিকিউরিটিজ লিমিটেড, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এনএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বি রিচ লিমিটেড, পিএইচপি স্টকস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড। পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ড থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের দাবি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন।
এতে জানানো হয়েছে, ব্যাংকো সিকিউরিটিজ লিমিটেড, তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের যাচাইকৃত ও অনিষ্পন্ন দাবির বিপরীতে ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ডের বিধান অনুসারে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্যাপিটাল মার্কেটে ১২টি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান চলবে : এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়ায় থাকা ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অধীন মোট ১২টি ক্যাপিটাল মার্কেট সাবসিডিয়ারি কোম্পানির ব্যাবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
এর মধ্যে পর্যাপ্ত নিট সম্পদ থাকার পাশাপাশি মূল্যায়ন সূচকে সন্তোষজনক অবস্থান থাকায় দুটি স্টক ব্রোকার প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজ ব্রোকার লিমিটেড, আভিভা ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড এবং দুটি মার্চেন্ট ব্যাংকার পিএলএফএস ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট তাদের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে পারবে।
অন্যদিকে নিট সম্পদসহ সিকিউরিটিজ আইন ও বিধি-বিধান পরিপালনে ঘাটতি থাকায় সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ঘাটতি নিরসন ও প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান নিশ্চিত করার জন্য ৩০ এপ্রিল ২০২৭ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে চারটি স্টক ব্রোকার— প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ, ফারইস্ট স্টকস এন্ড বন্ডস লিমিটেড, পিএফআই সিকিউরিটিজ; দুটি মার্চেন্ট ব্যাংকার— আইএল ক্যাপিটাল লিমিটেড ও জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি— প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ফ্যাস ক্যাপিটাল মানেজমেন্ট লিমিটেডকে নিট সম্পদের ঘাটতি পূরণ ও বিধিমালা পরিপালনে ইতিপূর্বে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সময় প্রদান করা হয়েছিল।





















