নেই কোনো লিখিত দলীয় প্রজ্ঞাপন কিংবা আনুষ্ঠানিক পদের চিঠি। তবুও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান, অখ্যাত ক্লাবঘর কিংবা নিজস্ব টর্চার সেলে বসে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও সম্পত্তি দখল করছে একশ্রেণির স্বঘোষিত নেতা।
তারা নিজেদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং আগামীতে চেয়ারম্যান-কমিশনার হওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছেন— এমনটি দাবি করছেন। এভাবেই অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এদিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে বারবার ‘দখলদারত্বের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা’র কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই স্বঘোষিত নেতাদের দাপটে দিশেহারা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।
ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা বলছেন, কোথাও কোথাও এরা শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালীদের ‘ঘনিষ্ঠ’ বা ‘সবুজ সংকেতপ্রাপ্ত’, তাই প্রশাসনও নিশ্চুপ। ফলে চাঁদাবাজি বা দখলের শিকার হয়েও ভয়ে তাদের মুখ বন্ধ রাখতে হচ্ছে; বিশেষ করে রাজধানীবাসী আরও বেশি অসহায়। ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণসহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করে।
এরপর থেকেই দাপট শুরু এই স্বঘোষিত নেতাদের। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই নতুন ঘরানার অপরাধচক্রের নেতারা তাদের কাজে কোনো ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন না। প্রযুক্তির নজরদারি এড়াতে তারা ‘ফেস-টু-ফেস’ বা মুখোমুখি যোগাযোগের অ্যানালগ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। কোনো একটি নির্মাণাধীন ভবন, আবাসন প্রকল্প কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর পর প্রথমে ক্যাডারদের পক্ষ থেকে একটি মৌখিক বার্তা পাঠানো হয়।
বার্তাটি আসে স্থানীয় কোনো প্রভাবশালীর রাজনৈতিক আস্তানা বা চায়ের দোকান থেকে। সেখানে ভুক্তভোগীকে ডেকে নিয়ে বলা হয়, “ওপরের অলিখিত সবুজ সংকেত আছে, এলাকায় চলতে গেলে আমাদের ‘সন্তুষ্ট’ করতে হবে। ” কোনো প্রমাণ না রাখার এই কৌশল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চরম বিপাকে ফেলছে। পুলিশের বিশেষ শাখার সাম্প্রতিক একটি গোপন তালিকা এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির ব্যবস্থাটি মোটেও ভেঙে পড়েনি, কেবল হাতবদল হয়েছে।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের উত্তর বিভাগে ৫৪টি এবং দক্ষিণে ৭৫টি ওয়ার্ড মিলিয়ে দুই বিভাগে এই স্বঘোষিত নেতার সংখ্যা ১২৯। রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এদের প্রায় ১ হাজার ৫৩০ জন চাঁদাবাজ ও ২৭৮ জন পৃষ্ঠপোষক রয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসা সেক্টরের পাশাপাশি ফুটবল মাঠ, বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, কেবল বা ইন্টারনেট ব্যবসা, এমনকি বর্জ্য সংগ্রহের মতো খাতগুলোও এখন স্থানীয় ‘স্বঘোষিত কমিশনার’দের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
রাজধানীর বাইরে সারা দেশে এসআরবির ১৫টি ব্যাটালিয়নের তালিকায় এই শ্রেণির চাঁদাবাজ হিসেবে নাম রয়েছে ৩ হাজার ৫৮৬ জনের। পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, গাবতলী-সদরঘাট বেড়িবাঁধ এলাকায় গদি-ঘাট দখল থেকে শুরু করে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে স্থানীয় স্বঘোষিত নেতা পাপেল ও তার বাহিনী। গাবতলী থেকে সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়কের দুই পাশের ইট-বালুর গদি, বুড়িগঙ্গার ঘাট, আড়ত এবং মালবাহী পরিবহন খাতকে জিম্মি করে ফেলেছে তারা।
‘ওপরের সবুজ সংকেতে’র কথা বলে প্রতি মাসে আদায় করছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। পাভেলের প্রধান সহযোগী হচ্ছেন লেলিন, হানিফ ও শুভ্র। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, এই চারজন নিজেদের নতুন রাজনৈতিক জমানার ‘ত্রাতা’ পরিচয় দিয়ে পুরো বেড়িবাঁধ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। পাভেলের ডান হাত হিসেবে চিহ্নিত গোলাম আম্বিয়া লেলিন। বসবাস বেড়িবাঁধের কালুনগর এলাকায়।
আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও এখন নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের বলে দাবি করেন। লেলিন গতকাল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তিনি কোনো চাঁদাবাজচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং আগেও ছিলেন না। দল পরিবর্তন করায় একটি মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। মিরপুরের ‘রাড্ডা হাসপাতাল’ গুঁড়িয়ে দেওয়া ও লেগুনাস্ট্যান্ড দখল ঘটনার নেপথ্যে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যের পাশাপাশি আরেকজন স্থানীয় নেতার নাম উঠে এসেছে।
এই চক্র মিরপুরের অন্তত ৫টি লেগুনাস্ট্যান্ড দখল করে গাড়িপ্রতি দৈনিক ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে। এই চক্রের নেতা স্থানীয় প্রভাবশালী শাহিনুর আলম। এদিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে নির্মাণাধীন ভবন, তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা এবং ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা তোলা হয়। চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি প্রতিদিনের ঘটনা।
সম্প্রতি গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মতিঝিল এলাকা থেকে এই চক্রের অন্যতম প্রধান লিটন চোকদারকে গ্রেপ্তার করেছে। রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় শাহিন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঠিক একই পদ্ধতিতে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও হামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, তিনি আগে আওয়ামী লীগ করতেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে নিজেকে ‘বিএনপির প্রভাবশালী’ নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় তাণ্ডব চালাচ্ছেন।
গত ৭ অক্টোবর পূর্ব বাড্ডা এলাকায় এক পরিবারের পাঁচ কাঠা জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে শাহিন ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে। এ সময় বাধা দেওয়ায় শাহিন তার ক্যাডারদের নিয়ে ওই পরিবারের ওপর অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালান। এতে পরিবারের সদস্যরা রক্তাক্ত জখম হন। ভুক্তভোগী মো. হাবিবুর রহমান মিন্টু ও তার স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার ১১ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে এই নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছেন।
হাবিবুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় তারা বাড্ডা থানায় মামলা করতে গেলে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। ওই কর্মকর্তা মৌখিকভাবে বলেন, ‘শাহিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া যাবে না। ’ অবশ্য গত আগস্ট ও চলতি অক্টোবর মাসে শাহিন বাহিনীর বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং দুটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
কিন্তু পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। শাহিনের প্রধান সহযোগী হচ্ছেন রুবেল, দুলাল, রাসেল ও ঈমান আলী। তবে মো. শাহিন গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং মিথ্যা অভিযোগ আনছে। তার দাবি, তিনি কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত নন। মিরপুরের সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জায়গায় অবৈধভাবে লোহার খাঁচা, সাইনবোর্ড ও অস্থায়ী স্থাপনা বসিয়ে রাস্তা এবং সরকারি জমি দখল করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো প্লটের মালিক নতুন ভবন নির্মাণ করতে গেলে স্বঘোষিত নেতাদের হুমকির মুখে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। টাকা না দিলে কাজ বন্ধ এবং মারধরের শিকার হতে হচ্ছে। রূপনগর হাউজিং সোসাইটি ও স্থানীয় সূত্রে এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে স্বঘোষিত নেতা সালাহউদ্দিন শিপু মোল্লা এবং তার প্রধান সহযোগী আমজাদ হোসেন মোল্লাকে।
তাদের সঙ্গে আরও যুক্ত রয়েছেন জাকির হোসেন শান্ত, শিহাব উদ্দিন ও মো. জামাল উদ্দিন। মিরপুর ও শাহ আলী থানা এলাকায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান, নতুন বহুতল ভবন নির্মাণাধীন সাইট এবং স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের স্টুডিও ও সম্পত্তিতে ফিল্মি স্টাইলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা দলবল নিয়ে অফিসে বা সাইটে ঢুকে ক্যাশ বা নগদ টাকার জন্য জিম্মি করার অ্যানালগ কায়দা বেছে নিয়েছে।
সম্প্রতি পুলিশ এই এলাকার স্বঘোষিত নেতা নূর আলম, রাকিব আহমেদ, সারোয়ার আলম এবং সাজ্জাদ হোসেন মিশুকে গ্রেপ্তার করেছে। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় স্বঘোষিত নেতা অনিক এবং মিজান ওরফে কুষ্টিয়া মিজান। সম্প্রতি তারাও গ্রেপ্তার হয়েছেন। ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জ নিয়ন্ত্রণ করছেন খোকন এবং শাহিন নামে দুজন স্বঘোষিত নেতা।
শাহিনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণেই তাকে অহেতুক দোষারোপ করা হচ্ছে। তিনি কোনো প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার ও স্থানীয় ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে যে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি চলছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
এটি মূলত পুরোনো দখলদারি সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা। কেন্দ্রীয় নেতারা মুখে সৎ ও সংস্কারমুখী রাজনীতির কথা বললেও তৃণমূলের ক্যাডারদের ওপর তাদের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত আত্মশুদ্ধি করতে এবং অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, এই নেটওয়ার্কের ক্যাডারদের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই; বরং কিছুটা সবুজ সংকেতই রয়েছে।
ফলে পুলিশও সংগত কারণে নিষ্ক্রিয় বা এদের পক্ষেই অবস্থান নিয়ে থাকে। সরকার ও শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো যদি এখনই এই ‘নাম ভাঙানো’ স্বঘোষিত কমিশনারদের লাগাম টেনে না ধরে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও বিপর্যয় ঘটবে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কোনো চাঁদাবাজ ও ভূমি দখলবাজকে ছাড় দেওয়া হবে না।
অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, সে যে-ই হোক না কেন। গত কয়েক দিনের বিশেষ অভিযানে মিরপুর ও তেজগাঁওসহ ৮টি বিভাগ থেকে শত শত চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।





















