আজ মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
৪ কার্তিক, ১৪৩৩ | ০৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৪°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

অসমাপ্ত বিচার ও ক্ষমা না চাওয়াই রাজনীতিতে পুনর্মিলনের বড় বাধা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:13:41 pm, Sunday, 18 October 2026
  • 23

অসমাপ্ত বিচার ও ক্ষমা না চাওয়াই রাজনীতিতে পুনর্মিলনের বড় বাধা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রাজনীতিতে আবারও জোর আলোচনায় এসেছে রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন। বিরোধ ও সংঘাতের পর শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ—এমন মত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর সম্ভাবনা নিয়ে রয়েছে ভিন্নতা।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্ষমা না চেয়ে পাল্টা হুমকি ও দলীয় একগুঁয়েমি রিকনসিলিয়েশনে বড় বাধা বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। বিএনপি, জামায়াত-এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, জুলাই অভ্যুত্থানসহ আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির যারা ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত নন, তাদের অপরাধ এবং সম্পৃক্ততা স্বীকার ও ক্ষমাপ্রার্থনার মাধ্যমে একটি সমঝোতার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাজনীতিতে সমঝোতা (রিকনসিলিয়েশন) প্রয়োজন আছে। তবে দেশে এখনো সেই পরিস্থিতি বা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। পতিত দলটির লোকদের যেখানে ক্ষমা চাওয়া উচিত, সেখানে তারা উল্টো প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের আস্ফালন করছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির রাজনৈতিকভাবে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখি না। যদি তারা নিজেদের ভুল ও অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং প্রকাশ্যে দেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়, তাহলে যারা গুরুতর অপকর্মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন, তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। ’ ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যে প্রাণহানি হয়েছে, স্বাধীন দেশে আর কোনো আন্দোলনে এত প্রাণহানি ও রক্তপাতের ঘটনা দেখা যায়নি।

এই আন্দোলন ঘিরে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের এক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা বলা হয় প্রায় ১ হাজার ৪০০। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্দোলন চলাকালে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অন্তত ১৯ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। ছাত্রনেতাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আহত হয়েছেন প্রায় ২৪ হাজার। জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, আহতের সংখ্যা ১৫ হাজার ৯০৩।

এ ছাড়া, মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে গেজেট তৈরি করেছে, তাতে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা বলা হচ্ছে ৮৪৪। গেজেটে তাদের ‘শহিদ’ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাতটি মামলার রায় ঘোষণা করেছেন।

যেখানে ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন— সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে চারজন বর্তমানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে রয়েছেন। বাকি ১৮ জন পলাতক।

সম্প্রতি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পতিত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা রাজনৈতিক মীমাংসার বিষয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা চলছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিচ্ছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। তবে বেশির ভাগই মনে করছেন, গণহত্যার বিষয়ে স্বীকারোক্তিসহ ক্ষমা চাওয়া ও হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার শেষেই কেবল সমঝোতা সম্ভব।

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা তুলে ধরেছে। তারা আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছে। তাদের ইশতেহারের নতুন দিক হলো, নাৎসি-পরবর্তী জার্মানি ও বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে তারা ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন প্রতিষ্ঠা চান।

রিকনসিলিয়েশনের বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশকে একটি শাসনযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে রিকনসিলিয়েশনের বিকল্প নেই। এটা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে করতে হবে, সেটিই প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘যখন সবাই খোলামনে সামনে এগিয়ে আসে, নিজেদের দোষ স্বীকার করে এবং অনুশোচনা ব্যক্ত করে। অতীতে যেসব ভুলত্রুটি ও অন্যায় হয়েছে, সেগুলো অনুধাবন করে ভবিষ্যতে যেন সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে সবাইকে সামনে এগোতে হয়।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখছি না। যারা অন্যায় করেছে, লুটপাট করেছে, তাদের মধ্যে এখনো সেই উপলব্ধি দেখা যাচ্ছে না যে ওই অধ্যায়ের ইতি ঘটিয়ে নতুন করে ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে হবে। এটি না হলে রিকনসিলিয়েশন সম্ভব নয়। ’ সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ ‘রিকনসিলিয়েশনে’র বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সেখানে বক্তারা বলেন, অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি সমাজের বিভাজন কাটিয়ে উঠতে ‘রিকনসিলিয়েশন’ প্রয়োজন। তবে এ জন্য আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিচার হতে হবে। যৌথ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের অনুশোচনা ও শাস্তি ছাড়া ‘রিকনসিলিয়েশন’ হবে না। সেখানে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ফ্যাসিস্টদের বিচার, এরপর রিকনসিলিয়েশন হবে।

সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের আইনি পরিণতি থেকে আড়াল করার প্রচেষ্টার কারণেই বিশ্বব্যাপী রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া বারবার ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্রমাগত হুমকির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকারের দিক থেকে ‘রিকনসিলিয়েশনে’র আলাপ করা কঠিন।

তা ছাড়া আওয়ামী লীগই তা চাইছে না, রিকনসিলিয়েশন তাদের চাইতে হবে। রিকনসিলিয়েশনে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোই সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার। বিএনপি তার ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবে ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ইশতেহারেও ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশে রিকনসিলিয়েশনের কোনো বাস্তবতা সৃষ্টি হয়নি। যারা দেশে গণহত্যা চালিয়েছে, বিগত ১৭ বছর ধরে অপশাসন কায়েম করেছে, সেই আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত না হয়, আইনের কাছে আত্মসমর্পণ না করে, একই সঙ্গে দেশের বাইরে বসে ষড়যন্ত্রের তৎপরতা চালায়, তাহলে দেশের জনগণ তা মেনে নেবে না।

তিনি বলেন, আগুন-বোমাবাজি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, ‘রিকনসিলিয়েশন’ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সম্ভব। তবে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া এবং আইনের মুখোমুখি হতে হয়। তারা আগে নিজেদের অন্যায় স্বীকার করুক।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যে দল অসংখ্য মানুষকে গুম করেছে, খুন করেছে, পঙ্গু করেছে, তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। আওয়ামী লীগ এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেনি। তারা এ বিষয়ে কোনো ধরনের প্রস্তাবও দেয়নি। ফলে রিকনসিলিয়েশন নিয়ে এর বেশি কিছু বলার নেই। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রিকনসিলিয়েশনের পূর্বশর্ত, যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে গণহত্যা, গুম, খুন, দেশদ্রোহের অপরাধ স্বীকার করতে হবে। এরপর অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সাধারণ সমর্থক যারা হত্যায় বা অপরাধে যুক্ত নয়, তারা ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করেন, ক্ষমা না চাওয়াটা রাজনৈতিক কৌশলের বড় ভুল।

সাধারণ মানুষের ক্ষমা পাওয়ার জন্য অপরাধ স্বীকার করা প্রয়োজন। যদিও দলের শীর্ষ নেতাদের বা দলীয় অবস্থান ভিন্ন। দলীয়ভাবে কিংবা শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা আসেনি।

সম্প্রতি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ক্ষমা না চেয়ে, ক্রমাগত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা ও অস্থিরতাকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা সমঝোতার সুযোগ নেই বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে দায় স্বীকার বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নিলে, তখন এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। উল্লেখ্য, জুলাই ২০২৪-এর পর রিকনসিলিয়েশন নিয়ে রাজনীতিতে জোর আলোচনা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তখন ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের কথাও তুলেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘ট্রুথ জাস্টিস কমিশন অথবা ট্রুথ রিকনসিলিয়েশন কমিশন খুব দরকার। এটা সম্ভবত আমাদের দেশে ১৯৭২ সাল থেকে থাকলেই ভালো হতো। আমরা সবকিছুই খুব কনফরমেশনালভাবে (ঐকমত্যের ভিত্তিতে) নিষ্পত্তি করতে চাই।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে প্রধানমন্ত্রীকে বরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন

অসমাপ্ত বিচার ও ক্ষমা না চাওয়াই রাজনীতিতে পুনর্মিলনের বড় বাধা

Update Time : 10:13:41 pm, Sunday, 18 October 2026

রাজনীতিতে আবারও জোর আলোচনায় এসেছে রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন। বিরোধ ও সংঘাতের পর শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ—এমন মত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর সম্ভাবনা নিয়ে রয়েছে ভিন্নতা।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্ষমা না চেয়ে পাল্টা হুমকি ও দলীয় একগুঁয়েমি রিকনসিলিয়েশনে বড় বাধা বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। বিএনপি, জামায়াত-এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, জুলাই অভ্যুত্থানসহ আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির যারা ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত নন, তাদের অপরাধ এবং সম্পৃক্ততা স্বীকার ও ক্ষমাপ্রার্থনার মাধ্যমে একটি সমঝোতার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাজনীতিতে সমঝোতা (রিকনসিলিয়েশন) প্রয়োজন আছে। তবে দেশে এখনো সেই পরিস্থিতি বা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। পতিত দলটির লোকদের যেখানে ক্ষমা চাওয়া উচিত, সেখানে তারা উল্টো প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের আস্ফালন করছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির রাজনৈতিকভাবে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখি না। যদি তারা নিজেদের ভুল ও অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং প্রকাশ্যে দেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়, তাহলে যারা গুরুতর অপকর্মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন, তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। ’ ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যে প্রাণহানি হয়েছে, স্বাধীন দেশে আর কোনো আন্দোলনে এত প্রাণহানি ও রক্তপাতের ঘটনা দেখা যায়নি।

এই আন্দোলন ঘিরে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের এক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা বলা হয় প্রায় ১ হাজার ৪০০। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্দোলন চলাকালে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অন্তত ১৯ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। ছাত্রনেতাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আহত হয়েছেন প্রায় ২৪ হাজার। জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, আহতের সংখ্যা ১৫ হাজার ৯০৩।

এ ছাড়া, মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে গেজেট তৈরি করেছে, তাতে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা বলা হচ্ছে ৮৪৪। গেজেটে তাদের ‘শহিদ’ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাতটি মামলার রায় ঘোষণা করেছেন।

যেখানে ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন— সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে চারজন বর্তমানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে রয়েছেন। বাকি ১৮ জন পলাতক।

সম্প্রতি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পতিত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা রাজনৈতিক মীমাংসার বিষয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা চলছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিচ্ছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। তবে বেশির ভাগই মনে করছেন, গণহত্যার বিষয়ে স্বীকারোক্তিসহ ক্ষমা চাওয়া ও হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার শেষেই কেবল সমঝোতা সম্ভব।

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা তুলে ধরেছে। তারা আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছে। তাদের ইশতেহারের নতুন দিক হলো, নাৎসি-পরবর্তী জার্মানি ও বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে তারা ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন প্রতিষ্ঠা চান।

রিকনসিলিয়েশনের বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশকে একটি শাসনযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে রিকনসিলিয়েশনের বিকল্প নেই। এটা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে করতে হবে, সেটিই প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘যখন সবাই খোলামনে সামনে এগিয়ে আসে, নিজেদের দোষ স্বীকার করে এবং অনুশোচনা ব্যক্ত করে। অতীতে যেসব ভুলত্রুটি ও অন্যায় হয়েছে, সেগুলো অনুধাবন করে ভবিষ্যতে যেন সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে সবাইকে সামনে এগোতে হয়।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখছি না। যারা অন্যায় করেছে, লুটপাট করেছে, তাদের মধ্যে এখনো সেই উপলব্ধি দেখা যাচ্ছে না যে ওই অধ্যায়ের ইতি ঘটিয়ে নতুন করে ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে হবে। এটি না হলে রিকনসিলিয়েশন সম্ভব নয়। ’ সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ ‘রিকনসিলিয়েশনে’র বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সেখানে বক্তারা বলেন, অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি সমাজের বিভাজন কাটিয়ে উঠতে ‘রিকনসিলিয়েশন’ প্রয়োজন। তবে এ জন্য আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিচার হতে হবে। যৌথ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের অনুশোচনা ও শাস্তি ছাড়া ‘রিকনসিলিয়েশন’ হবে না। সেখানে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ফ্যাসিস্টদের বিচার, এরপর রিকনসিলিয়েশন হবে।

সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের আইনি পরিণতি থেকে আড়াল করার প্রচেষ্টার কারণেই বিশ্বব্যাপী রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া বারবার ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্রমাগত হুমকির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকারের দিক থেকে ‘রিকনসিলিয়েশনে’র আলাপ করা কঠিন।

তা ছাড়া আওয়ামী লীগই তা চাইছে না, রিকনসিলিয়েশন তাদের চাইতে হবে। রিকনসিলিয়েশনে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোই সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার। বিএনপি তার ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবে ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ইশতেহারেও ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশে রিকনসিলিয়েশনের কোনো বাস্তবতা সৃষ্টি হয়নি। যারা দেশে গণহত্যা চালিয়েছে, বিগত ১৭ বছর ধরে অপশাসন কায়েম করেছে, সেই আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত না হয়, আইনের কাছে আত্মসমর্পণ না করে, একই সঙ্গে দেশের বাইরে বসে ষড়যন্ত্রের তৎপরতা চালায়, তাহলে দেশের জনগণ তা মেনে নেবে না।

তিনি বলেন, আগুন-বোমাবাজি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, ‘রিকনসিলিয়েশন’ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সম্ভব। তবে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া এবং আইনের মুখোমুখি হতে হয়। তারা আগে নিজেদের অন্যায় স্বীকার করুক।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যে দল অসংখ্য মানুষকে গুম করেছে, খুন করেছে, পঙ্গু করেছে, তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। আওয়ামী লীগ এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেনি। তারা এ বিষয়ে কোনো ধরনের প্রস্তাবও দেয়নি। ফলে রিকনসিলিয়েশন নিয়ে এর বেশি কিছু বলার নেই। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রিকনসিলিয়েশনের পূর্বশর্ত, যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে গণহত্যা, গুম, খুন, দেশদ্রোহের অপরাধ স্বীকার করতে হবে। এরপর অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সাধারণ সমর্থক যারা হত্যায় বা অপরাধে যুক্ত নয়, তারা ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করেন, ক্ষমা না চাওয়াটা রাজনৈতিক কৌশলের বড় ভুল।

সাধারণ মানুষের ক্ষমা পাওয়ার জন্য অপরাধ স্বীকার করা প্রয়োজন। যদিও দলের শীর্ষ নেতাদের বা দলীয় অবস্থান ভিন্ন। দলীয়ভাবে কিংবা শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা আসেনি।

সম্প্রতি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ক্ষমা না চেয়ে, ক্রমাগত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা ও অস্থিরতাকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা সমঝোতার সুযোগ নেই বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে দায় স্বীকার বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নিলে, তখন এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। উল্লেখ্য, জুলাই ২০২৪-এর পর রিকনসিলিয়েশন নিয়ে রাজনীতিতে জোর আলোচনা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তখন ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের কথাও তুলেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘ট্রুথ জাস্টিস কমিশন অথবা ট্রুথ রিকনসিলিয়েশন কমিশন খুব দরকার। এটা সম্ভবত আমাদের দেশে ১৯৭২ সাল থেকে থাকলেই ভালো হতো। আমরা সবকিছুই খুব কনফরমেশনালভাবে (ঐকমত্যের ভিত্তিতে) নিষ্পত্তি করতে চাই।