আজ বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
২৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৭°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৩০%

নিরাপত্তার দেয়ালে ষড়যন্ত্রের ফাটল

  • MIT ERP
  • Update Time : 01:53:53 am, Wednesday, 14 October 2026
  • 9

নিরাপত্তার দেয়ালে ষড়যন্ত্রের ফাটল

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দেশজুড়ে হঠাৎ করেই খুন, ডাকাতি, অস্থিরতা ও বিভিন্ন সংঘাত বেড়েছে। আপাতদৃষ্টে একে সাধারণ অপরাধের বিস্তার মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে ভিন্ন এক ভয়ংকর সমীকরণ। অপরাধবিজ্ঞানী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত করছে, দেশকে অস্থিতিশীল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নড়বড়ে প্রমাণ করতে পর্দার আড়াল থেকে সক্রিয় রয়েছে পুলিশের একটি অংশসহ বিশেষ কোনো রাজনৈতিক মহল।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার খেলা চলছে মাঠপর্যায়ে। দ্রুত এই চক্রকে সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। পুলিশের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই গভীর ষড়যন্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মাঠপর্যায়ের পুলিশের একটি বড় অংশের রহস্যজনক ‘নিষ্ক্রিয়তা’ এবং প্রকাশ্য অন্তর্ঘাত।

বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একদিকে মাঠে অপরাধীদের আশকারা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশের অফিসিয়াল শৃঙ্খলা ভেঙে খোদ পুলিশ সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন। সরকার এই চরম অপেশাদার আচরণ ও অন্তর্ঘাতের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে চাকরিচ্যুতি এবং মামলার মতো শুদ্ধি অভিযান শুরু করলেও অসৎ চক্রের অপতৎপরতা থেমে নেই।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসআরবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের পাশাপাশি এবার কঠোর অ্যাকশনে নেমেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সবার সমন্বিত পরিকল্পনায় ক্র্যাকডাউন এবং অ্যাকশন অভিযান চলছে। পর্দার আড়ালের মূল মাস্টারমাইন্ড এবং কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে দাগী অপরাধীদের আশ্রয়দাতাদের তালিকা ধরে কাজ করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার যেকোনো অপচেষ্টা সমূলে উৎপাটন করা হবে। দেশজুড়ে চলছে বিশেষ ‘কম্বিং অপারেশন’ বা চিরুনি অভিযান। একই সঙ্গে সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও অস্ত্র-তহবিলের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কৃত্রিম আতঙ্ক ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, তা রুখতে তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার ক্রাইম বিভাগ সম্পূর্ণ নতুন এবং আক্রমণাত্মক কৌশলগত কয়েকটি অ্যাকশন প্ল্যান করে কাজ শুরু করেছে।

সাইবার ক্রাইম ইউনিট একটি বিশেষ অ্যালগরিদম চালু করেছে, যা ‘আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে’ বা কোনো সাধারণ ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে ছড়ানো উসকানিমূলক পোস্টগুলোর মূল সোর্স মুহূর্তের মধ্যে চিহ্নিত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই আইডিগুলো ব্লক করবে। পুলিশ সদস্যদের সাইবার ফুটপ্রিন্ট মনিটরিং করা হচ্ছে। চেইন অব কমান্ড ধ্বংসের উদ্দেশ্যে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ছদ্মনামে বা নিজস্ব ফেসবুক পেজে উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য ছুড়ছেন, তাদের চিহ্নিত করতে একটি ‘ইন্টারনাল সাইবার ভিজিল্যান্স টিম’ গঠন করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে অপরাধীদের অর্থায়ন এবং সাইবার প্রোপাগান্ডা বুস্ট করার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) বা হুন্ডির মাধ্যমে যে অর্থ লেনদেন হচ্ছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সহায়তায় রিয়েল-টাইম ট্র্যাক করা হচ্ছে। গুজব প্রতিরোধে ডার্ক ওয়েব ও মেসেজিং অ্যাপে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ক্লোজড গ্রুপের (টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও ডার্ক ওয়েব পোর্টাল) ওপর সাইবার গোয়েন্দা নজরদারি এতটাই জোরদার করা হয়েছে, যেন সহিংসতা ঘটার আগেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করা যায়।

এ ছাড়া কৃত্রিমভাবে জনমনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পরিচালিত ফেক আইডি ও বট নেটওয়ার্কগুলো শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে মেটা ও এক্সের বৈশ্বিক নিরাপত্তা টিমের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে ‘ভয়ংকর’ সত্য। সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ের পুলিশের এই নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা নয়, এটি বর্তমান সরকারকে চরম বেকায়দায় ফেলার এক সূক্ষ্ম অন্তর্ঘাতমূলক কৌশল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি বিশাল অংশই বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত। তাদের নেপথ্য রাজনৈতিক চরিত্র, আদর্শ ও অতীত ব্যাকগ্রাউন্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, তারা মূলত নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘ছাত্রলীগ’ বা তৎকালীন সমমনা রাজনৈতিক দলের কট্টর ক্যাডার বাহিনী। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও এই ‘দলকানা’ পুলিশ সদস্যরা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবস্থান করছেন এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত অপরাধগুলোর পেছনে পরোক্ষভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছেন।

কোথাও অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে, কোথাও মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে, আবার কোথাও জেনেবুঝে ঘটনাস্থলে দেরিতে পৌঁছে অপরাধীদের একপ্রকার অভয় ও প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, যাতে সরকারের ইমেজ জনগণের সামনে ধূলিসাৎ হয়। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিচালক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এ ব্যাপারে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই অন্তর্ঘাত রুখতে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও দায়িত্বে অবহেলাকারীদের জন্য পুলিশ বাহিনীতে কোনো জায়গা নেই।

এরই মধ্যে দায়িত্বে চরম অবহেলা ও কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে একাধিক শীর্ষ ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, সাময়িক বরখাস্ত এবং সরাসরি চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রমাণ মিললে আগামীতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপির ভেতরও ফ্যাসিবাদীদের একটি গ্রুপ ঢুকে পড়েছে।

মূলত তারা পেশাদার অপরাধী বা সুবিধাবাদী। রাজনীতি বা দল তাদের কাছ একটি ছাতা বা ঢাল মাত্র। এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ আছে। তারাও কৌশলে গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, অপকীর্তি এবং নানা ধরনের নীলনকশা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন। অন্যদিকে বিরোধীশিবিরের দলগুলো সরকারের তীব্র সমালোচনা করছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও অপচেষ্টা রুখতে সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলমত-নির্বিশেষে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই; অপরাধী অপরাধীই।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এনাম আবেদীন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অপরাধ এখন আর কেবল সামাজিক বিচ্যুতির অংশ নয়; বরং একে কৌশলগত হাতিয়ার বা অপ্রতিসম যুদ্ধের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অদৃশ্য ও ভয়ংকর জাল ভাঙতে হলে কেবল সাধারণ পুলিশিং নয়, প্রয়োজন গভীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাইবার-আর্থিক অপরাধের নিখুঁত তদন্ত, প্রশাসনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের সমূলে উৎপাটন এবং জনগণের সচেতন প্রতিরোধ।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের কিছু কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে অতীতে নানা রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন বা ফ্যাসিবাদী আচরণে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে বাহিনীর ভেতরে এবং বাইরে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

এই পরিস্থিতিও আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ ঠিক রাখার পক্ষে উপযুক্ত নয়। সাবেক ডিআইজি আজিজুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অপরাধের বিস্তার, প্রশাসনের ভেতরে সাবেক সরকারের সুবিধাভোগীদের অবস্থান এবং বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালনে অনীহার অভিযোগ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা।

ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সুবিধাভোগী একটি অংশ এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয়। তাদের কেউ কেউ বর্তমান সরকারকে বিব্রত করা, জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ানো এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা তৈরির রাজনৈতিক কৌশলে ভূমিকা রাখছেন বলে তিনি মনে করেন। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অপরাধের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র যাচাই করা জরুরি।

কারণ, অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্য নির্ধারণে প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্য, অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। এই তদন্তেই বেরিয়ে আসবে তাদের দৈনন্দিন কাজের আড়ালে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সরকারকে চাপে ফেলা, প্রশাসনের দুর্বলতা সামনে আনা এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে কি না।

তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবের সুবিধা পাওয়া কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অনীহা দেখাচ্ছেন, আবার কারো ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাদের চিহ্নিত করা জরুরি। কেননা, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও সমন্বয়হীনতা অপরাধীদের সুযোগ করে দিতে পারে। আর সেই সুযোগ যদি কেউ পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগায়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনআস্থার জন্যও বড় হুমকি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নওগাঁয় বাবার সঙ্গে মাঠে গিয়ে পাওয়ার টিলারের নিচে চাপা পড়ে ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু

নিরাপত্তার দেয়ালে ষড়যন্ত্রের ফাটল

Update Time : 01:53:53 am, Wednesday, 14 October 2026

দেশজুড়ে হঠাৎ করেই খুন, ডাকাতি, অস্থিরতা ও বিভিন্ন সংঘাত বেড়েছে। আপাতদৃষ্টে একে সাধারণ অপরাধের বিস্তার মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে ভিন্ন এক ভয়ংকর সমীকরণ। অপরাধবিজ্ঞানী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত করছে, দেশকে অস্থিতিশীল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নড়বড়ে প্রমাণ করতে পর্দার আড়াল থেকে সক্রিয় রয়েছে পুলিশের একটি অংশসহ বিশেষ কোনো রাজনৈতিক মহল।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার খেলা চলছে মাঠপর্যায়ে। দ্রুত এই চক্রকে সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। পুলিশের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই গভীর ষড়যন্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মাঠপর্যায়ের পুলিশের একটি বড় অংশের রহস্যজনক ‘নিষ্ক্রিয়তা’ এবং প্রকাশ্য অন্তর্ঘাত।

বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একদিকে মাঠে অপরাধীদের আশকারা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশের অফিসিয়াল শৃঙ্খলা ভেঙে খোদ পুলিশ সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন। সরকার এই চরম অপেশাদার আচরণ ও অন্তর্ঘাতের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে চাকরিচ্যুতি এবং মামলার মতো শুদ্ধি অভিযান শুরু করলেও অসৎ চক্রের অপতৎপরতা থেমে নেই।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসআরবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের পাশাপাশি এবার কঠোর অ্যাকশনে নেমেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সবার সমন্বিত পরিকল্পনায় ক্র্যাকডাউন এবং অ্যাকশন অভিযান চলছে। পর্দার আড়ালের মূল মাস্টারমাইন্ড এবং কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে দাগী অপরাধীদের আশ্রয়দাতাদের তালিকা ধরে কাজ করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার যেকোনো অপচেষ্টা সমূলে উৎপাটন করা হবে। দেশজুড়ে চলছে বিশেষ ‘কম্বিং অপারেশন’ বা চিরুনি অভিযান। একই সঙ্গে সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও অস্ত্র-তহবিলের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কৃত্রিম আতঙ্ক ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, তা রুখতে তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার ক্রাইম বিভাগ সম্পূর্ণ নতুন এবং আক্রমণাত্মক কৌশলগত কয়েকটি অ্যাকশন প্ল্যান করে কাজ শুরু করেছে।

সাইবার ক্রাইম ইউনিট একটি বিশেষ অ্যালগরিদম চালু করেছে, যা ‘আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে’ বা কোনো সাধারণ ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে ছড়ানো উসকানিমূলক পোস্টগুলোর মূল সোর্স মুহূর্তের মধ্যে চিহ্নিত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই আইডিগুলো ব্লক করবে। পুলিশ সদস্যদের সাইবার ফুটপ্রিন্ট মনিটরিং করা হচ্ছে। চেইন অব কমান্ড ধ্বংসের উদ্দেশ্যে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ছদ্মনামে বা নিজস্ব ফেসবুক পেজে উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য ছুড়ছেন, তাদের চিহ্নিত করতে একটি ‘ইন্টারনাল সাইবার ভিজিল্যান্স টিম’ গঠন করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে অপরাধীদের অর্থায়ন এবং সাইবার প্রোপাগান্ডা বুস্ট করার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) বা হুন্ডির মাধ্যমে যে অর্থ লেনদেন হচ্ছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সহায়তায় রিয়েল-টাইম ট্র্যাক করা হচ্ছে। গুজব প্রতিরোধে ডার্ক ওয়েব ও মেসেজিং অ্যাপে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ক্লোজড গ্রুপের (টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও ডার্ক ওয়েব পোর্টাল) ওপর সাইবার গোয়েন্দা নজরদারি এতটাই জোরদার করা হয়েছে, যেন সহিংসতা ঘটার আগেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করা যায়।

এ ছাড়া কৃত্রিমভাবে জনমনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পরিচালিত ফেক আইডি ও বট নেটওয়ার্কগুলো শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে মেটা ও এক্সের বৈশ্বিক নিরাপত্তা টিমের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে ‘ভয়ংকর’ সত্য। সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ের পুলিশের এই নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা নয়, এটি বর্তমান সরকারকে চরম বেকায়দায় ফেলার এক সূক্ষ্ম অন্তর্ঘাতমূলক কৌশল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি বিশাল অংশই বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত। তাদের নেপথ্য রাজনৈতিক চরিত্র, আদর্শ ও অতীত ব্যাকগ্রাউন্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, তারা মূলত নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘ছাত্রলীগ’ বা তৎকালীন সমমনা রাজনৈতিক দলের কট্টর ক্যাডার বাহিনী। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও এই ‘দলকানা’ পুলিশ সদস্যরা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবস্থান করছেন এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত অপরাধগুলোর পেছনে পরোক্ষভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছেন।

কোথাও অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে, কোথাও মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে, আবার কোথাও জেনেবুঝে ঘটনাস্থলে দেরিতে পৌঁছে অপরাধীদের একপ্রকার অভয় ও প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, যাতে সরকারের ইমেজ জনগণের সামনে ধূলিসাৎ হয়। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিচালক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এ ব্যাপারে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই অন্তর্ঘাত রুখতে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও দায়িত্বে অবহেলাকারীদের জন্য পুলিশ বাহিনীতে কোনো জায়গা নেই।

এরই মধ্যে দায়িত্বে চরম অবহেলা ও কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে একাধিক শীর্ষ ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, সাময়িক বরখাস্ত এবং সরাসরি চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রমাণ মিললে আগামীতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপির ভেতরও ফ্যাসিবাদীদের একটি গ্রুপ ঢুকে পড়েছে।

মূলত তারা পেশাদার অপরাধী বা সুবিধাবাদী। রাজনীতি বা দল তাদের কাছ একটি ছাতা বা ঢাল মাত্র। এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ আছে। তারাও কৌশলে গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, অপকীর্তি এবং নানা ধরনের নীলনকশা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন। অন্যদিকে বিরোধীশিবিরের দলগুলো সরকারের তীব্র সমালোচনা করছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও অপচেষ্টা রুখতে সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলমত-নির্বিশেষে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই; অপরাধী অপরাধীই।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এনাম আবেদীন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অপরাধ এখন আর কেবল সামাজিক বিচ্যুতির অংশ নয়; বরং একে কৌশলগত হাতিয়ার বা অপ্রতিসম যুদ্ধের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অদৃশ্য ও ভয়ংকর জাল ভাঙতে হলে কেবল সাধারণ পুলিশিং নয়, প্রয়োজন গভীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাইবার-আর্থিক অপরাধের নিখুঁত তদন্ত, প্রশাসনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের সমূলে উৎপাটন এবং জনগণের সচেতন প্রতিরোধ।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের কিছু কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে অতীতে নানা রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন বা ফ্যাসিবাদী আচরণে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে বাহিনীর ভেতরে এবং বাইরে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

এই পরিস্থিতিও আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ ঠিক রাখার পক্ষে উপযুক্ত নয়। সাবেক ডিআইজি আজিজুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অপরাধের বিস্তার, প্রশাসনের ভেতরে সাবেক সরকারের সুবিধাভোগীদের অবস্থান এবং বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালনে অনীহার অভিযোগ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা।

ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সুবিধাভোগী একটি অংশ এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয়। তাদের কেউ কেউ বর্তমান সরকারকে বিব্রত করা, জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ানো এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা তৈরির রাজনৈতিক কৌশলে ভূমিকা রাখছেন বলে তিনি মনে করেন। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অপরাধের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র যাচাই করা জরুরি।

কারণ, অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্য নির্ধারণে প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্য, অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। এই তদন্তেই বেরিয়ে আসবে তাদের দৈনন্দিন কাজের আড়ালে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সরকারকে চাপে ফেলা, প্রশাসনের দুর্বলতা সামনে আনা এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে কি না।

তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবের সুবিধা পাওয়া কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অনীহা দেখাচ্ছেন, আবার কারো ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাদের চিহ্নিত করা জরুরি। কেননা, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও সমন্বয়হীনতা অপরাধীদের সুযোগ করে দিতে পারে। আর সেই সুযোগ যদি কেউ পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগায়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনআস্থার জন্যও বড় হুমকি।