বিশ্বে জ্বালানি তেলের মজুত কমে আসছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কোনো সংকট দেখা দিলে বিশ্ব অর্থনীতি তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
গতকাল মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ বার্ষিক সভায় প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এমন সতর্কবার্তা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবে সামাল দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। তবে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবহৃত জরুরি মজুত ও নীতিগত সুযোগ এখন অনেকটাই কমে এসেছে।
আইএমএফের মতে, হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে তেল সরবরাহ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত থেকে তেল বাজারে ছাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত প্রস্তুতি পুনর্গঠন করা জরুরি।
তা না হলে নতুন সংঘাত বা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে। ব্যাংককে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় আইএমএফের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিলভানা তেনরেইরো বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেখাচ্ছে, তবে সেই সক্ষমতা ক্রমে সীমিত হয়ে আসছে। তার মতে, নীতিনির্ধারকদের চলমান সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য অর্থনীতির ভিত্তিও শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি সরকারগুলোকে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নিতে আর দেরি না করার আহ্বান জানান। তার মতে, সংকট মোকাবিলার উপায় ও সরঞ্জাম সরকারের হাতে রয়েছে; এখন সেগুলো বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহারের সময়। আইএমএফের আশঙ্কা, অনেক দেশের ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি বা খাদ্যের দাম আবার বাড়লে সাধারণ ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে সরকারগুলোর হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না-ও থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতিতে এগোতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে; অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কমছে আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে— একসঙ্গে দুটি চাপই সামনে এসেছে।
আইএমএফের অর্থায়ন নিয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাসই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত— এমন ধারণা ভুল বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নিয়ে সরকার চিন্তিত নয়। গতকাল ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক গতিপথ, নীতি ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের ঐকমত্য হয়েছে।
স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি— সব ক্ষেত্রেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে একমত। এসব বিষয় বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গেও পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। একই দিন সকালে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আইএমএফের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক উর্জিত প্যাটেলের সঙ্গে বৈঠক করে।
বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা রিয়ার্ডের সঙ্গেও বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে দেশের জ্বালানি খাতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা বাড়াতে চায় বলে জানান অর্থমন্ত্রী। সংস্থাটির সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পাশাপাশি ভবিষ্যতে সহযোগিতার অগ্রাধিকার ও ক্ষেত্র নির্ধারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তাই নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে মতপার্থক্য বা অমিল থাকতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রসঙ্গত, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এই অর্থ গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এলএনজি আমদানির ভর্তুকি হিসাবে ব্যয় হওয়া ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ।
আর গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর জন্য প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও শেষ পর্যন্ত এর ব্যয় প্রায় আড়াই গুণ বেশি হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকিতে সরকারের কোষাগারে চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও এলএনজির জন্য ভর্তুকির মোট ৪২ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে প্রথম তিন মাসেই প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে জ্বালানি বিভাগ; যা পুরো অর্থবছরের বরাদ্দের প্রায় ৪৫ শতাংশ।
তাই জ্বালানি তেল, গ্যাস বা বিদ্যুতের বাড়তি দামের বোঝা গ্রাহকদের জন্য চাপ হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরকারকে সরবরাহ ঠিক রাখতে আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরবরাহ সংকট ও স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতার কারণে রাষ্ট্রের আর্থিক দায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি করা এলএনজির গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রতি ঘনমিটারে ৪৬ টাকা ৪০ পয়সা।
বিপরীতে একই সময়ে দেশে গ্যাস বিক্রির গড় মূল্য ছিল ২৩ টাকা ৮০ পয়সা; অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটার এলএনজিভিত্তিক গ্যাসে গড়ে ২২ টাকা ৫০ পয়সার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে; যা শেষ পর্যন্ত ভর্তুকির মাধ্যমে সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।





















