বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে, কৃষকের জীবন-জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাস্তবায়িত হচ্ছে ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিসট্যান্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)।
প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের আধুনিক ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষিপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ, কৃষিযন্ত্র সরবরাহ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ফসলের বহুমুখীকরণে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। প্রকল্পের আওতায় কৃষকেরা ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে বিভিন্ন ধরনের কৃষিযন্ত্র কিনতে পারছেন। প্রকল্প পরিচালকের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নয়টি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
প্রায় ৭২ লাখ মানুষ এবং দেশের মোট ভূখণ্ডের ১০ শতাংশ এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলায় কৃষি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণসহায়তা ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৬৫টি উপজেলায় প্রকল্পের কৃষি উপাদান বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আওতায় প্রায় দেড় লাখ কৃষককে ৪ হাজার ৯৫০টি দলের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: প্রকল্পের আওতায় বন্যা-সহনশীল, স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল ধানের জাত চাষ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষিপ্রযুক্তি, শস্য বহুমুখীকরণ এবং সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি ভাসমান বেডে সবজি চাষ, বিনা চাষে রসুন উৎপাদন, কমিউনিটি গার্ডেনিং ও ভার্মিকম্পোস্ট সার তৈরির মতো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষিযন্ত্র: হাওরাঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের সংকট এবং স্বল্প সময়ে বোরো ধান রোপণ ও কাটার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে।
এসব যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, ট্রাক্টর, গার্ডেন টিলার, পাওয়ার থ্রেসার ও ড্রায়ার। প্রকল্প পরিচালকের দাবি, কৃষিযন্ত্র বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার ৮০ শতাংশ ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে ট্রাক্টর বিতরণ এ কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। এতে কৃষিযন্ত্র কেনার ব্যয় কমার পাশাপাশি জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও ফসল কাটার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে আবহাওয়া ও বন্যার ঝুঁকির কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা: অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনা এবং পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্পের মাধ্যমে লো-লিফট পাম্প (এলএলপি), থ্রেড পাইপ, বারিড পাইপ এবং সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা ব্যবহার করে কৃষকেরা প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জমিতে পানি দিতে পারছেন।
ফসলের বহুমুখীকরণ এবং স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণের ফলে প্রকল্প এলাকায় ফসলের নিবিড়তা ১৭৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭৬ শতাংশ হয়েছে বলে প্রকল্প পরিচালকের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে চাষাবাদ: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার কৃষক সালাম ইসলাম রুপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বন্যায় যখন সব ফসল ভেসে গেল, ভেবেছিলাম আর কোনো উপায় নেই।
ফ্রিপ প্রকল্পের বীজ ও সার পেয়ে আবার মাঠে নামতে পেরেছি। ’ সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার কৃষক ছুরুক তালুকদারও প্রকল্পের প্রযুক্তিগত সহায়তা কাজে লাগিয়েছেন। বন্যাকালীন পরিস্থিতিতে আউশ মৌসুমে ব্রি ধান-৯৮-এর চারা উৎপাদনের জন্য প্রকল্প থেকে পাওয়া ৫০০টি ট্রে ব্যবহার করেন তিনি। প্রকল্প পরিচালক ড. তৌফিকুর রহমান রুপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রকল্পের কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে।
যা হাওড় এলাকার কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন ঘটবে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আকস্মিক বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল ধরে রাখতে কৃষিযন্ত্রের যথাযথ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ, সেচব্যবস্থার স্থায়িত্ব, প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা এবং কৃষকদের বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।






















