গ্ল্যামার, লাইমলাইট আর কোটি ভক্তের করতালির মাঝেও মানুষের মন অনেক সময় খোঁজে এক অন্যরকম প্রশান্তি। অর্থ, নাম-যশ সবকিছুকে তুচ্ছ করে অতীতে অনেক তারকাই পা বাড়িয়েছেন আধ্যাত্মিক জীবনের পথে।
দেশের বিনোদন জগতেও এমন বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পী আছেন, যারা ক্যারিয়ারের সুবর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে কিংবা তারকাখ্যাতির চূড়ায় থেকেও শোবিজকে বিদায় জানিয়ে স্থায়ীভাবে ইসলাম ধর্মচর্চায় নিজেদের সঁপে দিয়েছেন। তারকাদের জীবনের সেই বড় পরিবর্তনের গল্প নিয়ে লিখেছেন রুহুল আমিন ভূঁইয়া শাবানা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘ঢালিউড কুইন’খ্যাত অভিনেত্রী শাবানা।
প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢালিউড শাসন করা এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী ১৯৯৭ সালে হঠাৎ করেই চলচ্চিত্র জগৎ থেকে দূরে সরে যান। পরবর্তীতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে পর্দার সেই জমকালো শাবানাকে আর দেখা যায় না; তিনি এখন সম্পূর্ণ হিজাবাবৃত হয়ে ইবাদত-বন্দেগি ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে নিভৃত জীবন পার করছেন।
শোবিজের কারো সঙ্গেই এখন আর তার সেভাবে যোগাযোগ নেই। চাইলেও কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না। এ অঙ্গন থেকে নিজেকে পুরোপুরি দূরে রেখেছেন শাবানা। সুজানা জাফর এক সময়ের জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী সুজানা জাফর। দীর্ঘ ১৬ বছরের রঙিন ক্যারিয়ারে অসংখ্য নাটক ও মিউজিক ভিডিওতে সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। তবে ২০২০ সালে করোনাকালীন লকডাউনের সময়ে নিয়মিত কোরআন-হাদিস পড়ার পর তার জীবনের ভাবনায় আমূল পরিবর্তন আসে।
তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শোবিজ ছাড়ার ঘোষণা দেন এবং বর্তমানে দুবাইতে নিজের বুটিকস ব্যবসার পাশাপাশি ধর্মীয় নিয়মে হিজাব পরে দিন কাটাচ্ছেন। অ্যানি খান ছোট পর্দার অত্যন্ত পরিচিত এবং ব্যস্ত অভিনেত্রী ও উপস্থাপিকা ছিলেন অ্যানি খান। ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে এক ফেসবুক লাইভে এসে তিনি মিডিয়া জগৎ চিরতরে ছাড়ার ঘোষণা দেন। অ্যানি খান জানিয়েছিলেন যে, মৃত্যুর পর নিজের জীবনের হিসাব স্রষ্টার কাছে দিতে হবেÑ এই ব্যক্তিগত আত্মোপলব্ধি থেকেই তিনি শোবিজ ছেড়েছেন।
এরপর থেকে তিনি নিজেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, পর্দা এবং পুরোপুরি ধর্মীয় জীবনযাপনে ব্যস্ত রেখেছেন। শোবিজ থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী। এখন সামাজিক মাধ্যমেও নেই তিনি। সম্পূর্ণ দ্বীনের পথে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন এক সময়ের ব্যস্ত এই অভিনেত্রী। আমব্রিনা সার্জিন আমব্রিন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)সহ বহু জনপ্রিয় শো-এর গ্ল্যামারাস উপস্থাপিকা ও মডেল আমব্রিনা সার্জিন আমব্রিন।
লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়াতে আসা আমব্রিন একটা দীর্ঘ সময় মাঠ ও পর্দার জনপ্রিয় মুখ ছিলেন। পরবর্তীতে বিয়ের পর কানাডায় প্রবাসী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মিডিয়ার লাইফস্টাইল থেকে দূরে সরে যান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জীবনের আসল মানে খুঁজতে গিয়ে তিনি ইসলামের প্রতি ধাবিত হয়েছেন এবং এখন হিজাব পরে সাধারণ মুসলিম নারী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করছেন।
ঈশিকা খান মিষ্টি হাসির মডেলÑ অভিনেত্রী ঈশিকা খান। বিজ্ঞাপন ও নাটকে যখন তার ক্যারিয়ার তরতরিয়ে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই (২০১৬ সালে) বিয়ে করে লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি। পরবর্তীতে বলিউডের জাইরা ওয়াসিমের শোবিজ ত্যাগের মতো করেই ইশিকাও ঘোষণা দেন যে, তিনি আর কখনো অভিনয় জগতে ফিরবেন না। ইসলামের নিয়ম মেনে পর্দা করা এবং সন্তান ও পরিবারকে দ্বীনের আলোয় বড় করাই এখন তার জীবনের মূল ব্রত।
তামিম মৃধা তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় অভিনেতা, গায়ক এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর তামিম মৃধা। দীর্ঘদিন নাটক ও ডিজিটাল মাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করার পর, ২০২৫ সালের শুরুতে তার ভাইয়ের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের মাধ্যমে তামিমের বিনোদন জগৎ ত্যাগ করে ইসলামের পথে আসার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। শুরুতে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হলেও, তামিম পরবর্তীতে দ্বীনি জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে শোবিজের মূলধারার কাজ থেকে দূরে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
নাজনীন আক্তার হ্যাপি ক্রিকেট কেন্দ্রিক এক বড় বিতর্কের পর ঢালিউড অভিনেত্রী নাজনীন আক্তার হ্যাপির জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। চলচ্চিত্রে অল্প সময়ের ক্যারিয়ারের ইতি টেনে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ ইসলামিক জীবনধারায় নিয়ে যান। সমস্ত পুরোনো পরিচয় মুছে ফেলে তিনি এখন পুরোপুরি নিকাব (পর্দা) পরিধান করেন, নাম পরিবর্তন করেছেন এবং একটি কওমি মাদ্রাসায় ইসলাম ধর্ম শিক্ষা ও তাফসির নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
তার এই অবিশ্বাস্য পরিবর্তন দেশের শোবিজ অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল। লাইমলাইটের ঝলমলে আলো ও চারপাশের করতালির মোহ একসময় মলিন হয়ে যায়। রুপালি পর্দার এই তারকাদের বিনোদন জগৎ থেকে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার গল্পগুলো সাধারণ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মন সবসময় অর্থ বা খ্যাতিতে তৃপ্ত হয় না। আত্মিক শান্তি ও পরকালীন মুক্তির খোঁজে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে নেওয়া এই শিল্পীদের সিদ্ধান্ত যেমনÑ শোবিজ অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি তাদের অনুসারীদেরও জীবন নিয়ে নতুন করে ভাববার খোরাক জুগিয়েছে।




















