১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এ সময়ে খাদ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া এবং দারিদ্র্য হ্রাসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে।
নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। ডিজিটাল সেবা ছড়িয়েছে। অবকাঠামোও বদলেছে। তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। এত সম্ভাবনার দেশটি কেন আরও দ্রুত এগোতে পারছে না? উত্তরটি একক নয়। তবে দুর্নীতি ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান এই ব্যর্থতার অন্যতম বড় কারণ। দুর্নীতি শুধু টাকা চুরি নয়। এটি উন্নয়নের গতি কমায়। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। যোগ্যতার বদলে তদবিরকে শক্তিশালী করে।
সেবাকে অধিকার না বানিয়ে পণ্যে পরিণত করে। সাম্প্রতিক তথ্যও উদ্বেগজনক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪ পেয়েছে। ১৮২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম। বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪২। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক গড়ের অনেক নিচে। এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সূচকের সংখ্যা নয়।
এর পেছনে আছে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। সরকারি সেবা পেতে হয়রানি। কাজ পেতে ঘুষ। ঠিকাদারি কাজে অনিয়ম। নিয়োগে তদবির। জমি ও নিবন্ধন সেবায় দালাল। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের অনিয়ম। সব ক্ষেত্রেই একই চিত্র নয়। কিন্তু সমস্যাটি যে প্রাতিষ্ঠানিক, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলোÑ নিয়মের অভাব নয়।
নিয়মের বাস্তব প্রয়োগের অভাব। দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন আছে। সরকারি ক্রয় আইন আছে। নিরীক্ষা ব্যবস্থা আছে। সংসদীয় নজরদারি আছে। আদালত আছে। তথ্য অধিকার আইন আছে। ডিজিটাল সরকারি সেবাও বাড়ছে। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো জবাবদিহির দুর্বলতা। নিয়ম ভাঙার পরিণতি অনেক সময় নিশ্চিত নয়। শাস্তির ভয় কমে গেলে আইন কাগজে থাকে। তখন দুর্নীতি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
সরকারি ক্রয় খাতের একটি বড় উদাহরণ। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় অস্বচ্ছতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এখানে একটি সেতু নির্মাণের কথা ভাবা যাক। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ল। সময় বাড়ল। জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হলো। নির্মাণে নি¤œমানের উপকরণ ব্যবহৃত হলো।
ঠিকাদার লাভ করল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের টাকা দিয়েই সেই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হলো। দুর্নীতির আসল ক্ষতি এখানেই। ঘুষের এক হাজার টাকা শুধু এক হাজার টাকার ক্ষতি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সময়ের অপচয়। সেবার মান কমে। বিনিয়োগের খরচ বাড়ে। মানুষের আস্থা কমে। যোগ্য মানুষ পিছিয়ে পড়ে। একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশে উল্টো প্রবণতা বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়। ব্যক্তি বদলায়। সরকার বদলায়। কর্মকর্তা বদলায়। কিন্তু দুর্নীতির সুযোগগুলো থেকে যায়। কারণ সমস্যার শিকড় ব্যক্তিতে নয়, ব্যবস্থায়। দুর্নীতি দমনের জন্য একজন সৎ কর্মকর্তাকে পাঠালেই হবে না। তাকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দিতে হবে। স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তার সিদ্ধান্তের সুরক্ষা দিতে হবে।
একই সঙ্গে তার কাজেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যদি প্রতিষ্ঠানই দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। বাংলাদেশের সামনে অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ আছে। মালয়েশিয়া ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকারÑ মালয়েশিয়াকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘উন্নত দেশ’ বলা হয় না; এটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতি।
তবু শিল্পায়ন, অবকাঠামো, রপ্তানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশটি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি বর্তমান মূল্যে বাংলাদেশের প্রায় ২,৫৯৭ ডলার। মালয়েশিয়ায় তা প্রায় ১৩,১২৫ ডলার। অর্থাৎ ব্যবধান পাঁচ গুণের কাছাকাছি। এই ব্যবধান আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। প্রশ্নটি শুধু কে কত টাকা আয় করে, তা নয়।
প্রশ্ন হলোÑ কেন একটি দেশ তার সম্ভাবনাকে অন্য দেশের তুলনায় দ্রুত কাজে লাগাতে পারে? উত্তরের একটি অংশ হলো, প্রতিষ্ঠান। আরেকটি অংশ হলো, সুশাসন। বাংলাদেশে দুর্নীতি কমাতে তাই শুধু অভিযান চালালে হবে না। ব্যবস্থা বদলাতে হবে। প্রথম কাজ হতে পারে সরকারি সেবাকে যতটা সম্ভব স্বয়ংক্রিয় করা। যেখানে নাগরিকের সঙ্গে কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ কমবে, সেখানে ঘুষের সুযোগও কমবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ক্রয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কে দরপত্র দিল? কে কাজ পেল? কত টাকায় পেল? কাজের মান কী? কত টাকা পরিশোধ হলো? সব তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশে সরকারি ক্রয়ে ই-জিপি, প্রকৃত মালিকানার তথ্য প্রকাশ এবং প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মতো সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তৃতীয়ত, সম্পদের হিসাব কার্যকর করতে হবে।
শুধু ঘোষণা নিলে হবে না। তথ্য যাচাই করতে হবে। অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তদন্ত করতে হবে। চতুর্থত, দুর্নীতির মামলার বিচার দ্রুত করতে হবে। দীর্ঘসূত্রতা দুর্নীতিবাজের জন্য আশীর্বাদ। বিচার যত দীর্ঘ হয়, মানুষের আস্থা তত কমে। পঞ্চমত, নিয়োগ ও পদায়নে যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একজন অযোগ্য মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোও এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি।
কারণ এর ক্ষতি বহু মানুষের ওপর পড়ে। ষষ্ঠত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান হতে হবে দলনিরপেক্ষ। দুর্নীতিবাজের পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের ভিত্তি। সপ্তমত, হুইসেলব্লোয়ার বা দুর্নীতির তথ্যদাতাদের সুরক্ষা দিতে হবে। মানুষ যেন ভয় ছাড়াই অনিয়মের তথ্য দিতে পারে। অষ্টমত, রাষ্ট্রের নিরীক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের একটি প্রকল্পে বাংলাদেশের নিরীক্ষা প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির সময় ৭২ মাস থেকে ৯ মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এগুলো শুধু সংস্কারের কথা নয়। এগুলো উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কারণ দুর্নীতি কমলে একই টাকা দিয়ে বেশি কাজ করা যায়। একই প্রকল্পে বেশি মানুষ উপকৃত হয়। বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ে।
ব্যবসার খরচ কমে। কর্মসংস্থান বাড়ে। রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, নাগরিকের মনে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস তৈরি হয়। বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ। তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার আছে। উদ্যোক্তা আছে। প্রবাসী আয় আছে। পোশাকশিল্প আছে। কৃষিতে সক্ষমতা আছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সম্ভাবনা নিজে উন্নয়ন তৈরি করে না।
সুশাসন সম্ভাবনাকে ফলে পরিণত করে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে কোনো সরকারের একক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি রাষ্ট্র সংস্কারের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু দুর্নীতিবাজ ধরা নয়। এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে দুর্নীতি করা কঠিন হবে। ধরা পড়া নিশ্চিত হবে। শাস্তি দ্রুত হবে। আর সৎ থাকা হবে নিরাপদ ও সম্মানজনক।
বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হলে নতুন নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন প্রতিষ্ঠান দরকার। বড় বড় ভবনের পাশাপাশি শক্তিশালী জবাবদিহি দরকার। আইন করার পাশাপাশি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দরকার। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর আমাদের সামনে তাই মূল প্রশ্ন একটাইÑ আমরা কি দুর্নীতির সঙ্গে আপস করব, নাকি দুর্নীতির দুষ্টচক্র ভাঙব? উত্তরটি শুধু সরকারের নয়।
উত্তরটি রাষ্ট্রের। উত্তরটি সমাজের। উত্তরটি আমাদের সবার। বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ বন্ধ নয়। পথের সামনে বড় বাধা আছে। সেই বাধার নাম দুর্নীতি। তার প্রতিষেধকও আমাদের জানা। স্বচ্ছতা। জবাবদিহি। আইনের শাসন। যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই পাঁচ শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে দুর্নীতির জাল ছিন্ন করা সম্ভব। তখন উন্নয়ন শুধু পরিসংখ্যানের পাতায় থাকবে না।
তার সুফল পৌঁছাবে মানুষের ঘরে ঘরে। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন পূরণে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলোÑ রাষ্ট্রকে দুর্নীতির গ্রাস থেকে মুক্ত করা। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশই হতে পারে উন্নত বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।






















