বাংলা চলচ্চিত্রের অ্যাকশন ধারার অকুতোভয় প্রবর্তক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত অভিনেতা আবুল খায়ের জসিম উদ্দিনের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। চলচ্চিত্রে তিনি জসিম নামেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের আজকের দিনে আকস্মিক মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ঢালিউডের এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব।
তার চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ ২৮টি বছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকাই সিনেমার অ্যাকশন কিং হিসেবে তার শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। ১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জে জন্ম নেওয়া জসিম শুধু রুপালি জগতেরই নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশের এক সূর্যসন্তান। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে মেজর এটিএম হায়দারের অধীনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন তিনি।
দেশ স্বাধীন করার পর ১৯৭২ সালে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দেবর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন জসিম। তবে তিনি আলোচনায় আসেন ১৯৭৩ সালের ব্লকবাস্টার ‘রংবাজ’ এবং পরবর্তীতে বলিউডের ‘শোলে’ সিনেমার অফিশিয়াল রিমেক ‘দোস্ত দুশমন’ চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন।
সেই সিনেমাতে মূল চরিত্রের ‘গব্বর সিং’-এর আদলে তার অভিনয় আজও ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা খল-অভিনয়ের মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়। বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়ক হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তার চূড়ায় থাকা অবস্থায় দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ‘সবুজ সাথী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। খলনায়ক থেকে ইতিবাচক প্রধান চরিত্রে এসে এমন অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ার নজির ঢালিউডে বিরল।
জসিম তার অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সমাজের বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের প্রতিচ্ছবি। পর্দায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার গগনবিদারী চিৎকার আর অ্যাকশন স্টাইল সাধারণ দর্শকদের হলমুখী করত। ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘ভাইজান’, ‘লাড্ডু মাস্তান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘পরিবার’ কিংবা ‘স্বামী কেন আসামি’র মতো একের পর এক সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন প্রযোজকদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাম।
ঢাকাই চলচ্চিত্রে ফাইটিং বা মারপিটের দৃশ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া এনেছিলেন জসিম নিজেই। তিনি নিজেই ছিলেন একজন দক্ষ ফাইট ডিরেক্টর। চলচ্চিত্রের অ্যাকশনকে বিশ্বমানের করতে তিনি এফডিসিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘জেমস ফাইট গ্রুপ’। চলচ্চিত্রে তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে তাদের একটি শুটিং ফ্লোরের নামকরণ করেছে ‘মুক্তিযোদ্ধা চিত্রনায়ক জসিম ফ্লোর’।
পারিবারিক জীবনে জসিম প্রথম বিয়ে করেছিলেন চিত্রনায়িকা সুচরিতাকে, তবে পরবর্তীতে তাদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর তিনি বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর অন্যতম অভিনেত্রী পূর্ণিমা সেনগুপ্তার কন্যা নাসরিনকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ঘরে রয়েছে তিন পুত্রসন্তান। তার এক সন্তান রাতুল গত বছর মারা গেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজ জসিমের মৃত্যুবার্ষিকীতে চলচ্চিত্র অঙ্গনের সংগঠনগুলো নেই কোনো আয়োজন।
নীরবেই কাটবে এই অভিনেতার প্রয়াণ দিন। বাংলা চলচ্চিত্র যতদিন থাকবে, ‘অ্যাকশন কিং’ জসিমের নাম সিনোপ্রেমীদের হৃদয়ে ততদিন অম্লান হয়ে থাকবে।





















