রাত তখন গভীর। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের আকাশে একের পর এক সাইরেন বাজছিল। ঘুম ভেঙে আতঙ্কে ঘর ছাড়তে শুরু করে বাসিন্দারা। কেউ ছুটে যায় ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনে, কেউ আশ্রয় নেয় অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে।
এরপরই শুরু হয় বিস্ফোরণের শব্দ। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হানতে থাকে রাজধানীসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে। বুধবার, ৭ অক্টোবর রাতভর চালানো রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তিন শিশুসহ অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও বহু মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাসিক ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা।
ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্র দেখা গেছে উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকি শহরে। সেখানে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ভবনের কয়েকটি অংশ ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে বাসিন্দারা। পরে উদ্ধারকর্মীরা মই ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি শুরু করেন। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে তিন শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ৪০ জন। তাদের মধ্যে কয়েকজন শিশুও রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ আটকা পড়ে থাকতে পারেÑ এ আশঙ্কায় দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধারকাজ চালানো হয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ হামলাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, রাতের হামলায় প্রায় ৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যার অনেকগুলোই ছিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
জ্বালানি অবকাঠামো ছিল রাশিয়ার হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিয়েভেও বিস্ফোরণ : প্রিলুকির পাশাপাশি রাজধানী কিয়েভেও রাতভর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। কিয়েভের বিভিন্ন এলাকায় আগুন ও ধোঁয়া দেখা যায়। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর দারনিতস্কি এলাকায় হামলায় দুজন নিহত হয়েছে। রাতের প্রথম দফা হামলার পর কয়েক ঘণ্টা না যেতেই আবারও শুরু হয় ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বিতীয় ঢেউ।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানায়, রুশ বাহিনী বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ব্যবহার করেছে। কিয়েভের এক বাসিন্দা জানান, হামলার সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন। তার ভাষায়, বহুতল ভবনের ওপরের তলায় বসবাস করায় মাথার ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যাওয়ার শব্দ ছিল অত্যন্ত ভীতিকর।
তাই ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনকেই তুলনামূলক নিরাপদ মনে হয়েছে। শতাধিক ড্রোন প্রতিহত : ইউক্রেনের দাবি, রাতভর রাশিয়া বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ ড্রোন ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ১৩০ রুশ ড্রোনের মধ্যে ১১৭টি ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
৪৮ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ৩৯টি প্রতিহত করার দাবি করেছে তারা। তবে জেলেনস্কির ভাষ্য, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এখনো ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় মার্কিন নির্মিত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করছে কিয়েভ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি জানান।
বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপর্যয় : রুশ হামলার বড় একটি লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার কারণে পাঁচটি অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে আংশিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে হয়েছে। দিনিপ্রো শহরের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জাপোরিঝিয়ার পরিবহন অবকাঠামো এবং ক্রেমেনচুকের কয়েকটি আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিভিন্ন শহরে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে জরুরি তৎপরতা শুরু হয়েছে। হামলার সময় ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধ যেন আবারও নতুন করে ফিরে আসে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে বহুবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে দেশটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার তীব্রতা আবারও বাড়ছে।
পুতিনের জন্মদিনে হামলা : এবারের হামলার সঙ্গে আরেকটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ৭ অক্টোবরই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ৭৪তম জন্মদিন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি কটাক্ষ করে বলেছেন, পুতিনের জন্মদিনে রুশ বাহিনী প্রিলুকির একটি সাধারণ আবাসিক ভবন ধ্বংস করেছে। তবে মস্কোর বক্তব্য ভিন্ন। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা ইউক্রেনের সামরিক ও সামরিক-শিল্প স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে।
তাদের ভাষ্য, স্থল, সমুদ্র ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্পের কয়েকটি কারখানা ও অস্ত্র মজুতকেন্দ্র ছিল হামলার অন্যতম লক্ষ্য। এসব স্থানে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি ও মজুত করা হয় বলে দাবি করেছে মস্কো। রাশিয়ায়ও পাল্টা আঘাত : ইউক্রেনও যে চুপ করে নেই, তার প্রমাণ মিলেছে একই সময়ে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার পার্ম, সামারা ও আস্ত্রাখান অঞ্চলের কয়েকটি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তার দাবি, দুটি তেল শোধনাগার ও একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রসহ চারটি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে বেসামরিক অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলার জবাবে রাশিয়ার জ্বালানি খাতে আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে ইউক্রেন দীর্ঘপাল্লার নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। কিয়েভের দাবি, এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে রাশিয়ার আরও গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। সেতু রক্ষায় নতুন কৌশল : রুশ ড্রোন হামলার তীব্রতা বাড়ায় রাজধানী কিয়েভের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো রক্ষায়ও নতুন ব্যবস্থা নিয়েছে ইউক্রেন। শহরের প্রধান উত্তর সেতুর দুই পাশে বড় আকারের সুরক্ষা জাল বসানোর কাজ শুরু হয়েছে।
ছোট বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ঠেকাতে যুদ্ধক্ষেত্রে এর আগে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে এ ধরনের সুরক্ষা জাল বসানোর ঘটনা এবারই প্রথম। কিয়েভের আটটি প্রধান সড়ক ও রেলসেতু শহরের যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক ড্রোন হামলায় এসব সেতুর আশপাশে যান চলাচল বারবার বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষের শহরটিতে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে।
শহরের মেয়র ভিটালি ক্লিৎসকোও বাসিন্দাদের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধ থামাতে ভারতের প্রস্তাব : এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক উদ্যোগও চলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ভারত তিন দফার যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কিয়েভ সফরের সময় ইউক্রেনের কাছে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি মাটিতে যুদ্ধের তীব্রতা কমেনি। একদিকে রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের শহরগুলোয় প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ, অন্যদিকে রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের পাল্টা হামলাÑ সব মিলিয়ে যুদ্ধ যেন আবারও আরও ভয়ংকর এক অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে।























