সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ তখনও প্রায় ২০ দিন দূরে। তাই মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটে ফিরছিলেন সাভারের জিরানীর একটি পোশাক কারখানার কর্মী আবেদা বেগম (২০)। কিন্তু পথেই হঠাৎ শুরু হয় প্রসববেদনা।
গন্তব্য তখনও অনেক দূর। রাত গভীর। ঢাকাগামী-লালমনিরহাটগামী দূরপাল্লার বাসের অন্য যাত্রীরাও বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি গুরুতর। রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকায় পৌঁছানোর পর চালক বাসের গতি কমিয়ে দেন এবং একটি পেট্রলপাম্পের সামনে থামান। এরপর পুরুষ যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। নারী যাত্রী ও বাসে থাকা এক ধাত্রীর সহযোগিতায় দুটি আসন পাশাপাশি করে তৈরি করা হয় সাময়িক প্রসবের ব্যবস্থা।
কিছুক্ষণ পর সেই বাসের ভেতরেই জন্ম নেয় একটি ছেলে সন্তান। এ শিশু আবেদা বেগমের প্রথম সন্তান। ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার রাত আড়াইটার দিকে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটগামী ‘আনাস এন্টারপ্রাইজ’ বাসে। মা ও নবজাতক দুজনই বর্তমানে সুস্থ আছে। বাসে জন্ম নেওয়া শিশুটির নামও রাখা হয়েছে পরিবহনের নামের সঙ্গে মিলিয়ে—‘আনাস হাসান’।
শিশুটির জন্মের খবর শুনে আনন্দিত হয়েছে পরিবহন কোম্পানিটিও। নবজাতকের জন্য উপহারসামগ্রী পাঠানোর পাশাপাশি তাকে আজীবন ‘আনাস এন্টারপ্রাইজের’ বাসে বিনা মূল্যে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে শিশুটি বড় না হওয়া পর্যন্ত তার মা আবেদা বেগমও এই সুবিধা পাবেন। আবেদা বেগম লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের রমনীগঞ্জ গ্রামের আবেদ আলীর মেয়ে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে সাভারের জিরানী থেকে মা-বাবার সঙ্গে বাসে ওঠেন আবেদা। চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, সন্তান প্রসবের আরও প্রায় ২০ দিন বাকি। তাই বাড়িতে গিয়েই সন্তানের জন্ম হবে বলে ভেবেছিলেন তারা। কিন্তু রাত আড়াইটার দিকে মিঠাপুকুর এলাকায় পৌঁছালে আবেদার প্রসববেদনা শুরু হয়। বিষয়টি জানার পর বাস ধীরগতিতে চালানো হয়।
পরে নিরাপদ স্থানে বাস থামিয়ে পুরুষ যাত্রীদের বাইরে রাখা হয়। নারী যাত্রীদের সহযোগিতায় ধাত্রী প্রসবের ব্যবস্থা করেন। বাসের সুপারভাইজার মজনু মিয়া বলেন, ‘ওই নারীকে দেখে বুঝতে পারি, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তাই বাস থামিয়ে পুরুষ যাত্রীদের বাইরে রেখে নারী যাত্রীদের সহযোগিতায় প্রসবের ব্যবস্থা করা হয়। কিছুক্ষণ পর শিশুটির জন্ম হয়।
’ তিনি জানান, বিষয়টি বাসের মালিক আতিকুর রহমানকে জানানো হলে তিনি মা ও শিশুর জন্য উপহার পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি শিশুটিকে আজীবন এবং তার মা আবেদাকে সন্তান বড় হওয়া পর্যন্ত বাসে বিনা মূল্যে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। বুধবার দুপুরে মালিকের পক্ষ থেকে আবেদাদের বাড়িতে উপহার নিয়ে যান মজনু মিয়া। তিনি শিশুটির জন্য একটি দোলনা, বিছানা, মশারি, সাবান, ক্রিমসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবারের হাতে তুলে দেন।
এ সময় শিশুটিকে দেখতে স্থানীয় লোকজনও বাড়িতে ভিড় করেন। আনাস হাসান এখন শুধু একটি পরিবারের নতুন সদস্য নয়, ‘আনাস এন্টারপ্রাইজ’-এর কাছেও হয়ে উঠেছে বিশেষ এক যাত্রী। আবেদার বাবা আবেদ আলী বলেন, ‘চিকিৎসক বলেছিলেন, আরও ২০ দিন পর সন্তান হবে। তাই মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। কিন্তু বাসেই নাতির জন্ম হলো। এখন মা ও নাতি দুজনই সুস্থ আছে।
’ তিনি বলেন, ‘বাসের নামের সঙ্গে মিল রেখে নাতির নাম আনাস হাসান রেখেছি। বিপদের সময় বাসের চালক, সুপারভাইজার, ধাত্রী ও নারী যাত্রীরা যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, তার জন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। ’ আবদো বেগম বলেন, ‘সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা। কথা ছিল বাবার বাড়িতে সন্তানের জন্ম হবে। তা না হয়ে পথেই জন্ম হলো। আল্লাহপাক যা করেন, তার মধ্যে মঙ্গল আছে।
’ ‘পরিবহনের নামে আমার ছেলের নাম রাখা হয়েছে আনাস হাসান। আমি পরিবহন সংশ্লিষ্ঠ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ।





















