টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার শালবনঘেরা ছোট্ট গারো পল্লী জয়নাগাছা। প্রত্যন্ত এই জনপদ থেকেই জাতীয় কারাতে অঙ্গনে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে গারো কন্যা নাম্বিয়া লুইজি নকরেক। উপজেলা, জেলা ও ঢাকা বিভাগীয় পর্যায়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবার জাতীয় পর্যায়ে কারাতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গর্বের নতুন ইতিহাস গড়েছে সে।
নাম্বিয়ার এই অর্জনের খবরে আনন্দে ভাসছে জয়নাগাছা গারো পল্লী। পরিবারের সদস্য, স্বজন ও স্থানীয়রা তার সাফল্যে উচ্ছ্বসিত। অনেকেই মনে করছেন, নাম্বিয়ার এ অর্জন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো গারো সম্প্রদায়ের জন্য গর্বের বিষয়। বর্তমানে টাঙ্গাইল কালেক্টরেট স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাম্বিয়া। কৃষক মিন্টু দিব্রা ও শুকলা নকরেক দম্পতির ছোট মেয়ে সে।
ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। শারীরিক ফিটনেস ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে কারাতে শেখা শুরু করলেও ধীরে ধীরে খেলাটির প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়। নিয়মিত অনুশীলন ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে জাতীয় পর্যায়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে সক্ষম হয়েছে। নাম্বিয়ার ক্রীড়াজীবনের পেছনে রয়েছে তার বড় বোন নিথুরি নকরেকেরও ভূমিকা।
নিথুরি প্রথমে টাঙ্গাইল শহরের মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমিতে ফুটবল প্রশিক্ষণ নেন। পরে বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পে জুডো ও টেবিল টেনিসে অংশ নিয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। তারই অনুপ্রেরণায় নাম্বিয়া খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত হয়। মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক কামরুন্নাহার খান মুন্নী (মুন্নী মোনালিসা) জানান, দুই বোনের মধ্যেই ক্রীড়া প্রতিভা ছিল।
সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে তারা আরও অনেক দূর যেতে পারবে বলে তার বিশ্বাস ছিল। পরে কারাতে প্রশিক্ষক সেনসি শফিকুল ইসলাম লাভলু-এর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে নাম্বিয়া নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটায়। মুন্নী মোনালিসা বলেন, নাম্বিয়ার সাফল্যে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। সুযোগ পেলে সে আরও বড় পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। তবে এ অর্জনের পেছনে তার মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি।
একই মত প্রকাশ করে কারাতে প্রশিক্ষক সেনসি শফিকুল ইসলাম লাভলু বলেন, নাম্বিয়ার নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং পরিবারের সহযোগিতাই তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সে ভালো করবে বলে আমরা আশাবাদী। জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর নাম্বিয়ার স্বপ্ন এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যেতে চায় সে।
মেয়ের এই সাফল্যে গর্বিত মা শুকলা নকরেক। তিনি বলেন, আমার মেয়ের স্বপ্ন পূরণে আমরা সবসময় পাশে থেকেছি। ও যেন আরও বড় সাফল্য অর্জন করতে পারে, সবার কাছে সেই দোয়া চাই। স্থানীয়দের মতে, নাম্বিয়ার এই অর্জন প্রত্যন্ত এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় আগ্রহী করে তুলবে এবং প্রমাণ করবে যে প্রতিভা বিকাশের জন্য ভৌগোলিক অবস্থান কোনো বাধা নয়।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে (৯ আগস্ট) নাম্বিয়ার এই সাফল্য যেন নতুন করে বার্তা দিচ্ছে—শালবনের ছোট্ট গারো পল্লী থেকেও স্বপ্ন দেখা যায়, আর কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে জাতীয় মঞ্চে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।

















