12:10 am, Tuesday, 11 August 2026

রাজধানীর সড়কে রাতের বেলায় বেপরোয়া ভারী যান চলাচল

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:10:52 pm, Monday, 10 August 2026
  • 9

রাজধানীর সড়কে রাতের বেলায় বেপরোয়া ভারী যান চলাচল

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রোববার রাত সাড়ে ১০টা। দিনের কোলাহল অনেকটাই থামতে শুরু করেছে। মিরপুর রোডে নেই চেনা যানজট। দূর থেকে একের পর এক হেডলাইট এগিয়ে আসে। কাছে আসতেই শোনা যায় ভারী ইঞ্জিনের গর্জন। মুহূর্তেই পাশ কাটিয়ে চলে যায় ট্রাক, কাভার্ডভ্যান কিংবা লরি।

কোনোটি স্বাভাবিক গতিতে, কোনোটি আবার এমন বেগে ছুটে যায় যে, পেছনে থাকা ছোট যানকে বাধ্য হয়ে সরে যেতে হয়। এ দৃশ্য শুধু এ সড়কেই নয়, প্রগতি সরণি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল কিংবা যাত্রাবাড়ীসহ নগরীর বিভিন্ন সড়কে। রাত যত গভীর হয়, ভারী যানবাহনের উপস্থিতিও তত বাড়ে। দিনের ব্যস্ত সময়ে নিয়ন্ত্রণে থাকা অনেক মালবাহী যান তখন একসঙ্গে নামতে শুরু করে রাজধানীর সড়কে।

আর ফাঁকা রাস্তার সুযোগে বাড়ে গতি। সেখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় এ সময়ে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৮৪ জন। আহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৮৮ জন। এর মধ্যে রাতের সময়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৫১৯ জন। যা মোট নিহতের প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

আর দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের ধরন বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্যাংকার ও ময়লাবাহী ট্রাক মিলিয়ে ভারী মালবাহী যানগুলোর অংশগ্রহণ প্রায় ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ এবং বাস ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ রাতের রাজধানীতে শুধু যানবাহন কমছে না, ঝুঁকির ধরনও বদলে যাচ্ছে। মোটরসাইকেল আরোহী কামাল হোসেন বলেন, রাত ৯টার পর থেকে এসব ট্রাকের কারণে রাস্তায় মোটরসাইকেল চালানোই কঠিন।

বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনার ভয় থাকে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় নিবন্ধিত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ রয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৬টি। এরমধ্যে ট্রাক ৮৩৭৮৫, পিকআপ ১১৮৮৪৪ ও কাভার্ডভ্যান ৩৮৮০৭টি। নিবন্ধন ছাড়া রয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ। এ ছাড়াও ঢাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢুকে পণ্যবাহী কয়েক হাজার ট্রাক।

সূত্রমতে, সাধারণত তিন হাজার কেজি ওজনের বেশি গাড়ি রাত ১০টার আগে ঢাকা শহরে ঢোকার নিয়ম নেই। তারপরও রাত ৮টার পরেই এই গাড়িগুলো ঢুকতে শুরু করে। তখনই ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, দিনের বেলায়ও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাথর, মাটি, বালু, রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে ট্রাকগুলোকে বেপরোয়া গতিতে চলতে দেখা যায়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হাসানুল কবির বলেন, রাতে চলাচলকারী ট্রাক চালকদের নিয়ম মেনে চলতে আমরা প্রায়ই সচেতন করি। আর দিনে যেসব ট্রাক চলাচল করে, এগুলো বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারদের। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের স্টিকার লাগিয়ে এগুলো চলাচল করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও এসব ট্রাকের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

গত রোববার রাতে রাজধানীর মগবাজার ওয়ার্লেস মোড়ে একটি লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা অন্তত চারটি যানবাহনকে ধাক্কা দেয়। এ সময় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। এর আগে গত ৪ আগস্ট ডেমরায় ট্রাকের ধাক্কায় এক নারী নিহত হন। গত ১ আগস্ট রাতে পুরান ঢাকার মিডফোর্ট এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় মিরাজ (২০) নামে এক যুবক নিহত হন। এর আগে গত ১৬ জুলাই উত্তরার জসীমউদ্দীন রোডে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন মো. আনোয়ারুল হক (৫৫)।

রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত্যু হয় তার। দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন এই কর্মজীবী মানুষ। একটি ট্রাকের ধাক্কায় থেমে যায় সেই ফেরার পথ। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ১০ জুলাই ভোর সাড়ে ৪টায় পোস্তগোলা ব্রিজের ওপর মোটরসাইকেলে ঢাকার দিকে ফিরছিলেন ২৩ বছরের হুমায়ুন কবির। বন্ধুদের সঙ্গে মাওয়া ঘাটে ঘুরতে গিয়েছিলেন।

ফেরার পথে একটি ট্রাক তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত হুমায়ুনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সকাল ৬টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত হন তার সঙ্গে থাকা বন্ধু সোহেল (২২)। আরেকটি ঘটনা ১৫ জুন রাতের। মোহাম্মদপুরে দ্রুতগতির একটি ট্রাক পেছন থেকে একটি রিকশাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত হন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আবু জুবায়ের।

পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। রিকশায় থাকা অন্য দুজনও আহত হন। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, রাজধানীতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটে রাতে বেপরোয়া ট্রাকের চলাচলের কারণে। তিনি বলেন, আমরা যেসব পরিসংখ্যান প্রকাশ করি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। যা অনেকেরই নজরে আসে না। এদিকে ডিএমপির তেজগাঁও জোনে দায়িত্বপালনকারী একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, রাতের ঢাকায় দায়িত্বপালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও থাকেন বেপরোয়া ট্রাক আতঙ্কে।

গভীর রাতে ট্রাকচালকরা নিয়মনীতির পরোয়া করেন না। ট্রাক চলাচলে সরকারের বেঁধে দেওয়া গতিসীমা না মেনে দ্রুতগতিতে ছোটেন তারা। বেপরোয়া গতিতেই রাজধানীর বিভিন্ন মোড় পার হয় ট্রাকগুলো। তখন অনেক ঝুঁকি নিয়ে ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে জানান তিনি। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, ঢাকা আশপাশের এলাকায় ২০ হাজারের বেশি ট্রাক বালু, ইট, সিমেন্ট, নির্মাণ এলাকার মাটি, পাইলিংয়ের কাদা-মাটি, রেডিমিক্স কংক্রিট পরিবহন করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি রাতেই এসব ট্রাক গাবতলী, আমিনবাজার, মোহাম্মদপুর, বছিলা, আবদুল্লাহপুর, শ্যামপুর, পোস্তগোলা, ডেমরা, সারুলিয়া, কাঁচপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বালু ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে হলে রাতের ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে চালকের কর্মঘণ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়।

একজন চালক কোথা থেকে গাড়ি নিয়ে ঢাকায় আসছেন? কত ঘণ্টা ধরে গাড়ি চালাচ্ছেন? এর আগে কতক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছেন? একই দিনে কত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন? গন্তব্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য মালিক বা পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কোনো চাপ আছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া রাতের ট্রাক দুর্ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন। কারণ চালকের চোখে ঘুম থাকলে কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতাই হয়ে উঠতে পারে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান।

একইভাবে অনুসন্ধান দরকার যানবাহনের ফিটনেস নিয়েও। জানা গেছে, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দিনের ব্যস্ত সময়ে পুলিশের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু রাতের চিত্র আলাদা। যানবাহনের চাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সড়কে দৃশ্যমান নজরদারিও কমে যেতে পারে। অথচ এই সময়েই ভারী যানবাহনের গতি বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাতের সড়ক তুলনামূলক ফাঁকা।

ফলে যানজটের চাপ কম থাকায় গতি বাড়ানোর সুযোগ থাকে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, পথচারীর হঠাৎ পারাপার, মোটরসাইকেলের চলাচল, চালকের ক্লান্তি কিংবা গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি, তাহলে একটি ছোট ভুলও ভয়াবহ দুর্ঘটনায় রূপ নিতে পারে। এ ব্যাপারে ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, বেপরোয়া ট্রাকের বিরুদ্ধে প্রায়ই মামলা দেওয়া হচ্ছে।

তাদের শৃঙ্খলায় আনতে কাজ করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

ইউরোপে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে যৌনরোগের সংক্রমণ, কারণ জানাল ইসিডিসি

রাজধানীর সড়কে রাতের বেলায় বেপরোয়া ভারী যান চলাচল

Update Time : 11:10:52 pm, Monday, 10 August 2026

রোববার রাত সাড়ে ১০টা। দিনের কোলাহল অনেকটাই থামতে শুরু করেছে। মিরপুর রোডে নেই চেনা যানজট। দূর থেকে একের পর এক হেডলাইট এগিয়ে আসে। কাছে আসতেই শোনা যায় ভারী ইঞ্জিনের গর্জন। মুহূর্তেই পাশ কাটিয়ে চলে যায় ট্রাক, কাভার্ডভ্যান কিংবা লরি।

কোনোটি স্বাভাবিক গতিতে, কোনোটি আবার এমন বেগে ছুটে যায় যে, পেছনে থাকা ছোট যানকে বাধ্য হয়ে সরে যেতে হয়। এ দৃশ্য শুধু এ সড়কেই নয়, প্রগতি সরণি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল কিংবা যাত্রাবাড়ীসহ নগরীর বিভিন্ন সড়কে। রাত যত গভীর হয়, ভারী যানবাহনের উপস্থিতিও তত বাড়ে। দিনের ব্যস্ত সময়ে নিয়ন্ত্রণে থাকা অনেক মালবাহী যান তখন একসঙ্গে নামতে শুরু করে রাজধানীর সড়কে।

আর ফাঁকা রাস্তার সুযোগে বাড়ে গতি। সেখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় এ সময়ে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৮৪ জন। আহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৮৮ জন। এর মধ্যে রাতের সময়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৫১৯ জন। যা মোট নিহতের প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

আর দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের ধরন বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্যাংকার ও ময়লাবাহী ট্রাক মিলিয়ে ভারী মালবাহী যানগুলোর অংশগ্রহণ প্রায় ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ এবং বাস ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ রাতের রাজধানীতে শুধু যানবাহন কমছে না, ঝুঁকির ধরনও বদলে যাচ্ছে। মোটরসাইকেল আরোহী কামাল হোসেন বলেন, রাত ৯টার পর থেকে এসব ট্রাকের কারণে রাস্তায় মোটরসাইকেল চালানোই কঠিন।

বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনার ভয় থাকে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় নিবন্ধিত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ রয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৬টি। এরমধ্যে ট্রাক ৮৩৭৮৫, পিকআপ ১১৮৮৪৪ ও কাভার্ডভ্যান ৩৮৮০৭টি। নিবন্ধন ছাড়া রয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ। এ ছাড়াও ঢাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢুকে পণ্যবাহী কয়েক হাজার ট্রাক।

সূত্রমতে, সাধারণত তিন হাজার কেজি ওজনের বেশি গাড়ি রাত ১০টার আগে ঢাকা শহরে ঢোকার নিয়ম নেই। তারপরও রাত ৮টার পরেই এই গাড়িগুলো ঢুকতে শুরু করে। তখনই ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, দিনের বেলায়ও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাথর, মাটি, বালু, রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে ট্রাকগুলোকে বেপরোয়া গতিতে চলতে দেখা যায়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হাসানুল কবির বলেন, রাতে চলাচলকারী ট্রাক চালকদের নিয়ম মেনে চলতে আমরা প্রায়ই সচেতন করি। আর দিনে যেসব ট্রাক চলাচল করে, এগুলো বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারদের। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের স্টিকার লাগিয়ে এগুলো চলাচল করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও এসব ট্রাকের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

গত রোববার রাতে রাজধানীর মগবাজার ওয়ার্লেস মোড়ে একটি লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা অন্তত চারটি যানবাহনকে ধাক্কা দেয়। এ সময় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। এর আগে গত ৪ আগস্ট ডেমরায় ট্রাকের ধাক্কায় এক নারী নিহত হন। গত ১ আগস্ট রাতে পুরান ঢাকার মিডফোর্ট এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় মিরাজ (২০) নামে এক যুবক নিহত হন। এর আগে গত ১৬ জুলাই উত্তরার জসীমউদ্দীন রোডে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন মো. আনোয়ারুল হক (৫৫)।

রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত্যু হয় তার। দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন এই কর্মজীবী মানুষ। একটি ট্রাকের ধাক্কায় থেমে যায় সেই ফেরার পথ। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ১০ জুলাই ভোর সাড়ে ৪টায় পোস্তগোলা ব্রিজের ওপর মোটরসাইকেলে ঢাকার দিকে ফিরছিলেন ২৩ বছরের হুমায়ুন কবির। বন্ধুদের সঙ্গে মাওয়া ঘাটে ঘুরতে গিয়েছিলেন।

ফেরার পথে একটি ট্রাক তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত হুমায়ুনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সকাল ৬টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত হন তার সঙ্গে থাকা বন্ধু সোহেল (২২)। আরেকটি ঘটনা ১৫ জুন রাতের। মোহাম্মদপুরে দ্রুতগতির একটি ট্রাক পেছন থেকে একটি রিকশাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত হন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আবু জুবায়ের।

পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। রিকশায় থাকা অন্য দুজনও আহত হন। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, রাজধানীতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটে রাতে বেপরোয়া ট্রাকের চলাচলের কারণে। তিনি বলেন, আমরা যেসব পরিসংখ্যান প্রকাশ করি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। যা অনেকেরই নজরে আসে না। এদিকে ডিএমপির তেজগাঁও জোনে দায়িত্বপালনকারী একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, রাতের ঢাকায় দায়িত্বপালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও থাকেন বেপরোয়া ট্রাক আতঙ্কে।

গভীর রাতে ট্রাকচালকরা নিয়মনীতির পরোয়া করেন না। ট্রাক চলাচলে সরকারের বেঁধে দেওয়া গতিসীমা না মেনে দ্রুতগতিতে ছোটেন তারা। বেপরোয়া গতিতেই রাজধানীর বিভিন্ন মোড় পার হয় ট্রাকগুলো। তখন অনেক ঝুঁকি নিয়ে ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে জানান তিনি। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, ঢাকা আশপাশের এলাকায় ২০ হাজারের বেশি ট্রাক বালু, ইট, সিমেন্ট, নির্মাণ এলাকার মাটি, পাইলিংয়ের কাদা-মাটি, রেডিমিক্স কংক্রিট পরিবহন করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি রাতেই এসব ট্রাক গাবতলী, আমিনবাজার, মোহাম্মদপুর, বছিলা, আবদুল্লাহপুর, শ্যামপুর, পোস্তগোলা, ডেমরা, সারুলিয়া, কাঁচপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বালু ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে হলে রাতের ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে চালকের কর্মঘণ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়।

একজন চালক কোথা থেকে গাড়ি নিয়ে ঢাকায় আসছেন? কত ঘণ্টা ধরে গাড়ি চালাচ্ছেন? এর আগে কতক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছেন? একই দিনে কত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন? গন্তব্যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য মালিক বা পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কোনো চাপ আছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া রাতের ট্রাক দুর্ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন। কারণ চালকের চোখে ঘুম থাকলে কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতাই হয়ে উঠতে পারে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান।

একইভাবে অনুসন্ধান দরকার যানবাহনের ফিটনেস নিয়েও। জানা গেছে, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দিনের ব্যস্ত সময়ে পুলিশের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু রাতের চিত্র আলাদা। যানবাহনের চাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সড়কে দৃশ্যমান নজরদারিও কমে যেতে পারে। অথচ এই সময়েই ভারী যানবাহনের গতি বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাতের সড়ক তুলনামূলক ফাঁকা।

ফলে যানজটের চাপ কম থাকায় গতি বাড়ানোর সুযোগ থাকে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, পথচারীর হঠাৎ পারাপার, মোটরসাইকেলের চলাচল, চালকের ক্লান্তি কিংবা গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি, তাহলে একটি ছোট ভুলও ভয়াবহ দুর্ঘটনায় রূপ নিতে পারে। এ ব্যাপারে ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, বেপরোয়া ট্রাকের বিরুদ্ধে প্রায়ই মামলা দেওয়া হচ্ছে।

তাদের শৃঙ্খলায় আনতে কাজ করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।