12:11 am, Tuesday, 11 August 2026

দলীয়করণের ছায়া সরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে দেশীয় সংস্কৃতি

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:09:54 pm, Monday, 10 August 2026
  • 8

দলীয়করণের ছায়া সরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে দেশীয় সংস্কৃতি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ছায়ায় অন্ধকূপে নিমজ্জিত হয়েছিল। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরিয়ে দলীয় অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বানানো হয়।

স্বৈরাচারী শাসনের দোসর ও তথাকথিত ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’দের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল জাতীয় সংস্কৃতির এই অঙ্গন। সে সময় মেধা ও সৃজনশীলতার বদলে এখানে ঠাঁই পেয়েছিল তোষামোদি ও স্তাবকতা। মুক্তচিন্তার টুঁটি চেপে ধরে ধ্বংস করা হয়েছিল শিল্প-সংস্কৃতিকে। সেই দীর্ঘ অমানিশা কেটে এখন নতুন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে জাতীয় সংস্কৃতির এই প্রাণকেন্দ্রে।

শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শিল্পকলা একাডেমি ধীরে ধীরে তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও দলীয়করণের পঙ্কিলতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুনভাবে উজ্জীবিত। সরেজমিনে এবং শিল্পকলার বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা যায়। বিগত সরকারের আমলে শিল্পকলা একাডেমিকে ব্যবহার করে সংস্কৃতির নামে ফ্যাসিবাদের জয়গান গাওয়া হতো।

প্রকৃত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা সেখানে ছিলেন উপেক্ষিত ও কোণঠাসা। বর্তমান প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ ও সংস্কারের ফলে সেই সুবিধাভোগী চক্রের প্রভাব এখন বিলুপ্তির পথে। একাডেমিকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আখড়া হতে না দিয়ে একে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ও প্রকৃত শিল্পীদের উন্মুক্ত মঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। আওয়ামী লীগ আমলের মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীসহ (পলাতক) অন্যরা শিল্পকলা একাডেমিকে লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন।

ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর লাকীর বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা লুটপাট ও দুর্নীতির সংবাদ আসে গণমাধ্যমে। এ ছাড়া অভিযোগ আছে, সে সময় ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’রা শিল্পকলার বরাদ্দ থেকে তাদের সংগঠনের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নেন। এক অর্থে তারা শিল্পকলাকে পরিণত করেছিলেন প্রতিবেশী একটি দেশের সংস্কৃতির প্রচারকেন্দ্রে। জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী দেশ ছেড়ে পালান।

একই সঙ্গে গা-ঢাকা দেন আওয়ামী কালচারাল ফ্যাসিস্টদের অনেকে। এরপরই রাহুমুক্ত হয় শিল্পকলা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয় অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদকে। কিন্তু সে সময় শিল্পকলা একাডেমি উজ্জীবিত হওয়ার পরিবর্তে তৎকালীন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব বাধে বলে শোনা যায়।

একপর্যায়ে পদত্যাগ করেন জামিল আহমেদ। এরপর মহাপরিচালক হিসেবে ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পান শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন)। একাডেমি সংশ্লিষ্টদের মতে, তিনি যোগদানের পর শিল্পকলা ধীরে ধীরে উজ্জীবিত হতে থাকে। আজকের শিল্পকলা একাডেমিতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির যে জৌলুশপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে, তা তার কর্মোদ্যোগের কারণেই হয়েছে।

তিনি শিল্পকলাকে দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। তার নেতৃত্বে শিল্পকলা একাডেমি দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জাতীয় ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন দিবস উদযাপনে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫’ অনুমোদিত হয়।

এই সংস্কারের মাধ্যমে একাডেমির মূল বিভাগের সংখ্যা ৬ থেকে বৃদ্ধি করে ৯টি করা হয়েছে। নতুন করে ‘চলচ্চিত্র’ ও ‘আলোকচিত্র’ পৃথক স্বাধীন বিভাগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ ছাড়া কালচারাল ব্র্যান্ডিং, উৎসব এবং নিউ মিডিয়াসংক্রান্ত বিভাগ যুক্ত করা হয়। তৃণমূল পর্যায়ে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ৫ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি অনুযায়ী কার্যক্রম চলমান রাখা হয়।

গত জুনে জ্যৈষ্ঠের ফল উৎসবকে কেন্দ্র করে জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে ‘জ্যৈষ্ঠের রাঙা সকাল’ শীর্ষক বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে জাতীয় চিত্রশালা গ্যালারিতে ২৪তম তরুণ শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে যাত্রাপালাসহ নানামুখী ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার আয়োজন করা হয়।

ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিভিত্তিক কার্যক্রম পহেলা বৈশাখ ও চৈত্রসংক্রান্তি : বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ (২০২৫ সাল) এবং ১৪৩৩ (২০২৬ সাল) বরণে চৈত্রসংক্রান্তি মেলা, ড্রোন শো, লোকনাট্য উৎসব, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী ও ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন উৎসবে একাডেমির নিজস্ব রেপার্টরি দলের মাধ্যমে পুতুলনাচ এবং ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়।

ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং শেখ হাসিনার পতনের মাস আগস্টে নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের স্মরণে বিশেষ স্মরণসভা ও সম্মাননা অনুষ্ঠান ‘ভয় দেখাতে পারেনি জীবন’-এর আয়োজন করা হয়েছে। এর আগে গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণ করে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের নিয়ে আয়োজন করা হয় ‘গানে গানে জুলাই’।

এ ছাড়া বিভিন্ন দলের ফ্যাসিবাদবিরোধী নাটকসহ বিভিন্ন নাটক নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে। এসব আয়োজনের পাশাপাশি দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে বিশেষ আয়োজনও করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিন ও সৈয়দ আব্দুল হাদিকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন এবং সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ‘শিল্পকলাকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়াই আমার লক্ষ্য।

আমাদের জেন-জিরা যে লক্ষ্যে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ঘটিয়েছে, সেই লক্ষ্য পূরণে আমি বদ্ধপরিকর। আমাদের দেশের শিল্প-সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে তাদের সামনে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমি সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। ’ তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমিকে কার্যক্রমের মাধ্যমে এগিয়ে দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে আমাদের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলা-উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমিতে পাঠক কর্নার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির বিষয়ে জানতে পারবে। শিল্পকলা হবে মুক্তচিন্তার আসল চারণভূমি। ’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাডেমির দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ও ঝিমিয়ে পড়া বিভাগগুলো আবার সচল হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়-নির্বিশেষে দেশের মূলধারার সৎ, যোগ্য এবং প্রতিভাবান শিল্পীদের আবার একাডেমির মূলমঞ্চে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমিগুলো পুনর্গঠন করে তৃণমূলের সংস্কৃতিকে জাগিয়ে তোলার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিগত আমলের অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে সব ধরনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

ইউরোপে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে যৌনরোগের সংক্রমণ, কারণ জানাল ইসিডিসি

দলীয়করণের ছায়া সরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে দেশীয় সংস্কৃতি

Update Time : 11:09:54 pm, Monday, 10 August 2026

১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ছায়ায় অন্ধকূপে নিমজ্জিত হয়েছিল। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরিয়ে দলীয় অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বানানো হয়।

স্বৈরাচারী শাসনের দোসর ও তথাকথিত ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’দের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল জাতীয় সংস্কৃতির এই অঙ্গন। সে সময় মেধা ও সৃজনশীলতার বদলে এখানে ঠাঁই পেয়েছিল তোষামোদি ও স্তাবকতা। মুক্তচিন্তার টুঁটি চেপে ধরে ধ্বংস করা হয়েছিল শিল্প-সংস্কৃতিকে। সেই দীর্ঘ অমানিশা কেটে এখন নতুন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে জাতীয় সংস্কৃতির এই প্রাণকেন্দ্রে।

শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শিল্পকলা একাডেমি ধীরে ধীরে তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও দলীয়করণের পঙ্কিলতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুনভাবে উজ্জীবিত। সরেজমিনে এবং শিল্পকলার বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা যায়। বিগত সরকারের আমলে শিল্পকলা একাডেমিকে ব্যবহার করে সংস্কৃতির নামে ফ্যাসিবাদের জয়গান গাওয়া হতো।

প্রকৃত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা সেখানে ছিলেন উপেক্ষিত ও কোণঠাসা। বর্তমান প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ ও সংস্কারের ফলে সেই সুবিধাভোগী চক্রের প্রভাব এখন বিলুপ্তির পথে। একাডেমিকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আখড়া হতে না দিয়ে একে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ও প্রকৃত শিল্পীদের উন্মুক্ত মঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। আওয়ামী লীগ আমলের মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীসহ (পলাতক) অন্যরা শিল্পকলা একাডেমিকে লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন।

ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর লাকীর বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা লুটপাট ও দুর্নীতির সংবাদ আসে গণমাধ্যমে। এ ছাড়া অভিযোগ আছে, সে সময় ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’রা শিল্পকলার বরাদ্দ থেকে তাদের সংগঠনের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নেন। এক অর্থে তারা শিল্পকলাকে পরিণত করেছিলেন প্রতিবেশী একটি দেশের সংস্কৃতির প্রচারকেন্দ্রে। জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী দেশ ছেড়ে পালান।

একই সঙ্গে গা-ঢাকা দেন আওয়ামী কালচারাল ফ্যাসিস্টদের অনেকে। এরপরই রাহুমুক্ত হয় শিল্পকলা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয় অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদকে। কিন্তু সে সময় শিল্পকলা একাডেমি উজ্জীবিত হওয়ার পরিবর্তে তৎকালীন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব বাধে বলে শোনা যায়।

একপর্যায়ে পদত্যাগ করেন জামিল আহমেদ। এরপর মহাপরিচালক হিসেবে ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পান শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন)। একাডেমি সংশ্লিষ্টদের মতে, তিনি যোগদানের পর শিল্পকলা ধীরে ধীরে উজ্জীবিত হতে থাকে। আজকের শিল্পকলা একাডেমিতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির যে জৌলুশপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে, তা তার কর্মোদ্যোগের কারণেই হয়েছে।

তিনি শিল্পকলাকে দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। তার নেতৃত্বে শিল্পকলা একাডেমি দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জাতীয় ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন দিবস উদযাপনে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫’ অনুমোদিত হয়।

এই সংস্কারের মাধ্যমে একাডেমির মূল বিভাগের সংখ্যা ৬ থেকে বৃদ্ধি করে ৯টি করা হয়েছে। নতুন করে ‘চলচ্চিত্র’ ও ‘আলোকচিত্র’ পৃথক স্বাধীন বিভাগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ ছাড়া কালচারাল ব্র্যান্ডিং, উৎসব এবং নিউ মিডিয়াসংক্রান্ত বিভাগ যুক্ত করা হয়। তৃণমূল পর্যায়ে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ৫ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি অনুযায়ী কার্যক্রম চলমান রাখা হয়।

গত জুনে জ্যৈষ্ঠের ফল উৎসবকে কেন্দ্র করে জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে ‘জ্যৈষ্ঠের রাঙা সকাল’ শীর্ষক বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে জাতীয় চিত্রশালা গ্যালারিতে ২৪তম তরুণ শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে যাত্রাপালাসহ নানামুখী ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার আয়োজন করা হয়।

ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিভিত্তিক কার্যক্রম পহেলা বৈশাখ ও চৈত্রসংক্রান্তি : বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ (২০২৫ সাল) এবং ১৪৩৩ (২০২৬ সাল) বরণে চৈত্রসংক্রান্তি মেলা, ড্রোন শো, লোকনাট্য উৎসব, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী ও ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন উৎসবে একাডেমির নিজস্ব রেপার্টরি দলের মাধ্যমে পুতুলনাচ এবং ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়।

ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং শেখ হাসিনার পতনের মাস আগস্টে নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের স্মরণে বিশেষ স্মরণসভা ও সম্মাননা অনুষ্ঠান ‘ভয় দেখাতে পারেনি জীবন’-এর আয়োজন করা হয়েছে। এর আগে গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণ করে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের নিয়ে আয়োজন করা হয় ‘গানে গানে জুলাই’।

এ ছাড়া বিভিন্ন দলের ফ্যাসিবাদবিরোধী নাটকসহ বিভিন্ন নাটক নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে। এসব আয়োজনের পাশাপাশি দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে বিশেষ আয়োজনও করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিন ও সৈয়দ আব্দুল হাদিকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন এবং সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ‘শিল্পকলাকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়াই আমার লক্ষ্য।

আমাদের জেন-জিরা যে লক্ষ্যে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ঘটিয়েছে, সেই লক্ষ্য পূরণে আমি বদ্ধপরিকর। আমাদের দেশের শিল্প-সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে তাদের সামনে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমি সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। ’ তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পকলা একাডেমিকে কার্যক্রমের মাধ্যমে এগিয়ে দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে আমাদের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলা-উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমিতে পাঠক কর্নার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির বিষয়ে জানতে পারবে। শিল্পকলা হবে মুক্তচিন্তার আসল চারণভূমি। ’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাডেমির দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ও ঝিমিয়ে পড়া বিভাগগুলো আবার সচল হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়-নির্বিশেষে দেশের মূলধারার সৎ, যোগ্য এবং প্রতিভাবান শিল্পীদের আবার একাডেমির মূলমঞ্চে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমিগুলো পুনর্গঠন করে তৃণমূলের সংস্কৃতিকে জাগিয়ে তোলার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিগত আমলের অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে সব ধরনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।