11:59 pm, Sunday, 2 August 2026

সংকট মোকাবিলায় ভরসা ভোলার গ্যাস

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:46:22 pm, Sunday, 2 August 2026
  • 10
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে গত ২১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র গ্যাসের সংকট। আবাসিক, শিল্প, পরিবহন খাত ধুঁকছে গ্যাসের অভাবে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশ থেকে বাড়তি গ্যাস আনার জন্য তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলায় ভোলার কূপগুলোয় পাওয়া গ্যাস সমাধানের পথ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও বলেছেন, ভোলার গ্যাস এনে সংকট মোকাবিলার কথা। কিন্তু এই গ্যাস আনতে মূল সমস্যা পাইপলাইন না থাকা। সিএনজি বা এলএনজি আকারে আনতে গেলে যে খরচ তা সরকারের পক্ষে বহন করা কঠিন। এক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এলেও তারা এ গ্যাস আমদানিতে উচ্চমূল্য ধরায় বিষয়টি নিয়ে কঠিন অবস্থা পার করছে সরকার। তবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করার খরচের চেয়ে কম খরচ হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। শিল্পায়ন-নগরায়ণের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। সেই চাহিদা মেটাতে দেশীয় উৎসের পাশাপাশি আমদানিও করা হচ্ছে সমানে। কিন্তু প্রতিদিনই কমছে দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলোর মজুত। কমে যাচ্ছে উৎপাদন। এক সময় দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু গত বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদন কমে এসেছে ১৯শ মিলিয়ন ঘনফুটে। পাশাপাশি সম্প্রতি তৈরি হয়েছে আমদানি সংকট। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও শুধু পাইপলাইন না থাকার কারণে সক্ষমতার সবটুকু উৎপাদন করতে পারছে না ভোলার গ্যাসকূপগুলো। সিএনজি আকারে আনলেও খরচ পড়বে দ্বিগুণ। এতে করে সম্ভাবনার ভোলার গ্যাসের বেশির ভাগই অব্যবহৃত থাকছে দীর্ঘদিন। দেশের সাম্প্রতিক গ্যাসের সংকটে ভোলার গ্যাস কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দ্বীপজেলা ভোলাতে এখন পর্যন্ত ২টি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে ৯টি কূপ গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যেগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু স্থানীয়ভাবে চাহিদা না থাকা এবং মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইন না থাকায় মাত্র ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হচ্ছে। এখনই আরও ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেখানে আরও ১৫টি কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। কিন্তু পাইপলাইন না হলে বা সিএনজি আকারে আনা না হলেও এই কূপগুলোতেও গ্যাস পাওয়ার পরও অব্যবহৃতই রয়ে যাবে। তাই সিলিন্ডারের পাশাপাশি বিগত সরকারের নেওয়া ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন তৈরির কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তৎকালীন সরকার ভোলা-বরিশাল, বরিশাল-খুলনা, খুলনা-রংপুর পাইপলাইন তৈরির জন্য একটি প্রাক-সমীক্ষা শুরু করেছিল। সেটির অগ্রগতি বিবেচনায় প্রয়োজনে পুনরায় সম্ভাবনা সমীক্ষা চালানোর বিকল্প এখন আর নেই। এ ছাড়া সিএনজি বা এলএনজি যেভাবেই হোক, গ্যাস এনে জাতীয় গ্রিডে যোগ করে সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। সরকার যদি না পারে তা হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমেই আনতে হবে। নিজেদের গ্যাস অব্যবহৃত পড়ে থাকবে অথচ আমরা সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার কাছে সাহায্য চাইছি কেন? ওসব দেশ থেকে আমদানি করতে যত খরচ হবে তার চেয়ে কম মূল্যেই ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা সম্ভব বলে আমি মনে করি। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক গণশুনানিতে আমদানির বিকল্প হিসেবে ভোলার গ্যাস আনার আগ্রহ জানান ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তারা সিএনজি আকারে আনতে ব্যর্থতার প্রমাণ দেয়। পরে সরকার তা এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) হিসেবে আনার উদ্যোগ নেয়। যদিও উচ্চ ব্যয়ের কারণে এটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক না-ও হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহারের জন্য দাম নির্ধারণ করতে বিইআরসি আয়োজিত শুনানিতে (জ্বালানি বিভাগের নির্দেশে পেট্রোবাংলাসহ তিতাস ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে) বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা প্রস্তাব করে। ওই শুনানিতে অংশীজনরা এত উচ্চ দাম রাখার বিরোধিতা করে বলেন, বর্তমানে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এত বেশি দামে গ্যাস কেনা তাদের জন্য লাভজনক হবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বলছে, এলএনজি বা সিএনজি আকারে গ্যাস আনার চেয়ে ভোলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র করে বিদ্যুৎ আনা বেশি সাশ্রয়ী। প্রতি ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে ৪-৫ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ ঢাকায় আনতে সঞ্চালন ব্যয় হবে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২৪ পয়সা। অন্যদিকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনতে খরচ হবে প্রতি ঘনমিটারে ২৯ টাকা ৯০ পয়সা। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন নির্মাণ কারিগরিভাবে চ্যালেঞ্জিং হলেও এটি অগ্রাধিকার হিসেবে রয়েছে। ভোলার গ্যাস উৎপাদন ৩৫০-৩৮০ এমএমসিএফডি ছাড়ালে পাইপলাইন অপরিহার্য হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ভোলার গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই। দ্বীপ জেলাটি থেকে পাইপলাইন না থাকায় সিএনজি কিংবা এলএনজি আকারে গ্যাস আনা ব্যয়বহুল হলেও বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। জানা যায়, উপকূলীয় জেলাটি থেকে বর্তমানে সিএনজি আকারে ৫ মিলিয়ন গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে প্রতি ঘনমিটারে পরিবহন খরচ ৩০.৬০ টাকাসহ গ্যাসের দাম দাঁড়াচ্ছে ৪৭.৬০ টাকা; যা পাইপলাইনে সরবরাহ করা গ্যাসের তুলনায় দেড়গুণের মতো। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা সিএনজি সরবরাহ চুক্তি নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খরচ বেশি ধরার অভিযোগ করেন অনেকেই। ভোলার গ্যাসের দামের বিষয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতিতে দেশে বিদ্যুৎসহ শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট নিরসনে ভোলা অঞ্চলের উদ্বৃত্ত গ্যাসের সর্বোত্তম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) তত্ত্বাবধানে ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন লিমিটেডের মাধ্যমে গ্যাস কম্প্রেসড করে নিয়ে এসে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) আওতাধীন এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সরবরাহ করা হবে। এক্ষেত্রে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য হবে ৪৭.৬০ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের চার্জ ৩০.৫০ টাকা, ফিড গ্যাসের মূল্য ১৭ টাকা এবং ডিমান্ড চার্জ ০.১০ টাকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই গ্যাসের এত দাম কেন পড়ছে জানতে চাইলে ইন্ট্রাকো রিফুলিং স্টেশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াদ আলী সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। আমরা নাকি বিশেষ বিবেচনায় দরপত্র পেয়েছি। বাস্তবতা হচ্ছে- আমরা অভিজ্ঞতার আলোকেই কাজটি পেয়েছি। তখন আরও ৫টি কোম্পানি আগ্রহপত্র জমা দিয়েছিল। দরপত্রে ইন্ট্রাকোকে কোনো রকম বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি। পরিবহন খরচ বেশি ধরা হয়েছে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে রিয়াদ আলী বলেন, আমরা ট্রাকে করে সিএনজি পরিবহন করে থাকি, সেই ট্রাকের ফেরি পারাপারের ভাড়া দিতে হয় ৪৮০০ টাকা, যা প্রতি ঘনমিটারের দাঁড়ায় ১২.৫০ টাকা, পদ্মা সেতুর টোল দিতে হয় ৩.৮৫ টাকা এবং ৬০০ কিলোমিটারের ডিজেল খরচ পড়ে প্রায় ১২ টাকার মতো। সে কারণে এখন আমরা লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। প্রথমে যখন দরপত্র জমা দিয়েছিলাম তখন দর দিয়েছিলাম ৫৫ টাকার মতো, সেখান থেকে কমিয়ে ৪৭.৬০ টাকা করা হয়। তিনি বলেন, আমাদের কোম্পানি ছাড়া আর কোনো কোম্পানি এত দ্রুত সরবরাহ করতে পারত না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আমাদের ১০ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের লাইসেন্স বাতিল করে, সেই মেশিনগুলো অব্যবহৃত পড়ে ছিল, সেগুলো ব্যবহার করে দ্রুত সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছি। ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস সিএনজি আকারে আনতে ইন্ট্রাকো রিফুলিং স্টেশন পিএলসির সঙ্গে ২০২৪ সালে প্রথমে ৫ মিলিয়ন ও দ্বিতীয় ধাপে আরও ২০ মিলিয়ন গ্যাস সিএনজি আকারে সরবরাহের চুক্তি করে সরকার। প্রথম ধাপের ৫ মিলিয়ন গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ১৮টি শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপের ২০ মিলিয়ন যথাসময়ে (অক্টোবর ২০২৪) সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হয় কোম্পানিটি। যে কারণে চুক্তি রিভিউ করার চিঠি দিয়েছে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। চুক্তি বাতিল প্রসঙ্গে রিয়াদ আলী বলেন, আমরা চিঠি পেয়েছি, চুক্তিতে একটি জরুরি পরিস্থিতির ইস্যু থাকে। আমরা ৬ মাসের সময় চেয়েছি। আমরা কাজ অনেক দূর এগিয়ে এনেছি, নদীপথে আনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। সড়কপথ এড়াতে রোবহানউদ্দিনে তেঁতুলিয়া নদীর তীরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। সরকার চাইলে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছি। এই খাতে আমাদের মতো আর কোনো কোম্পানির বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। আমরা ২০০৩ সাল থেকে সিএনজি খাতে ব্যবসায় যুক্ত রয়েছি। ১৮টি কারখানায় আমরা ৯ কোটি টাকার গ্যাস সরবরাহ দিয়েছি। আমরা আরও বেশি দিতে সক্ষম ছিলাম, কিন্তু আমরা যেখানে দিচ্ছি, তারা পাইপলাইনে গ্যাস থাকার সময় আমাদের থেকে গ্যাস নিচ্ছে না। তখন ট্রাকগুলো বসে থাকছে। সরকার যদি পাইপলাইনে নিত তাহলে আরও বেশি পরিমাণে গ্যাস দিতে পারতাম। ভোলা থেকে এলএনজি আকারে আনতে খরচ আরও বেড়ে যাবে বলে মন্তব্য করে বলেন, বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ভোলার গ্যাস আনলে দেশীয় টাকা ব্যয় হচ্ছে। এতে করে বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয় করার সুযোগ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস খুঁজছে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য যা যা করণীয় আমরা করব। সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে একযোগে কাজ করছে। আশা করছি সংকট কেটে যাবে কিছুদিনের মধ্যেই।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

সংকট মোকাবিলায় ভরসা ভোলার গ্যাস

Update Time : 10:46:22 pm, Sunday, 2 August 2026

দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে গত ২১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র গ্যাসের সংকট। আবাসিক, শিল্প, পরিবহন খাত ধুঁকছে গ্যাসের অভাবে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশ থেকে বাড়তি গ্যাস আনার জন্য তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলায় ভোলার কূপগুলোয় পাওয়া গ্যাস সমাধানের পথ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও বলেছেন, ভোলার গ্যাস এনে সংকট মোকাবিলার কথা। কিন্তু এই গ্যাস আনতে মূল সমস্যা পাইপলাইন না থাকা। সিএনজি বা এলএনজি আকারে আনতে গেলে যে খরচ তা সরকারের পক্ষে বহন করা কঠিন। এক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এলেও তারা এ গ্যাস আমদানিতে উচ্চমূল্য ধরায় বিষয়টি নিয়ে কঠিন অবস্থা পার করছে সরকার। তবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করার খরচের চেয়ে কম খরচ হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। শিল্পায়ন-নগরায়ণের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। সেই চাহিদা মেটাতে দেশীয় উৎসের পাশাপাশি আমদানিও করা হচ্ছে সমানে। কিন্তু প্রতিদিনই কমছে দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলোর মজুত। কমে যাচ্ছে উৎপাদন। এক সময় দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু গত বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদন কমে এসেছে ১৯শ মিলিয়ন ঘনফুটে। পাশাপাশি সম্প্রতি তৈরি হয়েছে আমদানি সংকট। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও শুধু পাইপলাইন না থাকার কারণে সক্ষমতার সবটুকু উৎপাদন করতে পারছে না ভোলার গ্যাসকূপগুলো। সিএনজি আকারে আনলেও খরচ পড়বে দ্বিগুণ। এতে করে সম্ভাবনার ভোলার গ্যাসের বেশির ভাগই অব্যবহৃত থাকছে দীর্ঘদিন। দেশের সাম্প্রতিক গ্যাসের সংকটে ভোলার গ্যাস কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দ্বীপজেলা ভোলাতে এখন পর্যন্ত ২টি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে ৯টি কূপ গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যেগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু স্থানীয়ভাবে চাহিদা না থাকা এবং মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইন না থাকায় মাত্র ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হচ্ছে। এখনই আরও ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেখানে আরও ১৫টি কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। কিন্তু পাইপলাইন না হলে বা সিএনজি আকারে আনা না হলেও এই কূপগুলোতেও গ্যাস পাওয়ার পরও অব্যবহৃতই রয়ে যাবে। তাই সিলিন্ডারের পাশাপাশি বিগত সরকারের নেওয়া ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন তৈরির কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তৎকালীন সরকার ভোলা-বরিশাল, বরিশাল-খুলনা, খুলনা-রংপুর পাইপলাইন তৈরির জন্য একটি প্রাক-সমীক্ষা শুরু করেছিল। সেটির অগ্রগতি বিবেচনায় প্রয়োজনে পুনরায় সম্ভাবনা সমীক্ষা চালানোর বিকল্প এখন আর নেই। এ ছাড়া সিএনজি বা এলএনজি যেভাবেই হোক, গ্যাস এনে জাতীয় গ্রিডে যোগ করে সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। সরকার যদি না পারে তা হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমেই আনতে হবে। নিজেদের গ্যাস অব্যবহৃত পড়ে থাকবে অথচ আমরা সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার কাছে সাহায্য চাইছি কেন? ওসব দেশ থেকে আমদানি করতে যত খরচ হবে তার চেয়ে কম মূল্যেই ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা সম্ভব বলে আমি মনে করি। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক গণশুনানিতে আমদানির বিকল্প হিসেবে ভোলার গ্যাস আনার আগ্রহ জানান ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তারা সিএনজি আকারে আনতে ব্যর্থতার প্রমাণ দেয়। পরে সরকার তা এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) হিসেবে আনার উদ্যোগ নেয়। যদিও উচ্চ ব্যয়ের কারণে এটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক না-ও হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহারের জন্য দাম নির্ধারণ করতে বিইআরসি আয়োজিত শুনানিতে (জ্বালানি বিভাগের নির্দেশে পেট্রোবাংলাসহ তিতাস ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে) বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা প্রস্তাব করে। ওই শুনানিতে অংশীজনরা এত উচ্চ দাম রাখার বিরোধিতা করে বলেন, বর্তমানে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এত বেশি দামে গ্যাস কেনা তাদের জন্য লাভজনক হবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বলছে, এলএনজি বা সিএনজি আকারে গ্যাস আনার চেয়ে ভোলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র করে বিদ্যুৎ আনা বেশি সাশ্রয়ী। প্রতি ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে ৪-৫ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ ঢাকায় আনতে সঞ্চালন ব্যয় হবে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২৪ পয়সা। অন্যদিকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনতে খরচ হবে প্রতি ঘনমিটারে ২৯ টাকা ৯০ পয়সা। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন নির্মাণ কারিগরিভাবে চ্যালেঞ্জিং হলেও এটি অগ্রাধিকার হিসেবে রয়েছে। ভোলার গ্যাস উৎপাদন ৩৫০-৩৮০ এমএমসিএফডি ছাড়ালে পাইপলাইন অপরিহার্য হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ভোলার গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই। দ্বীপ জেলাটি থেকে পাইপলাইন না থাকায় সিএনজি কিংবা এলএনজি আকারে গ্যাস আনা ব্যয়বহুল হলেও বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। জানা যায়, উপকূলীয় জেলাটি থেকে বর্তমানে সিএনজি আকারে ৫ মিলিয়ন গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে প্রতি ঘনমিটারে পরিবহন খরচ ৩০.৬০ টাকাসহ গ্যাসের দাম দাঁড়াচ্ছে ৪৭.৬০ টাকা; যা পাইপলাইনে সরবরাহ করা গ্যাসের তুলনায় দেড়গুণের মতো। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা সিএনজি সরবরাহ চুক্তি নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খরচ বেশি ধরার অভিযোগ করেন অনেকেই। ভোলার গ্যাসের দামের বিষয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতিতে দেশে বিদ্যুৎসহ শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট নিরসনে ভোলা অঞ্চলের উদ্বৃত্ত গ্যাসের সর্বোত্তম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) তত্ত্বাবধানে ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন লিমিটেডের মাধ্যমে গ্যাস কম্প্রেসড করে নিয়ে এসে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) আওতাধীন এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সরবরাহ করা হবে। এক্ষেত্রে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য হবে ৪৭.৬০ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের চার্জ ৩০.৫০ টাকা, ফিড গ্যাসের মূল্য ১৭ টাকা এবং ডিমান্ড চার্জ ০.১০ টাকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই গ্যাসের এত দাম কেন পড়ছে জানতে চাইলে ইন্ট্রাকো রিফুলিং স্টেশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াদ আলী সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। আমরা নাকি বিশেষ বিবেচনায় দরপত্র পেয়েছি। বাস্তবতা হচ্ছে- আমরা অভিজ্ঞতার আলোকেই কাজটি পেয়েছি। তখন আরও ৫টি কোম্পানি আগ্রহপত্র জমা দিয়েছিল। দরপত্রে ইন্ট্রাকোকে কোনো রকম বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি। পরিবহন খরচ বেশি ধরা হয়েছে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে রিয়াদ আলী বলেন, আমরা ট্রাকে করে সিএনজি পরিবহন করে থাকি, সেই ট্রাকের ফেরি পারাপারের ভাড়া দিতে হয় ৪৮০০ টাকা, যা প্রতি ঘনমিটারের দাঁড়ায় ১২.৫০ টাকা, পদ্মা সেতুর টোল দিতে হয় ৩.৮৫ টাকা এবং ৬০০ কিলোমিটারের ডিজেল খরচ পড়ে প্রায় ১২ টাকার মতো। সে কারণে এখন আমরা লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। প্রথমে যখন দরপত্র জমা দিয়েছিলাম তখন দর দিয়েছিলাম ৫৫ টাকার মতো, সেখান থেকে কমিয়ে ৪৭.৬০ টাকা করা হয়। তিনি বলেন, আমাদের কোম্পানি ছাড়া আর কোনো কোম্পানি এত দ্রুত সরবরাহ করতে পারত না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আমাদের ১০ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের লাইসেন্স বাতিল করে, সেই মেশিনগুলো অব্যবহৃত পড়ে ছিল, সেগুলো ব্যবহার করে দ্রুত সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছি। ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস সিএনজি আকারে আনতে ইন্ট্রাকো রিফুলিং স্টেশন পিএলসির সঙ্গে ২০২৪ সালে প্রথমে ৫ মিলিয়ন ও দ্বিতীয় ধাপে আরও ২০ মিলিয়ন গ্যাস সিএনজি আকারে সরবরাহের চুক্তি করে সরকার। প্রথম ধাপের ৫ মিলিয়ন গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ১৮টি শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপের ২০ মিলিয়ন যথাসময়ে (অক্টোবর ২০২৪) সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হয় কোম্পানিটি। যে কারণে চুক্তি রিভিউ করার চিঠি দিয়েছে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। চুক্তি বাতিল প্রসঙ্গে রিয়াদ আলী বলেন, আমরা চিঠি পেয়েছি, চুক্তিতে একটি জরুরি পরিস্থিতির ইস্যু থাকে। আমরা ৬ মাসের সময় চেয়েছি। আমরা কাজ অনেক দূর এগিয়ে এনেছি, নদীপথে আনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। সড়কপথ এড়াতে রোবহানউদ্দিনে তেঁতুলিয়া নদীর তীরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। সরকার চাইলে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছি। এই খাতে আমাদের মতো আর কোনো কোম্পানির বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। আমরা ২০০৩ সাল থেকে সিএনজি খাতে ব্যবসায় যুক্ত রয়েছি। ১৮টি কারখানায় আমরা ৯ কোটি টাকার গ্যাস সরবরাহ দিয়েছি। আমরা আরও বেশি দিতে সক্ষম ছিলাম, কিন্তু আমরা যেখানে দিচ্ছি, তারা পাইপলাইনে গ্যাস থাকার সময় আমাদের থেকে গ্যাস নিচ্ছে না। তখন ট্রাকগুলো বসে থাকছে। সরকার যদি পাইপলাইনে নিত তাহলে আরও বেশি পরিমাণে গ্যাস দিতে পারতাম। ভোলা থেকে এলএনজি আকারে আনতে খরচ আরও বেড়ে যাবে বলে মন্তব্য করে বলেন, বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ভোলার গ্যাস আনলে দেশীয় টাকা ব্যয় হচ্ছে। এতে করে বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয় করার সুযোগ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস খুঁজছে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য যা যা করণীয় আমরা করব। সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে একযোগে কাজ করছে। আশা করছি সংকট কেটে যাবে কিছুদিনের মধ্যেই।