4:30 am, Thursday, 30 July 2026

চট্টগ্রামের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:11:37 am, Thursday, 30 July 2026
  • 4
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

হাতে কয়েক লাখ টাকার দামি ঘড়ি। চলাফেরায় আভিজাত্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার লাখের বেশি অনুসারী। বাইরে থেকে দেখলে যে কারো মনে হতে পারে ভারতের দক্ষিণী সিনেমার নায়ক। অথচ চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকা- থেকে শুরু করে এমন কোনো কাজ নেই যা তিনি করেননিÑ বলছি চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের কথা। কথিত আছে, চকচকে চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ভয়ংকর সন্ত্রাসী বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড। এককথায় পুরো চট্টগ্রামে অপরাধ জগতের আতঙ্ক এই ডেভিড ইমন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি তার, অবশেষে ধরা পড়েছেন পুলিশের জালে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে চট্টগ্রামের একাধিক হত্যা ও চাঁদাবাজি মামলার পলাতক আসামি মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন এবং তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে আলোচিত এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চট্টগ্রাম পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমনের আসল নাম মোবারক হোসেন ওরফে ইমন। ইমন ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম ও যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানিয়েছেন। ভারত থেকে দেশে ঢোকেন চার দিন আগে। এরপর আবার ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। গত বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও ওই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ অন্তত ৭টি ফৌজদারি মামলার আসামি তিনি। গ্রেপ্তাররা হলেনÑ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে ইমন, তার সহযোগী ঢাকার শ্যামপুরের আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (৩৫), মতিঝিলের মো. শামীম (৩০) ও নোয়াখালী জেলার মো. সাফায়েত হোসেন (২৮)। গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় তাদের চট্টগ্রাম পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানান। যশোরের এসপি বলেন, চট্টগ্রাম পুলিশের রিকুইজিশন অনুযায়ী গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোর ডিবি পুলিশ ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি টিম যশোর-ঢাকা মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় অবস্থান নেয়। সেখানে চেকপোস্ট বসিয়ে তিন সঙ্গীসহ ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য যশোর এসেছিলেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে যশোর সদর উপজেলার যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় ডিবি ও স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে চেকপোস্ট বসায়। ভোর সাড়ে ৩টার দিকে চেকপোস্টে ব্যারিকেড দিয়ে একটি কালো প্রাইভেট কার থামানো হয়। ওই গাড়িটিতে ইমন ছিলেন বলে আগেই খবর পাওয়া গিয়েছিল। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের দলটি সতর্কভাবে ইমন ও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে ফেলেন। গাড়িটি থামানোর পর তাদের নামানো হয়। প্রথমে তারা জানান যে তারা বেনাপোলে ঘুরতে যাচ্ছেন। যেহেতু আমাদের কাছে খবর ছিল, তাই আমরা আরও ভালোভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন ইমনের সহযোগীরা একপর্যায়ে স্বীকার করেন, তাদের মধ্যে ইমন আছেন। পুলিশ সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। তার সঙ্গে সেখানে থাকতেন ইমন। এদিকে সাজ্জাদ আলীর আরেক সহযোগী মো. রায়হানকে ধরতেও গত মঙ্গলবার রাতে নোয়াখালীতে অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। চট্টগ্রামের এসপি বলেন, ডেভিড ইমন ও তার সহযোগী রায়হানসহ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে জেলা পুলিশের একাধিক টিম দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। যশোর থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে নোয়াখালীতে আরেকটি টিম রায়হানকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালালেও তিনি অল্পের জন্য পালিয়ে যান। তাকেও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের একটি সক্রিয় নাম। ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। পুলিশ বলছে, চট্টগ্রামের পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকা- পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই প্রধান ব্যক্তির একজন এই ইমন। এর আগে ‘ছোট সাজ্জাদ’ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন গ্রুপটির নেতৃত্ব দিতেন। সাজ্জাদ বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম গ্রুপটির নেতৃত্ব নিয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকা- পরিচালনা করছেন। তদন্তকারীরা বলছেন, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারীরা চট্টগ্রাম শহরসহ রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে চাঁদা দাবি এবং সহিংস হামলার পেছনে জড়িত ছিল। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন। এই দুজন একের পর এক অপরাধ করে বেড়ালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে খুঁজে পাচ্ছিল না। তার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, মাদক, দখলবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং স্থান পরিবর্তন করে দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, চাঁদার জন্য হামলা এবং গোলাগুলির মতো ঘটনা ঘটিয়ে চট্টগ্রামকে অস্থির করে তুলেছিল এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী। এই সন্ত্রাসীকে ধরতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে আসছিল। অবশেষে যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের খবরে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। পুলিশের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকা-, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা, তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারকে সেই ধারাবাহিক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক বলেন, সন্ত্রাসী ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকেন। পুলিশের অভিযানের তথ্য পেয়ে তিনি আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ইমন প্রায়ই আসা-যাওয়া করেন। আমাদের কাছে তথ্য আছে, তার কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে এসব বিষয়ের বিস্তারিত জানা যাবে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির ঘটনায় ইমনের নাম আসে। বাকলিয়া এলাকায় ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামের একটি ইন্টারনেট সেবার কোম্পানির মালিকের কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ৩০-৪০ জনের একটি দল ডিডিএন অফিসে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ওই ঘটনার পর র‌্যাব ও পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে, ডিডিএন প্রতিষ্ঠানে হামলাকারী ওই যুবকদের জনপ্রতি মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা হয়েছিল। আর এর পেছনে ছিলেন ইমন। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশের পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। অভিযোগ ছিল, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ হামলা চালায়। এর আগে গত ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি করা হয়। তখন বাসার জানালার কাচ ও দরজায় গুলি লাগে। ওই ঘটনার পর থেকে বাসাটি পুলিশি পাহারায় ছিল। এরপরও আবার গুলির ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে চট্টগ্রামে বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ পলাতক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমনের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। গত রোববার রাতে নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলেন মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪)। এর মধ্যে আসিফ একটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি। ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট অন্তত ১৫টি মামলার আসামি। পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেনÑ এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল বলে পুলিশের দাবি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

চট্টগ্রামের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার

Update Time : 03:11:37 am, Thursday, 30 July 2026

হাতে কয়েক লাখ টাকার দামি ঘড়ি। চলাফেরায় আভিজাত্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার লাখের বেশি অনুসারী। বাইরে থেকে দেখলে যে কারো মনে হতে পারে ভারতের দক্ষিণী সিনেমার নায়ক। অথচ চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকা- থেকে শুরু করে এমন কোনো কাজ নেই যা তিনি করেননিÑ বলছি চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের কথা। কথিত আছে, চকচকে চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ভয়ংকর সন্ত্রাসী বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড। এককথায় পুরো চট্টগ্রামে অপরাধ জগতের আতঙ্ক এই ডেভিড ইমন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি তার, অবশেষে ধরা পড়েছেন পুলিশের জালে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে চট্টগ্রামের একাধিক হত্যা ও চাঁদাবাজি মামলার পলাতক আসামি মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন এবং তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে আলোচিত এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চট্টগ্রাম পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমনের আসল নাম মোবারক হোসেন ওরফে ইমন। ইমন ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম ও যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানিয়েছেন। ভারত থেকে দেশে ঢোকেন চার দিন আগে। এরপর আবার ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। গত বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও ওই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ অন্তত ৭টি ফৌজদারি মামলার আসামি তিনি। গ্রেপ্তাররা হলেনÑ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে ইমন, তার সহযোগী ঢাকার শ্যামপুরের আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (৩৫), মতিঝিলের মো. শামীম (৩০) ও নোয়াখালী জেলার মো. সাফায়েত হোসেন (২৮)। গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় তাদের চট্টগ্রাম পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানান। যশোরের এসপি বলেন, চট্টগ্রাম পুলিশের রিকুইজিশন অনুযায়ী গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোর ডিবি পুলিশ ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি টিম যশোর-ঢাকা মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় অবস্থান নেয়। সেখানে চেকপোস্ট বসিয়ে তিন সঙ্গীসহ ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য যশোর এসেছিলেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে যশোর সদর উপজেলার যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় ডিবি ও স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে চেকপোস্ট বসায়। ভোর সাড়ে ৩টার দিকে চেকপোস্টে ব্যারিকেড দিয়ে একটি কালো প্রাইভেট কার থামানো হয়। ওই গাড়িটিতে ইমন ছিলেন বলে আগেই খবর পাওয়া গিয়েছিল। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের দলটি সতর্কভাবে ইমন ও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে ফেলেন। গাড়িটি থামানোর পর তাদের নামানো হয়। প্রথমে তারা জানান যে তারা বেনাপোলে ঘুরতে যাচ্ছেন। যেহেতু আমাদের কাছে খবর ছিল, তাই আমরা আরও ভালোভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন ইমনের সহযোগীরা একপর্যায়ে স্বীকার করেন, তাদের মধ্যে ইমন আছেন। পুলিশ সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। তার সঙ্গে সেখানে থাকতেন ইমন। এদিকে সাজ্জাদ আলীর আরেক সহযোগী মো. রায়হানকে ধরতেও গত মঙ্গলবার রাতে নোয়াখালীতে অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। চট্টগ্রামের এসপি বলেন, ডেভিড ইমন ও তার সহযোগী রায়হানসহ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে জেলা পুলিশের একাধিক টিম দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। যশোর থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে নোয়াখালীতে আরেকটি টিম রায়হানকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালালেও তিনি অল্পের জন্য পালিয়ে যান। তাকেও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের একটি সক্রিয় নাম। ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। পুলিশ বলছে, চট্টগ্রামের পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকা- পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই প্রধান ব্যক্তির একজন এই ইমন। এর আগে ‘ছোট সাজ্জাদ’ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন গ্রুপটির নেতৃত্ব দিতেন। সাজ্জাদ বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম গ্রুপটির নেতৃত্ব নিয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকা- পরিচালনা করছেন। তদন্তকারীরা বলছেন, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারীরা চট্টগ্রাম শহরসহ রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে চাঁদা দাবি এবং সহিংস হামলার পেছনে জড়িত ছিল। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন। এই দুজন একের পর এক অপরাধ করে বেড়ালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে খুঁজে পাচ্ছিল না। তার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, মাদক, দখলবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং স্থান পরিবর্তন করে দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, চাঁদার জন্য হামলা এবং গোলাগুলির মতো ঘটনা ঘটিয়ে চট্টগ্রামকে অস্থির করে তুলেছিল এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী। এই সন্ত্রাসীকে ধরতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে আসছিল। অবশেষে যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের খবরে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। পুলিশের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকা-, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা, তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারকে সেই ধারাবাহিক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক বলেন, সন্ত্রাসী ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকেন। পুলিশের অভিযানের তথ্য পেয়ে তিনি আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ইমন প্রায়ই আসা-যাওয়া করেন। আমাদের কাছে তথ্য আছে, তার কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে এসব বিষয়ের বিস্তারিত জানা যাবে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির ঘটনায় ইমনের নাম আসে। বাকলিয়া এলাকায় ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামের একটি ইন্টারনেট সেবার কোম্পানির মালিকের কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ৩০-৪০ জনের একটি দল ডিডিএন অফিসে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ওই ঘটনার পর র‌্যাব ও পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে, ডিডিএন প্রতিষ্ঠানে হামলাকারী ওই যুবকদের জনপ্রতি মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা হয়েছিল। আর এর পেছনে ছিলেন ইমন। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশের পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। অভিযোগ ছিল, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ হামলা চালায়। এর আগে গত ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি করা হয়। তখন বাসার জানালার কাচ ও দরজায় গুলি লাগে। ওই ঘটনার পর থেকে বাসাটি পুলিশি পাহারায় ছিল। এরপরও আবার গুলির ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে চট্টগ্রামে বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ পলাতক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমনের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। গত রোববার রাতে নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলেন মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪)। এর মধ্যে আসিফ একটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি। ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট অন্তত ১৫টি মামলার আসামি। পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেনÑ এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল বলে পুলিশের দাবি।