কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ে একের পর এক পাহাড় কাটা, বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এতে শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যই হুমকির মুখে পড়ছে না, বিপন্ন হচ্ছে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও।
পাহাড় কাটা ও দখল ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন না হওয়ায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। কুমিল্লা শহরের প্রায় ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে ৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণি। এর সর্বোচ্চ উচ্চতা ৫৫ মিটার, গড় উচ্চতা ২১ মিটার। উত্তরে রানি ময়নামতির প্রাসাদ থেকে দক্ষিণে প্রাচীন চণ্ডীমুড়া মন্দির পর্যন্ত বিস্তৃত এ পাহাড়শ্রেণি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ।
পাহাড়ে একের পর এক স্থাপনা : সদর দক্ষিণ উপজেলায় পাহাড় ও টিলার মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে ২ হাজার ১২১ একর ৫০ শতাংশ। সরকারি খাসজমি ১০৩ একর ২৫ শতাংশ এবং বন বিভাগের জমি ১৮৩ একর ১২ শতাংশ। বিভিন্ন সময়ে এসব পাহাড়ি এলাকায় সেনানিবাস, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), বিজিবি, ক্যাডেট কলেজ ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের জন্য ২০২১ সালে ২০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ১৩১ একর পাহাড় ও টিলার শ্রেণিভুক্ত। সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সালমান চৌধুরী শাওন জানান, কয়েকটি বড় স্থাপনা পরিদর্শন ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে তার ধারণা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন ছাড়াই নির্মাণকাজ হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হলেও অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক এস এম শহিদুল হাসান বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করিম জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তবে নির্মাণের শুরুতে পাহাড় কাটা হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র ঘিরেও পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে পাহাড়ি এলাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছে সিসিএন বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ও মডেল কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম চৌধুরীর দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই স্থাপনা করা হয়েছে এবং ভবন নির্মাণে পাহাড়ের ক্ষতি হয়নি।
অন্যদিকে বড়ধর্মপুর, সালমানপুর ও জামমুড়া এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালে প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের সময় এক লাখ ১৪ হাজার ঘনফুটের বেশি পাহাড়ি মাটি কাটার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। ময়নামতি জাদুঘরের পশ্চিমে ‘নীলকুঞ্জ’ ও ‘কাশবন’ রিসোর্ট পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সালমানপুরের সংরক্ষিত বনভূমিতে গড়ে উঠেছে ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’ বিনোদনকেন্দ্র। স্থানীয়দের দাবি, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে প্রায় ৫০ একর পাহাড় ও সংরক্ষিত বন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জামমুড়ায় ‘ডাইনোসর পার্ক’ নির্মাণেও টিলা কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই এলাকায় পাহাড়ের গাছপালা সরিয়ে ‘প্রবাসী ট্যুরিজম অ্যান্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন’ গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং সংরক্ষিত বনভূমিতে চক্ষু হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আদালতের নির্দেশেও বন্ধ হয়নি : পাহাড় কাটা বন্ধে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আদালত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং ম্যাজিক প্যারাডাইসসহ বিভিন্ন পক্ষকে লালমাই ও অন্যান্য পাহাড়ে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।
তবু পাহাড় রক্ষার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা নূরুননাহার জানান, দখল হওয়া জমি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে থাকা তিন একর জমি নিয়েও মামলা রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবিএম মশিউজ্জামান বলেন, পাহাড়ের বেশির ভাগ জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও পাহাড় কাটা বেআইনি। খবর পেলে প্রশাসন অভিযান চালায়।
তার দাবি, আগের তুলনায় পাহাড় কাটা কমেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। ঝুঁকিতে ইতিহাস ও জীববৈচিত্র্য : লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের গুরুত্ব কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে অন্তত ছয়টি রাজবংশ ও ৩৪ জন রাজার শাসনামলের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ১৯৫৫ সাল থেকে এ অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চলছে।
শালবন বিহার, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দ বিহার, কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া এবং রানি ময়নামতির প্রাসাদসহ ৫০টির বেশি প্রত্নস্থল রয়েছে এখানে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, এ অঞ্চলে প্রতি বছরই নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও স্থাপনা নির্মাণ চলতে থাকলে মাটির নিচে থাকা অজানা নিদর্শন আবিষ্কারের সুযোগ নষ্ট হতে পারে।
একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য। একসময় এ অঞ্চলে বন্য শূকর, মেছোবাঘ, বনবিড়াল, শিয়াল, হনুমান, সজারু, খরগোশ, বাদুড়সহ নানা প্রাণী ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যেত। বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও বসতি সম্প্রসারণের ফলে এসব প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, লালমাই-ময়নামতি পাহাড় রক্ষায় বিচ্ছিন্ন অভিযান বা জরিমানা যথেষ্ট নয়।
পাহাড় কাটা ও দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ বন্ধ করা জরুরি। তা না হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি আর ঠেকানো যাবে না।

























