আজ বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫৮%

উপসাগরের সংকট: যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও ঢাকার বাস্তবতা

  • MIT ERP
  • Update Time : 01:53:37 am, Wednesday, 28 October 2026
  • 28

উপসাগরের সংকট: যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও ঢাকার বাস্তবতা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

আমাদের ভূমি-খতিয়ানে দুটি আলাদা প্রশ্নের উত্তর লেখা থাকে জমির মালিক কে, আর দখলে আছে কে। দুই ঘরে সবসময় একই নাম বসে না। ২০২৬ সালের অক্টোবরে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বুঝতে চাইলে এই পুরোনো ভেদরেখাটাই সবচেয়ে কাজের।

গত বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে থাকা অ-জরুরি সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে; কারণ, ইরানপন্থি হুতিদের হামলা বেড়েছে। এই অক্টোবরেই এক সপ্তাহে সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে হুতি হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন, তাদের একজন মার্কিন নাগরিক। তার আগের দিন দোহার এক নিরাপত্তা-ফোরামে মার্কিন দূত টম ব্যারাক বলেছেন, তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তার পুরোনো সম্পর্ক থেকে ওয়াশিংটন সরে আসছে; এই অঞ্চলের ‘মালিক’ হতে সে আর আগ্রহী নয়।

অথচ একই ওয়াশিংটন ইরানি বন্দরে অবরোধ বহাল রাখার কথা বলছে, আর আলোচনার টেবিলে তুলছে ‘আত্মসমর্পণ’-এর ভাষা। দখলের সব ক্ষমতা হাতে, কিন্তু মালিকানার দায় কাঁধে নেই আজকের মার্কিন নীতির সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা সম্ভবত এটাই। পুরোনো দলিলের মেয়াদ ফুরাল দশকের পর দশক ধরে চুক্তিটা ছিল সরল : উপসাগরীয় দেশগুলো তেলের প্রবাহ নিশ্চিত রাখবে, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র দেবে নিরাপত্তার ছাতা।

সেই ছাতার নিচে বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্তত ১৯টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ থেকে ওয়াশিংটন এখানে ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটায়; কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো তিনটি বিমানবাহী রণতরি একসঙ্গে অঞ্চলে অবস্থান নেয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ বিমান হামলা শুরু করে; সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন।

জবাবে তেহরান ইসরায়েল, মার্কিন ঘাঁটি ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন ছোড়ে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় যে পথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ¦ালানি যেত। ব্যারাকের স্বীকারোক্তিটা তাই গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ২৩টি ‘শাসন-পরিবর্তনে’ জড়িয়েছে, আর অতীতের এমন হস্তক্ষেপ প্রায়ই ভুল ছিল।

এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক একে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: ওয়াশিংটন এতদিন যা করে এসেছে তা কাজ করেনি কোন প্রশাসনের আমলে, সেটা এখানে বড় কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: পুরোনো দলিল বাতিল হলে নতুন দলিল কোথায়? তিন যন্ত্রের কারবার আমাদের পর্যবেক্ষণে, নতুন দলিলের অভাবে ওয়াশিংটন এখন তিনটি যন্ত্র একসঙ্গে চালাচ্ছে চাপ, ঘোষণা আর দায়-হস্তান্তর।

তিনটিরই ফল অসম্পূর্ণ। প্রথম যন্ত্র চাপ। বোমা, নৌ-অবরোধ, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ। ৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হবে না। এখন হোয়াইট হাউস দাবি করছে, প্রতিটি লক্ষ্যই অর্জিত ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস, প্রতিরক্ষা-শিল্প বিধ্বস্ত, পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা ঠেকানো গেছে। অথচ জুনে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে বলা হয়, পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে ইরানের এক বছরেরও কম সময় লাগবে ২০২৫ সালের জুনের হামলার পর যে হিসাব ছিল, ঠিক তা-ই।

অর্থাৎ এত বোমার পরও পরমাণু-ঘড়ির কাঁটা নড়েনি। শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষে অবশ্য বদল এসেছে; আলী খামেনির জায়গায় এসেছেন তার ছেলে মোজতবা। ওয়াশিংটন এটিকেও সাফল্য বলে দাবি করেছে। দ্বিতীয় যন্ত্র ঘোষণা। গাজার ২০ দফা পরিকল্পনা, ‘বোর্ড অব পিস’, ১৭ জুনের ইসলামাবাদ স্মারক শেষোক্তটিতে ট্রাম্প সই করেছেন ভার্সাইয়ে এক নৈশভোজের টেবিলে।

স্মারকে বলা ছিল, সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি হবে। আগস্টে এসে ট্রাম্প বললেন, ইরানের উচিত ‘সাদা পতাকা’ তোলা, অন্তর্বর্তী চুক্তি বাড়ানোর ইচ্ছা নেই আর হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনায় ওমান বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে বোমা মারার হুমকিও দিলেন; অথচ ওমান দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনার মধ্যস্থ। অক্টোবরের শুরুতে আবার সুর নরম: ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে, আর ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা হবে না।

আলোচনা চলছে কাতারের মধ্যস্থতায়, পরোক্ষভাবে। ঘোষণার এই ওঠানামায় নীতির চেয়ে বেশি ধরা পড়ে ক্যালেন্ডারের ছায়া। তৃতীয় যন্ত্র দায়-হস্তান্তর। রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুদ্ধ চলাকালে ইরানে গোপনে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যায়নি; সূত্রগুলোর ভাষ্যে, ইরান-সংঘাত অমীমাংসিত থাকতে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলতে চায় না প্রশাসন।

২০২৬ সালেই ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হয়েছে। আর যে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে, সেখানে ঢুকছে অন্যরা: ১৯ অক্টোবর রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার তেহরানে গেছেন মস্কো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা খুঁজছে। খাতার অঙ্ক আবেগ নয়, সংখ্যায় আসা যাক। যুদ্ধের আগে ব্রেন্ট অশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার; মার্চের শেষে তা ১১৮ ডলার ছাড়ায়।

১৫ অক্টোবর আইএমএফের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া বিভাগের পরিচালক জিহাদ আজুর জানিয়েছেন, দাম এখনো যুদ্ধপূর্ব স্তরের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি। ২০০ ডলারের যে আশঙ্কা ছিল, তা ঘটেনি; তবে আইএমএফ ২০২৬ সালের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৪.৭ শতাংশ করেছে। আন্তর্জাতিক জ¦ালানি সংস্থার প্রধান পরিস্থিতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ¦ালানি-নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বলে বর্ণনা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিজের খাতাও ফাঁকা নয়। রয়টার্সের তথ্যে যুদ্ধের মাসিক খরচ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার; প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটের একটি কমিটিকে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত খরচ ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ১৮। প্রতিনিধি পরিষদ ২১৪-২০৮ ভোটে যুদ্ধ-ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব পাস করেছে, চার রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন; সিনেটে পথটা মসৃণ হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আবার ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ-ক্ষমতা আইনকেই সংবিধানবিরোধী বলেন। রয়টার্স লিখেছে, যুদ্ধটি দেশের ভেতরে অজনপ্রিয় নির্বাচনের মুখে সেটাই চাপ বাড়াচ্ছে। গাজা : ঘোষণা বনাম মাঠ ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির এক বছর পূর্ণ হয়েছে। জিম্মি মুক্তির প্রথম ধাপে সাফল্য এসেছে এটা স্বীকার না করলে অন্যায় হবে। কিন্তু আল জাজিরার হিসাবে এই এক বছরে ১,৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, বেশির ভাগই নারী ও শিশু; প্রতিশ্রুত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন হয়নি, অর্থপূর্ণ পুনর্গঠনও শুরু হয়নি।

ট্রাম্প বলেছিলেন, বোর্ড অব পিসের সদস্যরা ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আর হাজার হাজার কর্মী পাঠাতে রাজি। কাগজে সংখ্যাটা সুন্দর; মাঠে সংখ্যাটা নেই। বিশ্লেষকদের একাংশ বোর্ডটিকে ‘ব্যর্থ’ বলতেও দ্বিধা করছেন না। ঢাকার ঘর যুদ্ধ ঢাকা থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে; কিন্তু তার বিল আসে আমাদের বিদ্যুৎ-বিলে।

বাংলাদেশ জ¦ালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। এলএনজির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে কাতার থেকে, আর কাতার ৪ মার্চ ফোর্স ম্যাজোর ঘোষণা করে সরবরাহ স্থগিত করেছিল। যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই এলএনজির দাম দ্বিগুণ হয়ে প্রতি এমএমবিটিইউতে ২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। জাহাজ কোম্পানিগুলো উপসাগরমুখী বুকিং স্থগিত করে; যুদ্ধ শুরুর পরপরই বাংলাদেশ প্রায় ২০০টি ফ্লাইট বাতিল করে।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত ছয় দেশে আমাদের প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রবাসী আয় পেয়েছে ৩০.২ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশ আসে উপসাগর থেকে। ঢাকার এক গবেষণার সবচেয়ে খারাপ দৃশ্যপটে জ¦ালানির দাম বাড়া, প্রবাসী আয় কমা ও রপ্তানি ধাক্কা খাওয়া একসঙ্গে ঘটলে জিডিপির ৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছে; শুধু জ¦ালানির দাম বাড়ার দৃশ্যপটেই জিডিপি কমতে পারে ১.২ শতাংশ।

একটি মর্মান্তিক বৈপরীত্য এখানে স্পষ্ট। যে ওয়াশিংটন দখলের ক্ষমতা রাখে অথচ মালিকানার দায় নিতে চায় না, তার প্রতিটি অসমাপ্ত সিদ্ধান্তের খাজনা দিচ্ছে ঢাকার মতো ভাড়াটিয়া অর্থনীতি। আমাদের নাম খতিয়ানের কোথাও নেই, অথচ প্রতিবার ঘোষণা আর প্রত্যাহারের মাঝখানে আমাদের কারখানার জ¦ালানি-পরিকল্পনা ঝুলে থাকে। ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছে আমাদেরই প্রতিবেশী পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার কণ্ঠ তাই টেবিলে একেবারে অনুপস্থিত নয়; ঢাকার সেখানে কোথায় দাঁড়ানো উচিত, সে প্রশ্ন নীতিনির্ধারকদের নিজেদেরই করতে হবে।

উল্টো পিঠের যুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের যুক্তি উড়িয়ে দেওয়া সৎ সম্পাদকীয়ের কাজ নয়। তারা বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি অনেকখানি দুর্বল করেছে। যে শাসনব্যবস্থা জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে হাজার হাজার মানুষ হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত, যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজকে জিম্মি রেখেছে এমনকি প্রণালিতে টোল বসানোর পরিকল্পনা সংসদীয় কমিটিতে অনুমোদন করিয়েছে তার ওপর চাপ বজায় রাখাই একমাত্র ভাষা, এমনটাই তাদের বক্তব্য।

হেগসেথের দাবি, চুক্তির ফলে ইরান ‘কখনোই’ পরমাণু অস্ত্র পাবে না। উপসাগরীয় অংশীদারদের অনেকেও ইরানের শক্তি খর্ব করায় আগ্রহী, তাদের গোপন হামলাই তার প্রমাণ। আর জুনের পর হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি নবায়িত হওয়াকেও সমর্থকরা কূটনৈতিক অর্জন বলেন। সমালোচকদের জবাবও জোরালো। তাদের হিসাবে হরমুজ যুদ্ধের আগেও খোলা ছিল ফলে তা খুলে দেওয়া নতুন কোনো অর্জন নয়; পারমাণবিক সময়সীমা বদলায়নি; আর ইরানের পক্ষে প্রণালির ওপর বাড়তি দর-কষাকষির জায়গা তৈরি হয়েছে।

দুপক্ষই একটি বিষয়ে একমত: সামরিক সাফল্য এখনো রাজনৈতিক নিষ্পত্তিতে রূপ নেয়নি। দলিল চাই যে ক্ষমতা দখল রাখে কিন্তু দায় নেয় না, তার হাতে কাজ প্রায়ই অসমাপ্ত থাকে এটাই এই বছরের মূল শিক্ষা। তাই আমাদের তিনটি দাবি। প্রথমত, শেষ রেখা টানা। হরমুজ, পরমাণু ও লেবানন নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির সময়সীমা ঠিক করতে হবে; ৩ নভেম্বরের পর নতুন হামলার হুমকি নয়, টেবিলে কাজ চাই।

দ্বিতীয়ত, গাজায় ঘোষিত স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা অথবা ব্যর্থতা স্বীকার করে নতুন পথ খোঁজা। তৃতীয়ত, ওমান, কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের হুমকি নয়, স্বীকৃতি দেওয়া কারণ নিষ্পত্তির দলিলে তাদের স্বাক্ষর ছাড়া তা টিকবে না। আর ঘরের জন্য আমাদের করণীয় স্পষ্ট : এলএনজির উৎস একটি দেশের ওপর নির্ভরতা থেকে সরিয়ে বহুমুখী করা, জ¦ালানি মজুত বাড়ানো, প্রবাসী শ্রমিকের সুরক্ষায় সক্রিয় কূটনীতি এবং জাতিসংঘ ও ওআইসির মঞ্চে নিজেদের কণ্ঠ স্পষ্ট করা।

বড় শক্তিদের খতিয়ান আমরা লিখতে পারব না; কিন্তু সেই খতিয়ানের দাগ-নম্বরে আমাদের ঘরের নাম যেন অন্তত ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হিসেবে হলেও লেখা থাকে সেটুকু দাবি জানানোর অধিকার আমাদের আছে। শেষ পর্যন্ত খতিয়ান লেখার অধিকার তারই, যে দায়ও নেয়। দখলের জোর দিয়ে কিছুদিন টেকা যায়; দলিল ছাড়া শান্তি টেকে না।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

চার মহাদেশের নির্বাচন ও বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের সংকট

উপসাগরের সংকট: যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও ঢাকার বাস্তবতা

Update Time : 01:53:37 am, Wednesday, 28 October 2026

আমাদের ভূমি-খতিয়ানে দুটি আলাদা প্রশ্নের উত্তর লেখা থাকে জমির মালিক কে, আর দখলে আছে কে। দুই ঘরে সবসময় একই নাম বসে না। ২০২৬ সালের অক্টোবরে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বুঝতে চাইলে এই পুরোনো ভেদরেখাটাই সবচেয়ে কাজের।

গত বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে থাকা অ-জরুরি সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে; কারণ, ইরানপন্থি হুতিদের হামলা বেড়েছে। এই অক্টোবরেই এক সপ্তাহে সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে হুতি হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন, তাদের একজন মার্কিন নাগরিক। তার আগের দিন দোহার এক নিরাপত্তা-ফোরামে মার্কিন দূত টম ব্যারাক বলেছেন, তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তার পুরোনো সম্পর্ক থেকে ওয়াশিংটন সরে আসছে; এই অঞ্চলের ‘মালিক’ হতে সে আর আগ্রহী নয়।

অথচ একই ওয়াশিংটন ইরানি বন্দরে অবরোধ বহাল রাখার কথা বলছে, আর আলোচনার টেবিলে তুলছে ‘আত্মসমর্পণ’-এর ভাষা। দখলের সব ক্ষমতা হাতে, কিন্তু মালিকানার দায় কাঁধে নেই আজকের মার্কিন নীতির সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা সম্ভবত এটাই। পুরোনো দলিলের মেয়াদ ফুরাল দশকের পর দশক ধরে চুক্তিটা ছিল সরল : উপসাগরীয় দেশগুলো তেলের প্রবাহ নিশ্চিত রাখবে, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র দেবে নিরাপত্তার ছাতা।

সেই ছাতার নিচে বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্তত ১৯টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ থেকে ওয়াশিংটন এখানে ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটায়; কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো তিনটি বিমানবাহী রণতরি একসঙ্গে অঞ্চলে অবস্থান নেয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ বিমান হামলা শুরু করে; সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন।

জবাবে তেহরান ইসরায়েল, মার্কিন ঘাঁটি ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন ছোড়ে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় যে পথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ¦ালানি যেত। ব্যারাকের স্বীকারোক্তিটা তাই গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ২৩টি ‘শাসন-পরিবর্তনে’ জড়িয়েছে, আর অতীতের এমন হস্তক্ষেপ প্রায়ই ভুল ছিল।

এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক একে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: ওয়াশিংটন এতদিন যা করে এসেছে তা কাজ করেনি কোন প্রশাসনের আমলে, সেটা এখানে বড় কথা নয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: পুরোনো দলিল বাতিল হলে নতুন দলিল কোথায়? তিন যন্ত্রের কারবার আমাদের পর্যবেক্ষণে, নতুন দলিলের অভাবে ওয়াশিংটন এখন তিনটি যন্ত্র একসঙ্গে চালাচ্ছে চাপ, ঘোষণা আর দায়-হস্তান্তর।

তিনটিরই ফল অসম্পূর্ণ। প্রথম যন্ত্র চাপ। বোমা, নৌ-অবরোধ, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ। ৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হবে না। এখন হোয়াইট হাউস দাবি করছে, প্রতিটি লক্ষ্যই অর্জিত ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস, প্রতিরক্ষা-শিল্প বিধ্বস্ত, পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা ঠেকানো গেছে। অথচ জুনে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে বলা হয়, পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে ইরানের এক বছরেরও কম সময় লাগবে ২০২৫ সালের জুনের হামলার পর যে হিসাব ছিল, ঠিক তা-ই।

অর্থাৎ এত বোমার পরও পরমাণু-ঘড়ির কাঁটা নড়েনি। শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষে অবশ্য বদল এসেছে; আলী খামেনির জায়গায় এসেছেন তার ছেলে মোজতবা। ওয়াশিংটন এটিকেও সাফল্য বলে দাবি করেছে। দ্বিতীয় যন্ত্র ঘোষণা। গাজার ২০ দফা পরিকল্পনা, ‘বোর্ড অব পিস’, ১৭ জুনের ইসলামাবাদ স্মারক শেষোক্তটিতে ট্রাম্প সই করেছেন ভার্সাইয়ে এক নৈশভোজের টেবিলে।

স্মারকে বলা ছিল, সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি হবে। আগস্টে এসে ট্রাম্প বললেন, ইরানের উচিত ‘সাদা পতাকা’ তোলা, অন্তর্বর্তী চুক্তি বাড়ানোর ইচ্ছা নেই আর হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনায় ওমান বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে বোমা মারার হুমকিও দিলেন; অথচ ওমান দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনার মধ্যস্থ। অক্টোবরের শুরুতে আবার সুর নরম: ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে, আর ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা হবে না।

আলোচনা চলছে কাতারের মধ্যস্থতায়, পরোক্ষভাবে। ঘোষণার এই ওঠানামায় নীতির চেয়ে বেশি ধরা পড়ে ক্যালেন্ডারের ছায়া। তৃতীয় যন্ত্র দায়-হস্তান্তর। রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুদ্ধ চলাকালে ইরানে গোপনে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যায়নি; সূত্রগুলোর ভাষ্যে, ইরান-সংঘাত অমীমাংসিত থাকতে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলতে চায় না প্রশাসন।

২০২৬ সালেই ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হয়েছে। আর যে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে, সেখানে ঢুকছে অন্যরা: ১৯ অক্টোবর রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার তেহরানে গেছেন মস্কো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা খুঁজছে। খাতার অঙ্ক আবেগ নয়, সংখ্যায় আসা যাক। যুদ্ধের আগে ব্রেন্ট অশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার; মার্চের শেষে তা ১১৮ ডলার ছাড়ায়।

১৫ অক্টোবর আইএমএফের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া বিভাগের পরিচালক জিহাদ আজুর জানিয়েছেন, দাম এখনো যুদ্ধপূর্ব স্তরের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি। ২০০ ডলারের যে আশঙ্কা ছিল, তা ঘটেনি; তবে আইএমএফ ২০২৬ সালের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৪.৭ শতাংশ করেছে। আন্তর্জাতিক জ¦ালানি সংস্থার প্রধান পরিস্থিতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ¦ালানি-নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বলে বর্ণনা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিজের খাতাও ফাঁকা নয়। রয়টার্সের তথ্যে যুদ্ধের মাসিক খরচ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার; প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটের একটি কমিটিকে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত খরচ ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ১৮। প্রতিনিধি পরিষদ ২১৪-২০৮ ভোটে যুদ্ধ-ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব পাস করেছে, চার রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন; সিনেটে পথটা মসৃণ হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আবার ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ-ক্ষমতা আইনকেই সংবিধানবিরোধী বলেন। রয়টার্স লিখেছে, যুদ্ধটি দেশের ভেতরে অজনপ্রিয় নির্বাচনের মুখে সেটাই চাপ বাড়াচ্ছে। গাজা : ঘোষণা বনাম মাঠ ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির এক বছর পূর্ণ হয়েছে। জিম্মি মুক্তির প্রথম ধাপে সাফল্য এসেছে এটা স্বীকার না করলে অন্যায় হবে। কিন্তু আল জাজিরার হিসাবে এই এক বছরে ১,৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, বেশির ভাগই নারী ও শিশু; প্রতিশ্রুত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন হয়নি, অর্থপূর্ণ পুনর্গঠনও শুরু হয়নি।

ট্রাম্প বলেছিলেন, বোর্ড অব পিসের সদস্যরা ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আর হাজার হাজার কর্মী পাঠাতে রাজি। কাগজে সংখ্যাটা সুন্দর; মাঠে সংখ্যাটা নেই। বিশ্লেষকদের একাংশ বোর্ডটিকে ‘ব্যর্থ’ বলতেও দ্বিধা করছেন না। ঢাকার ঘর যুদ্ধ ঢাকা থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে; কিন্তু তার বিল আসে আমাদের বিদ্যুৎ-বিলে।

বাংলাদেশ জ¦ালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। এলএনজির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে কাতার থেকে, আর কাতার ৪ মার্চ ফোর্স ম্যাজোর ঘোষণা করে সরবরাহ স্থগিত করেছিল। যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই এলএনজির দাম দ্বিগুণ হয়ে প্রতি এমএমবিটিইউতে ২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। জাহাজ কোম্পানিগুলো উপসাগরমুখী বুকিং স্থগিত করে; যুদ্ধ শুরুর পরপরই বাংলাদেশ প্রায় ২০০টি ফ্লাইট বাতিল করে।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত ছয় দেশে আমাদের প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রবাসী আয় পেয়েছে ৩০.২ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশ আসে উপসাগর থেকে। ঢাকার এক গবেষণার সবচেয়ে খারাপ দৃশ্যপটে জ¦ালানির দাম বাড়া, প্রবাসী আয় কমা ও রপ্তানি ধাক্কা খাওয়া একসঙ্গে ঘটলে জিডিপির ৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছে; শুধু জ¦ালানির দাম বাড়ার দৃশ্যপটেই জিডিপি কমতে পারে ১.২ শতাংশ।

একটি মর্মান্তিক বৈপরীত্য এখানে স্পষ্ট। যে ওয়াশিংটন দখলের ক্ষমতা রাখে অথচ মালিকানার দায় নিতে চায় না, তার প্রতিটি অসমাপ্ত সিদ্ধান্তের খাজনা দিচ্ছে ঢাকার মতো ভাড়াটিয়া অর্থনীতি। আমাদের নাম খতিয়ানের কোথাও নেই, অথচ প্রতিবার ঘোষণা আর প্রত্যাহারের মাঝখানে আমাদের কারখানার জ¦ালানি-পরিকল্পনা ঝুলে থাকে। ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছে আমাদেরই প্রতিবেশী পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার কণ্ঠ তাই টেবিলে একেবারে অনুপস্থিত নয়; ঢাকার সেখানে কোথায় দাঁড়ানো উচিত, সে প্রশ্ন নীতিনির্ধারকদের নিজেদেরই করতে হবে।

উল্টো পিঠের যুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের যুক্তি উড়িয়ে দেওয়া সৎ সম্পাদকীয়ের কাজ নয়। তারা বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি অনেকখানি দুর্বল করেছে। যে শাসনব্যবস্থা জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে হাজার হাজার মানুষ হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত, যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজকে জিম্মি রেখেছে এমনকি প্রণালিতে টোল বসানোর পরিকল্পনা সংসদীয় কমিটিতে অনুমোদন করিয়েছে তার ওপর চাপ বজায় রাখাই একমাত্র ভাষা, এমনটাই তাদের বক্তব্য।

হেগসেথের দাবি, চুক্তির ফলে ইরান ‘কখনোই’ পরমাণু অস্ত্র পাবে না। উপসাগরীয় অংশীদারদের অনেকেও ইরানের শক্তি খর্ব করায় আগ্রহী, তাদের গোপন হামলাই তার প্রমাণ। আর জুনের পর হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি নবায়িত হওয়াকেও সমর্থকরা কূটনৈতিক অর্জন বলেন। সমালোচকদের জবাবও জোরালো। তাদের হিসাবে হরমুজ যুদ্ধের আগেও খোলা ছিল ফলে তা খুলে দেওয়া নতুন কোনো অর্জন নয়; পারমাণবিক সময়সীমা বদলায়নি; আর ইরানের পক্ষে প্রণালির ওপর বাড়তি দর-কষাকষির জায়গা তৈরি হয়েছে।

দুপক্ষই একটি বিষয়ে একমত: সামরিক সাফল্য এখনো রাজনৈতিক নিষ্পত্তিতে রূপ নেয়নি। দলিল চাই যে ক্ষমতা দখল রাখে কিন্তু দায় নেয় না, তার হাতে কাজ প্রায়ই অসমাপ্ত থাকে এটাই এই বছরের মূল শিক্ষা। তাই আমাদের তিনটি দাবি। প্রথমত, শেষ রেখা টানা। হরমুজ, পরমাণু ও লেবানন নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির সময়সীমা ঠিক করতে হবে; ৩ নভেম্বরের পর নতুন হামলার হুমকি নয়, টেবিলে কাজ চাই।

দ্বিতীয়ত, গাজায় ঘোষিত স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা অথবা ব্যর্থতা স্বীকার করে নতুন পথ খোঁজা। তৃতীয়ত, ওমান, কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের হুমকি নয়, স্বীকৃতি দেওয়া কারণ নিষ্পত্তির দলিলে তাদের স্বাক্ষর ছাড়া তা টিকবে না। আর ঘরের জন্য আমাদের করণীয় স্পষ্ট : এলএনজির উৎস একটি দেশের ওপর নির্ভরতা থেকে সরিয়ে বহুমুখী করা, জ¦ালানি মজুত বাড়ানো, প্রবাসী শ্রমিকের সুরক্ষায় সক্রিয় কূটনীতি এবং জাতিসংঘ ও ওআইসির মঞ্চে নিজেদের কণ্ঠ স্পষ্ট করা।

বড় শক্তিদের খতিয়ান আমরা লিখতে পারব না; কিন্তু সেই খতিয়ানের দাগ-নম্বরে আমাদের ঘরের নাম যেন অন্তত ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হিসেবে হলেও লেখা থাকে সেটুকু দাবি জানানোর অধিকার আমাদের আছে। শেষ পর্যন্ত খতিয়ান লেখার অধিকার তারই, যে দায়ও নেয়। দখলের জোর দিয়ে কিছুদিন টেকা যায়; দলিল ছাড়া শান্তি টেকে না।