সদ্য বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধস নেমেছে। বিদায়ি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে এযাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বৃহস্পতিবার এডিপি বাস্তবায়নের এই হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগের অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। আইএমইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিগত যেকোনো অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশের ওপরে থাকত। আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের মোট বরাদ্দের হিসাবে এই বাস্তবায়নের হার ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। আইএমইডির ওয়েবসাইটে ২০১০-১১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ের হিসাব দেওয়া আছে। পুরোনো তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ইতিহাসের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম বাস্তবায়নের হার। এই সময়ে প্রতি বছর গড়ে ৬৮-৭০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়। এবার তা ৬৮ শতাংশেরও কম হলো। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে এমনিতেই সক্ষমতার অভাব আছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যাচাই-বাছাই করে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং টাকা খরচে কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। তবে গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে মোট বরাদ্দের ১৯ শতাংশ, অর্থাৎ ৪০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হওয়ায় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পসহ এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা করা হয়। আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, এডিপির মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। প্রতি বছর বাজেটের সময় এডিপির মাধ্যমে এসব মন্ত্রণালয়ের চলমান ও নতুন প্রকল্পে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত অর্থবছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র বেশ হতাশাজনক। যেমন: সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে। কিন্তু গত এক বছরে মাত্র দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বাস্তবায়নের হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। গত অর্থবছরে নিজেদের প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দের ৩০ শতাংশও খরচ করতে পারেনি পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর পারফরম্যান্স সবচেয়ে দুর্বল। সংসদবিষয়ক সচিবালয় ছাড়া তালিকায় থাকা অন্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয় হলো: জননিরাপত্তা বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। আইএমইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিগত যেকোনো অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশের ওপরে থাকত। তারা আরও জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রশাসনে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। ওই সময়ে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ও ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যান। এ কারণে সে বছর এডিপি বাস্তবায়ন কম ছিল। অন্যদিকে, সদ্য বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও একই ধরনের প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রভাব বজায় ছিল। পাশাপাশি নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা কার্যক্রমের কারণে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত মনোযোগ ছিল না। এ কারণে গেল অর্থবছরে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে।
4:15 am, Friday, 31 July 2026
শিরোনাম :












