গোপালগঞ্জের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে একের পর এক দুর্ঘটনায় বাড়ছে প্রাণহানি। এতে উদ্বেগ বাড়ছে যাত্রী, চালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে। গত অক্টোবর মাসে জেলায় অন্তত ১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছেন।
আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশত মানুষ। মাসের শেষ দিন ৩১ অক্টোবরও জেলায় দুটি দুর্ঘটনা ঘটে। ভোর ৪টার দিকে কাশিয়ানী উপজেলার পোনা ও এনার্জি পাম্পের মাঝামাঝি চর পিংগুলিয়া এলাকায় একই দিকে চলাচলকারী দুটি ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে ট্রাক দুটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই পেছনের ট্রাকের চালক জিয়াউর রহমান (২২) নিহত হন। তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার যদুপুর গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে।
এর আগে রাত আড়াইটার দিকে কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা এলাকায় চাকা পরিবর্তনের জন্য মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দেয় প্রাণের একটি কাভার্ডভ্যান। এতে দুটি গাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে চালক ও সহকারীসহ চারজন অক্ষত থাকেন। ২৮ অক্টোবর কাশিয়ানীর ফুকরা মিল্টন বাজার এলাকায় দোলা পরিবহনের বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে কলেজছাত্র হামিম মল্লিক (২২) নিহত হন।
একই এলাকায় সিমেন্টবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে ট্রাকের চালক ও সহকারী আহত হন। ২৬ অক্টোবর গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সোনাকুড় এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ইমাদ পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সারবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে বাসটি সড়কের পাশে ছিটকে গিয়ে একটি গাছের সঙ্গে আটকে যায়। এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত হন। ২৫ অক্টোবর মুকসুদপুর উপজেলার গেড়াখোলা সেতু এলাকায় মাছবোঝাই পিকআপের সঙ্গে অটোভ্যানের সংঘর্ষে সাইফুল ইসলাম রঞ্জু (৪৫) ও তাঁর ছয় বছর বয়সী মেয়ে সামিরা আক্তার নিহত হয়।
একই দিন কাশিয়ানীর মাঝিগাতী বাসস্ট্যান্ডে পেছন থেকে আসা একটি বাসের ধাক্কায় সড়কে পড়ে নিজের বাসের চাকায় পিষ্ট হন বাসমালিক এনায়েত শেখ। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯ অক্টোবর কাশিয়ানী উপজেলার চাপটা এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ভোরে অজ্ঞাত একটি যানবাহনের চাপায় পরিচয়হীন এক নারী নিহত হন। ১৭ অক্টোবর গোপালগঞ্জে পৃথক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়।
গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট আঞ্চলিক সড়কের কোরপাড়া বাসস্ট্যান্ডে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন কৃষ্ণ বিশ্বাস (৫৫)। উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। একই সড়কের ভেন্নাবাড়ী এলাকায় অজ্ঞাত যানবাহনের ধাক্কায় নিহত হন দুলাল মিস্ত্রি (৬৫)। ওই দিন গোপালগঞ্জ-কোটালীপাড়া সড়কের মাঝিগাতীতে পিকআপ ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন হাসিবুর মোল্লা।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। ৫ অক্টোবর কাশিয়ানীর মাঝিগাতী বাসস্ট্যান্ডে মহাসড়ক পার হওয়ার সময় বাসের ধাক্কায় নিহত হন সোলায়মান মোল্লা (৭০) ও তাঁর স্ত্রী শাহিদা বেগম (৬০)। একই দিন রাতে মুকসুদপুরের দিগনগর সেতু এলাকায় সড়ক পার হওয়ার সময় অজ্ঞাত যানবাহনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন জুলেখা বেগম (৭৫)। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী কমল রায় বলেন, তিনি প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে যাতায়াত করেন। মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনায় তাঁরা উদ্বেগ ও আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করেন। দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও সড়ক বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। দূরপাল্লার একটি পরিবহনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চালক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চালকদের অসতর্কতা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানোর প্রবণতাকে দায়ী করেন।
তাঁর ভাষ্য, অনেক চালক অপ্রয়োজনে অন্য গাড়িকে ওভারটেক করেন এবং অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া অনেক চালক পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিয়েই দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালান। চালকদের ক্লান্তিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনতাসির বলেন, তিনি মাত্র দুদিন আগে ওই থানায় যোগ দিয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হবে। গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাগরময় রায় বলেন, জেলার মহাসড়কগুলো যানবাহন চলাচলের উপযোগী রয়েছে। তবে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া ওভারটেকিং এবং পথচারীদের অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে বুধবার জেলা প্রশাসন, হাইওয়ে পুলিশ, বাসমালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সড়কের বিভিন্ন মোড়ে বন বিভাগের গাছ থাকায় দূর থেকে আসা যানবাহন দেখা যায় না। এ বিষয়ে বন বিভাগের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক চিহ্ন স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে। সড়কে প্রাণহানি কমাতে চালকদের দায়িত্বশীলতা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিয়ন্ত্রিত গতি ও নিরাপদ ওভারটেকিং নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কসংকেত স্থাপন জরুরি।
সড়কের মোড়গুলোতে দৃশ্যমানতা বাড়ানো এবং পথচারীদের নিরাপদে পারাপারের ব্যবস্থাও করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক ও যাত্রীদের সমন্বিত উদ্যোগেই দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।






















