আজ বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১২ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩০°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫৮%

তেল চুরি করে লঘু দণ্ডে দায়মুক্তির অভিযোগ পদ্মা অয়েল পিএলসির বিরুদ্ধে

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:50:33 pm, Tuesday, 27 October 2026
  • 12

তেল চুরি করে লঘু দণ্ডে দায়মুক্তির অভিযোগ পদ্মা অয়েল পিএলসির বিরুদ্ধে

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কোটি টাকার জেট ফুয়েল চুরির দায়ে মূল আসামিদের আইনের আওতায় এনে কারাগারে পাঠানোর কথা থাকলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। বেপরোয়া এই অপরাধীদের লঘু দণ্ড দিয়ে দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পদ্মা অয়েল পিএলসির বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নামমাত্র তেলের দাম আদায় করে ও বাধ্যতামূলক অবসর দিয়ে অপরাধীদের ধুয়েমুছে সাফ করার করার মিশনে নেমেছে পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ। এ যেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হোতাদের ‘লন্ড্রি সার্ভিসে’র মতো দাগমুক্ত করার মিশন। পদ্মার চাঞ্চল্যকর তেল চুরি : চলতি বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলের ঢাকার শাহজালাল ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ডিপো থেকে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল গায়েব করা হয়।

এর বাজারমূল্য প্রায় ৮১ লাখ টাকা। এদিকে গত ১৮ মে চোরাই বাজারে বিক্রির সময় ৯ হাজার লিটার জেট ফুয়েলভর্তি একটি ট্যাংক লরি আটক করা হয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায়। জানা যায়, উভয় তেলের মালিক রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা পদ্মা অয়েল পিএলসি। কর্মকর্তা, লরিচালক ও হেলপারের স্বীকারোক্তি : অনুসন্ধানে জানা যায়, লরিচালক মনির, মামুন এবং হেলপার আজগর আলী তদন্ত কমিটির সামনে স্বীকারোক্তি দেন।

তারা জানান, ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর ডিপোতে পদ্মার চুরি করা তেল বিক্রি হয় গাজীপুরে। ডিপোর চেকার মো. ইলিয়াসের নির্দেশে চার গাড়ি জেট ফুয়েল তারা পাচার করেন। এ প্রসঙ্গে ডিপোর ব্যবস্থাপক সাইদুল হক জানান, তার নিচের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী চার গাড়ি তেল ডিপোতে না আসার কথা তাকে জানাননি। এ ঘটনায় সাইদুল হক নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দেন।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ইনচার্জ সোহেল ইদ্রিস ঘটনার পরপর তদন্ত কমিটির সামনে তেল চুরির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তিনি আরও জানান, এই তেলের টাকার ভাগ কে কে পান। পরে তিনিও নিজেকে নির্দোষ দাবি করে লিখিতভাবে জানান তদন্ত কমিটিকে। মোড় ঘোরানোর চেষ্টা : লরিচালকের স্বীকারোক্তির পর প্রকৃত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা থাকলেও তদন্ত কমিটি রহস্যজনকভাবে পুরো বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করছে বলে অভিযোগ ওঠে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কুর্মিটোলা ডিপোর চেকার/ডেপার মো. ইলিয়াছের বিষয়টি এড়িয়ে যান তদন্ত কর্মকর্তারা। তাকে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো প্রকার নোটিশ করেননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তথ্যসূত্র বলছে, চট্টগ্রামের তেল চুরির হোতা সোহেল ইদ্রিস প্রথমে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করলেও পদ্মার কর্মকর্তাদের পরামর্শে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। পরে তিনি এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানান।

জানা যায়, আগামী ডিসেম্বরে তার চাকরির মেয়াদ শেষ হবে। তাই এ সময়ে যেন তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, তিনি সেটাই চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ভাইকে দিয়ে পদ্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে তদবির করেন সোহেল। পরে চট্টগ্রামের সঙ্গে মিলিয়ে ঢাকার ব্যাপারেও একই সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। মুছে দেওয়া হয় ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজ : তেল চুরির খবর প্রকাশের পরপরই পদ্মার এমডির মৌখিক আদেশে উপমহাব্যবস্থাপক (অডিট) শফিউল আজম, ব্যবস্থাপক (পরিচালন) পেয়ার আহমদ এবং অফিসার (প্রকৌশল) আবদুর রহিম কুর্মিটোলায় তদন্তে যান।

এদিকে ঘটনার দিনের ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করে দেওয়ায় তদন্তসংশ্লিষ্টরা কিছুই পাননি। জানা যায়, চুক্তিভিত্তিক সিকিউরিটি অফিসার মোস্তফা কামাল মোল্লাকে দিয়ে সব সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলা হয়। পরে পদ্মার প্রকৌশলী আবদুর রহিম সিসিটিভি কোম্পানির দুজন লোককে দিয়ে আবারও রিইনস্টল করেন। সেই ফুটেজই পেন ড্রাইভে চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

তিন বছর পর বদলির আদেশ বাস্তবায়ন : কুর্মিটোলার চেকার মো. ইসমাইল ও আকতার কামালকে ২০২৪ সালে বাঘাবাড়ি ও দৌলতপুর ডিপোতে বদলি করে অফিস আদেশ জারি করেছিল কর্তৃপক্ষ। তবু তারা এত দিন কুর্মিটোলার দায়িত্বেই ছিলেন। তেল চুরির ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হতেই ঘটনার চার দিন পর ১৫ মার্চ তাদের তিন বছর আগের বদলির আদেশ বাস্তবায়ন করে পদ্মা কর্তৃপক্ষ।

যাদের আড়ালে তৎপর কর্তৃপক্ষ : অভিযোগ রয়েছে, কুর্মিটোলার ডিপার মো. ইলিয়াছ, মো. আলমগীর কবির, কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার পাল, শফিউল আজিম, সামির উদ্দিন, চেকার বাবুল হোসেন, ডিপার ফিরোজ মিয়া ও আমির হামজার তেল চুরির সম্পৃক্ততা পাওয়ার পরও তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তদন্ত কমিটি। মুখ বন্ধ তদন্ত কমিটির : এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে এ প্রতিবেদককে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

তদন্তের প্রধান উপমহাব্যবস্থাপক ফরিদ উদ্দিন বলেন, এ নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। যা বলার বলবেন আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আপিলের সুবিধা পাবেন অপরাধীরা : পদ্মা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক মীর ফকরুদ্দীন বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে যারা অপরাধী হয়েছেন, তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তেল চুরির টাকা ফেরত দিতে। একই সঙ্গে তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হবে।

তবে তাদের পদ্মা কোম্পানির নিয়মমতো স্বাভাবিক অবসরের সব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। তারা চাইলে আপিলও করতে পারবেন। অভিযুক্তদের বক্তব্য : কুর্মিটোলা ডিপোর সাবেক ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হক বলেন, আমি অসুস্থ থাকায় অফিসের চিঠি গ্রহণ করতে পারিনি। তবে মোবাইল ফোনে অফিস থেকে চিঠি পাঠিয়েছে। আমি অপরাধী নই। ঘটনার দিনের আমার সব কার্যক্রম সিসিটিভি ফুটেজে সংরক্ষিত আছে।

তেল চুরির ঘটনায় আমি যে জড়িত নই, তার প্রমাণসহ তদন্ত কমিটিকে দিয়েছি। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সাবেক ইনচার্জ সোহেল ইদ্রিসের বক্তব্য নিতে তাকে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা অয়েলের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করা মানেই এখানে বড় লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

সঠিক আইনের প্রয়োগ হলে তেলচোরদের ঠিকানা হতো কারাগার। তা না করে উল্টো চুরির তেলের দাম নিয়ে কোম্পানির কোটি কোটি টাকা দিয়ে তাদের স্বাভাবিক অবসরে পাঠানো মানে আগামীতে শুধু পদ্মা নয়, বিপিসিসহ বাংলাদেশের সব তেল কোম্পানির জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করছে পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে আগামীতে অপরাধীরা তেল চুরিসহ নানা অপকর্ম করতে উৎসাহিত হবে।

আইনে যা আছে : দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পদাধিকারবলে সরকারি সম্পদের জিম্মাদার বা আমানতদার হয়ে থাকেন। তারা যদি সেই সম্পদ চুরি বা বিক্রি করেন, তবে তা ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং সেই সঙ্গে অর্থদণ্ড (জরিমানা) হতে পারে।

অবগত নন পদ্মার এমডি : ঢাকার কুর্মিটোলা ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হককে অনেক আগে অনিয়মের ব্যাপারে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। কুর্মিটোলার চেকার মো. ইসমাইল ও আকতার কামালকে তিন বছর আগে অন্য ডিপোতে বদলি করে অফিস আদেশ হয়েছিল। ঘটনার দিন কুর্মিটোলা ডিপোর সব সিসিটিভি ফুটেজ মুছে দেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের আটক করা গাড়ি এবং তেল কি অবস্থায় কোথায় আছে— এসব ব্যাপারে অবগত নন বলে জানান পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মফিজুর রহমান।

অভিযুক্ত চেকার মো. ইসমাইল ও আকতার কামালের বদলি প্রসঙ্গে রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, কুর্মিটোলার চেকার মো. ইসমাইল ও আকতার কামালের মতো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্টাফ না পাওয়াতে তাদের এত দিন বদলি করা হয়নি। তবে এখন বদলি করা হয়েছে। অভিযুক্ত একজন বলেছেন— ওপর মহল থেকে তাদের ব্যাপারে ফোন করে তদবির করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এমডি বলেন, তদবির এলেও আমি আমার নীতিতে অটল থাকব।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ৯ হাজার লিটার জেট ফুয়েলের ব্যাপারে জানতে চাইলে এমডি প্রথমে বলেন, তেল বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে। পরক্ষণেই তিনি বলেন, আমি আসলে জানি না তেল কোথায়, খবর নিই নাই, তবে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। পুলিশের কাছে আছে বলে শুনেছি। তেল চুরি করে ধরা পড়ায় টাকা ফেরত দিয়ে মুক্তির নির্দেশ দিলেন কেন— এমন প্রশ্নে এমডি বলেন, চাকরি বিধিমালায় অনেক অপশন আছে।

এটিও তার মধ্যে আছে। আগে এমন শাস্তি হয়নি, এখন থেকে হবে। লরিচালকের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে, পদ্মায় বছরের পর বছর তেল চুরি ও ভাগ-বাটোয়ারার চিত্র। আপনি প্রতিষ্ঠান প্রধান। তাই আপনার ওপরও এর দায় বর্তায় কি না? এমন প্রশ্নে এমডি বলেন, এমন অভিযোগ এলে আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করব। আমার প্রতিষ্ঠানে কেউ এমন করলে তাকেও একই শাস্তি দেওয়া হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

আইজিপির ক্রসফায়ার মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক, সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স

তেল চুরি করে লঘু দণ্ডে দায়মুক্তির অভিযোগ পদ্মা অয়েল পিএলসির বিরুদ্ধে

Update Time : 10:50:33 pm, Tuesday, 27 October 2026

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কোটি টাকার জেট ফুয়েল চুরির দায়ে মূল আসামিদের আইনের আওতায় এনে কারাগারে পাঠানোর কথা থাকলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। বেপরোয়া এই অপরাধীদের লঘু দণ্ড দিয়ে দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পদ্মা অয়েল পিএলসির বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নামমাত্র তেলের দাম আদায় করে ও বাধ্যতামূলক অবসর দিয়ে অপরাধীদের ধুয়েমুছে সাফ করার করার মিশনে নেমেছে পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ। এ যেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হোতাদের ‘লন্ড্রি সার্ভিসে’র মতো দাগমুক্ত করার মিশন। পদ্মার চাঞ্চল্যকর তেল চুরি : চলতি বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলের ঢাকার শাহজালাল ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ডিপো থেকে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল গায়েব করা হয়।

এর বাজারমূল্য প্রায় ৮১ লাখ টাকা। এদিকে গত ১৮ মে চোরাই বাজারে বিক্রির সময় ৯ হাজার লিটার জেট ফুয়েলভর্তি একটি ট্যাংক লরি আটক করা হয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায়। জানা যায়, উভয় তেলের মালিক রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা পদ্মা অয়েল পিএলসি। কর্মকর্তা, লরিচালক ও হেলপারের স্বীকারোক্তি : অনুসন্ধানে জানা যায়, লরিচালক মনির, মামুন এবং হেলপার আজগর আলী তদন্ত কমিটির সামনে স্বীকারোক্তি দেন।

তারা জানান, ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর ডিপোতে পদ্মার চুরি করা তেল বিক্রি হয় গাজীপুরে। ডিপোর চেকার মো. ইলিয়াসের নির্দেশে চার গাড়ি জেট ফুয়েল তারা পাচার করেন। এ প্রসঙ্গে ডিপোর ব্যবস্থাপক সাইদুল হক জানান, তার নিচের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী চার গাড়ি তেল ডিপোতে না আসার কথা তাকে জানাননি। এ ঘটনায় সাইদুল হক নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দেন।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ইনচার্জ সোহেল ইদ্রিস ঘটনার পরপর তদন্ত কমিটির সামনে তেল চুরির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তিনি আরও জানান, এই তেলের টাকার ভাগ কে কে পান। পরে তিনিও নিজেকে নির্দোষ দাবি করে লিখিতভাবে জানান তদন্ত কমিটিকে। মোড় ঘোরানোর চেষ্টা : লরিচালকের স্বীকারোক্তির পর প্রকৃত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা থাকলেও তদন্ত কমিটি রহস্যজনকভাবে পুরো বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করছে বলে অভিযোগ ওঠে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কুর্মিটোলা ডিপোর চেকার/ডেপার মো. ইলিয়াছের বিষয়টি এড়িয়ে যান তদন্ত কর্মকর্তারা। তাকে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো প্রকার নোটিশ করেননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তথ্যসূত্র বলছে, চট্টগ্রামের তেল চুরির হোতা সোহেল ইদ্রিস প্রথমে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করলেও পদ্মার কর্মকর্তাদের পরামর্শে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। পরে তিনি এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানান।

জানা যায়, আগামী ডিসেম্বরে তার চাকরির মেয়াদ শেষ হবে। তাই এ সময়ে যেন তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, তিনি সেটাই চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ভাইকে দিয়ে পদ্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে তদবির করেন সোহেল। পরে চট্টগ্রামের সঙ্গে মিলিয়ে ঢাকার ব্যাপারেও একই সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। মুছে দেওয়া হয় ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজ : তেল চুরির খবর প্রকাশের পরপরই পদ্মার এমডির মৌখিক আদেশে উপমহাব্যবস্থাপক (অডিট) শফিউল আজম, ব্যবস্থাপক (পরিচালন) পেয়ার আহমদ এবং অফিসার (প্রকৌশল) আবদুর রহিম কুর্মিটোলায় তদন্তে যান।

এদিকে ঘটনার দিনের ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করে দেওয়ায় তদন্তসংশ্লিষ্টরা কিছুই পাননি। জানা যায়, চুক্তিভিত্তিক সিকিউরিটি অফিসার মোস্তফা কামাল মোল্লাকে দিয়ে সব সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলা হয়। পরে পদ্মার প্রকৌশলী আবদুর রহিম সিসিটিভি কোম্পানির দুজন লোককে দিয়ে আবারও রিইনস্টল করেন। সেই ফুটেজই পেন ড্রাইভে চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

তিন বছর পর বদলির আদেশ বাস্তবায়ন : কুর্মিটোলার চেকার মো. ইসমাইল ও আকতার কামালকে ২০২৪ সালে বাঘাবাড়ি ও দৌলতপুর ডিপোতে বদলি করে অফিস আদেশ জারি করেছিল কর্তৃপক্ষ। তবু তারা এত দিন কুর্মিটোলার দায়িত্বেই ছিলেন। তেল চুরির ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হতেই ঘটনার চার দিন পর ১৫ মার্চ তাদের তিন বছর আগের বদলির আদেশ বাস্তবায়ন করে পদ্মা কর্তৃপক্ষ।

যাদের আড়ালে তৎপর কর্তৃপক্ষ : অভিযোগ রয়েছে, কুর্মিটোলার ডিপার মো. ইলিয়াছ, মো. আলমগীর কবির, কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার পাল, শফিউল আজিম, সামির উদ্দিন, চেকার বাবুল হোসেন, ডিপার ফিরোজ মিয়া ও আমির হামজার তেল চুরির সম্পৃক্ততা পাওয়ার পরও তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তদন্ত কমিটি। মুখ বন্ধ তদন্ত কমিটির : এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে এ প্রতিবেদককে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

তদন্তের প্রধান উপমহাব্যবস্থাপক ফরিদ উদ্দিন বলেন, এ নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। যা বলার বলবেন আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আপিলের সুবিধা পাবেন অপরাধীরা : পদ্মা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক মীর ফকরুদ্দীন বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে যারা অপরাধী হয়েছেন, তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তেল চুরির টাকা ফেরত দিতে। একই সঙ্গে তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হবে।

তবে তাদের পদ্মা কোম্পানির নিয়মমতো স্বাভাবিক অবসরের সব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। তারা চাইলে আপিলও করতে পারবেন। অভিযুক্তদের বক্তব্য : কুর্মিটোলা ডিপোর সাবেক ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হক বলেন, আমি অসুস্থ থাকায় অফিসের চিঠি গ্রহণ করতে পারিনি। তবে মোবাইল ফোনে অফিস থেকে চিঠি পাঠিয়েছে। আমি অপরাধী নই। ঘটনার দিনের আমার সব কার্যক্রম সিসিটিভি ফুটেজে সংরক্ষিত আছে।

তেল চুরির ঘটনায় আমি যে জড়িত নই, তার প্রমাণসহ তদন্ত কমিটিকে দিয়েছি। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সাবেক ইনচার্জ সোহেল ইদ্রিসের বক্তব্য নিতে তাকে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা অয়েলের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করা মানেই এখানে বড় লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

সঠিক আইনের প্রয়োগ হলে তেলচোরদের ঠিকানা হতো কারাগার। তা না করে উল্টো চুরির তেলের দাম নিয়ে কোম্পানির কোটি কোটি টাকা দিয়ে তাদের স্বাভাবিক অবসরে পাঠানো মানে আগামীতে শুধু পদ্মা নয়, বিপিসিসহ বাংলাদেশের সব তেল কোম্পানির জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করছে পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে আগামীতে অপরাধীরা তেল চুরিসহ নানা অপকর্ম করতে উৎসাহিত হবে।

আইনে যা আছে : দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পদাধিকারবলে সরকারি সম্পদের জিম্মাদার বা আমানতদার হয়ে থাকেন। তারা যদি সেই সম্পদ চুরি বা বিক্রি করেন, তবে তা ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং সেই সঙ্গে অর্থদণ্ড (জরিমানা) হতে পারে।

অবগত নন পদ্মার এমডি : ঢাকার কুর্মিটোলা ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হককে অনেক আগে অনিয়মের ব্যাপারে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। কুর্মিটোলার চেকার মো. ইসমাইল ও আকতার কামালকে তিন বছর আগে অন্য ডিপোতে বদলি করে অফিস আদেশ হয়েছিল। ঘটনার দিন কুর্মিটোলা ডিপোর সব সিসিটিভি ফুটেজ মুছে দেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের আটক করা গাড়ি এবং তেল কি অবস্থায় কোথায় আছে— এসব ব্যাপারে অবগত নন বলে জানান পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মফিজুর রহমান।

অভিযুক্ত চেকার মো. ইসমাইল ও আকতার কামালের বদলি প্রসঙ্গে রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, কুর্মিটোলার চেকার মো. ইসমাইল ও আকতার কামালের মতো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্টাফ না পাওয়াতে তাদের এত দিন বদলি করা হয়নি। তবে এখন বদলি করা হয়েছে। অভিযুক্ত একজন বলেছেন— ওপর মহল থেকে তাদের ব্যাপারে ফোন করে তদবির করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এমডি বলেন, তদবির এলেও আমি আমার নীতিতে অটল থাকব।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ৯ হাজার লিটার জেট ফুয়েলের ব্যাপারে জানতে চাইলে এমডি প্রথমে বলেন, তেল বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে। পরক্ষণেই তিনি বলেন, আমি আসলে জানি না তেল কোথায়, খবর নিই নাই, তবে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। পুলিশের কাছে আছে বলে শুনেছি। তেল চুরি করে ধরা পড়ায় টাকা ফেরত দিয়ে মুক্তির নির্দেশ দিলেন কেন— এমন প্রশ্নে এমডি বলেন, চাকরি বিধিমালায় অনেক অপশন আছে।

এটিও তার মধ্যে আছে। আগে এমন শাস্তি হয়নি, এখন থেকে হবে। লরিচালকের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে, পদ্মায় বছরের পর বছর তেল চুরি ও ভাগ-বাটোয়ারার চিত্র। আপনি প্রতিষ্ঠান প্রধান। তাই আপনার ওপরও এর দায় বর্তায় কি না? এমন প্রশ্নে এমডি বলেন, এমন অভিযোগ এলে আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করব। আমার প্রতিষ্ঠানে কেউ এমন করলে তাকেও একই শাস্তি দেওয়া হবে।